পুনশ্চ : তোমাকে মিস করছি। এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। মানুষকে সব সময়ই কিছু না কিছু মিস করতে হয়; কোনো কিছু মিস করাতেও এক ধরনের আনন্দ আছে।
জাহানারা চিঠি হাতে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। চশমা চোখে দিয়ে দ্বিতীয়বার এই চিঠি পড়ার কোনো ইচ্ছাই তার হচ্ছে না।
বারান্দা থেকে শুভ্ৰ আনন্দিত গলায় বলল, মা শুনে যাওতো। জাহানারা টেবিলে চিঠি ফেলে উঠে গেলেন। শুভ্র বলল, আজকের খবরের কাগজটা পড়েছ?
জাহানারা চাপা গলায় বললেন, না।
একটা ছ বছর বয়েসী মেয়ের খবর ছাপা হয়েছে। মেয়েটা স্বপ্নে একটা মন্ত্র পেয়েছে। মন্ত্র পড়ে মাটিতে ফুঁ দিয়ে যাকে মাটি খাওয়ানো হয় তার সব অসুখ সেরে যায়।
ভালোইতো।
হাজার হাজার মানুষ লাইন বেঁধে মাটি খাচ্ছে। টনকে টন মাটি শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় কলেজের প্রিন্সিপ্যাল সাহেব বলেছেন মাটি খেয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের হাঁপানি সেরে গেছে।
জাহানারা বললেন, তুই এত উত্তেজিত কেন? তোর কি কোনো অসুখ বিসুখ আছে যে মাটি খেতে হবে?
শুভ্ৰ বলল, মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে মা।
চলে যা। কথা বলে আয়।
পুরো নিউজটা তোমাকে পড়ে শুনাব। এই চেয়ারটায় আরাম করে বোস। আর বিনুকে ডাক। বিনু খুবই মজা পাবে।
জাহানারা বললেন, তুই বিনুকেই পড়ে শোনা। আমার প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। আমি শুয়ে থাকব।
শুভ্র বলল, এইত রোগ পাওয়া গেছে। তোমার ভয়াবহ মাইগ্রেন ব্যাধির জন্যে মৃত্তিকা-চিকিৎসা। সকালে এক চামচ মাটি। বিকেলে এক চামচ।
শুভ্ৰ হাসছে। তার আনন্দিত মুখ দেখে জাহানারার বুকে ধাক্কার মত লাগল। তার ছেলে এত আনন্দিত কেন? মাটি চিকিৎসার খবরে আনন্দিত, না-কি বিনু নামের মেয়েটি চলে এসেছে বলে আনন্দিত?
মা দাঁড়িয়ে আছ কেন? বোসতো। বোস। ভোরের পবিত্র আলোয় তোমার মুখ দেখি।
জাহানারা বসলেন। শুভ্র তাঁর দিকে ঝুঁকে এসে বলল, আচ্ছা মা ভোরের আলোকে পবিত্র আলো বলা হয় কেন বল দেখি? ভোরের আলো পবিত্র। দুপুরের আলো কি অপবিত্ৰ?
জানি না।
তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি কোনো কারণে খুব আপসেট। বলো দেখি কী হয়েছে?
কিছু হয় নি।
শুভ্র আনন্দিত গলায় বলল, তুমি কী কারণে আপসেট আমি বের করে ফেলেছি। বিনুকে দেখে তুমি আপসেট হয়ে গেছ।
ওকে দেখে আমি আপসেট হব কেন?
তোমার মনের ভেতর নানা ধরনের current and counter current. বিনু সেখানে…
চুপ কর এইসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।
কী নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছে?
কোনো কিছু নিয়েই কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।
গল্প শুনবে?
গল্প?
হ্যাঁ গল্প। কাল রাতে বিনুকে গল্পটা বললাম। সে খুবই মজা পেয়েছে। গল্পটা হল চক্র গল্প। যেখান থেকে গল্পটা শুরু হয়। আবার সেখানেই ফিরে আসে–তারপর চক্রের মত ঘুরতে থাকে। যে গল্প শুনে সে খুবই বিরক্ত হয়।
জাহানারা বললেন, বিনু নিশ্চয়ই বিরক্ত হয় নি?
শুভ্র বলল, ঠিক ধরেছ, বিনু বিরক্ত হয় নি। যারা বুদ্ধিমান তারা গল্পটাতে মজা পায়। এই গল্প দিয়ে মানুষের বুদ্ধিও পরীক্ষা করা যায়। তুমি যদি এই গল্প শুনে মজা না পাও যদি বিরক্ত হও তাহলে বুঝতে হবে তোমার বুদ্ধি কম।
আমার বুদ্ধি কম-না বেশি তার জন্যে পরীক্ষার দরকার নেই। আমি জানি আমার বুদ্ধি কম।
শুভ্ৰ গম্ভীর গলায় বলল, মা তুমি ব্যাখ্যা করতো বুদ্ধি কী? আমার মনে হচ্ছে তুমি ব্যাখ্যা করতে পারবে না। জ্ঞান কী তা ব্যাখ্যা করা যায়– বুদ্ধি চট করে ব্যাখ্যা করা যায় না। আমার কাছে একটা ব্যাখ্যা আছে। শুনবে?
বল শুনি।
জ্ঞান হল স্মৃতি, মেমরি। সেই স্মৃতি ব্যাখ্যা করার ক্ষমতার নাম বুদ্ধি। কিছু বুঝলে?
বিনুকেও নিশ্চয়ই এই কথাগুলি বলেছিস। সে বুঝেছে?
শুভ্ৰ মার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
ছোটবেলা থেকেই বিনু শুনে আসছে
ছোটবেলা থেকেই বিনু শুনে আসছে সে বোকা। বাবা তাকে স্কুলে ভর্তি করাবার সময় হেডমাস্টার সাহেবকে বললেন, স্যার আমার এই মেয়েটা বড়ই বোকাআপনার হাতে সোপর্দ করে দিলাম। একটু দেখবেন। বিনুকে নিয়ে তার বাবার সামান্য দুঃখের মতও ছিল। প্রসঙ্গ উঠলেই বলতেন— আমার পাঁচটা না, দশটা না, একটাই সন্তান। সেও হয়েছে বোকা। তার কপালে আল্লাহ পাক কী রাখছেন কে জানে।
স্কুলের বান্ধবীরা অল্প দিনেই জেনে গেল বিনু মেয়েটা হাবা টাইপ। কিছু জিজ্ঞেস করলে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। সহজ সাংকেতিক কথাও ধরতে পারে না। ধরিয়ে দিলেও পারে না।
কিটেমন ইটাছিস?
এর অর্থ হল কেমন আছিস। এটাও বিনু ধরতে পারে নি। বিনুর মারও মেয়েকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা ছিল। পুরুষ মানুষ হাবা হলে চলে। মেয়ে মানুষ হাবা হলে চলে না। মেয়ে মানুষের হাতের দশ আংগুলো একশ সুতা থাকে। তাকে চলতে হয় একশ সুতা টেনে।
ক্লাস নাইনে উঠে। হঠাৎ কী যে হল- বিনুর মনে হল তার আসলে অনেক বুদ্ধি। চারপাশে কী ঘটছে। সে যে তা শুধু বুঝতে পারছে তা-না, কেন ঘটছে তাও বুঝতে পারছে। তারচেয়েও আশ্চর্য ব্যাপার ঘটনাগুলি নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন কিছু না বলে মনে হতে শুরু করেছে। তার পরিচিত বেশ কিছু মানুষকে আগে খুব বুদ্ধিমান মনে হত। বিনুর হঠাৎ করেই মনে হতে লাগল এরা তেমন বুদ্ধিমান না। বুদ্ধিমানের ভাব করছে – এই পর্যন্তই। যেমন তার মা! অ্যাগে মনে হত— কোথায় কী ঘটছে, কেন ঘটছে। এই মহিলা জানেন। ক্লাস নাইনে উঠার পর মনে হল— না, এই মহিলা তেমন কিছু জানেন না। তিনি নিজের স্বার্থটা ভাল বুঝেন। এই পর্যন্তই। এই মহিলার চেয়ে সে অনেক বেশি জানে, অনেক বেশি বুঝে।
