জাহানারা আবারো নামাজে ভুল করলেন। এতো দেখি ভাল সমস্যা হয়েছে। বারবার নামাজে ভুল হচ্ছে। বিনুর সঙ্গে কথা বলে পুরো ঝামেলা শেষ করে এসে জায়নামাজে দাঁড়ালে সবচে ভাল হত। জাহানারা কোনমতে নামাজ শেষ করে নিজের ঘরে এসে বিনুকে ডেকে পাঠালেন।
বিনু জাহানারাকে সালাম করে ক্ষীণ স্বরে বলল, চাচি কেমন আছেন?
জাহানারা কিছু বললেন না। তীক্ষ্ণ চোখে বিনুকে লক্ষ করতে লাগলেন।
গায়ের রঙ সামান্য ময়লা হয়েছে। এটা হবেই। শহর থেকে গ্রামে গেলে রঙ ময়লা হয়। একটু রোগা হয়েছে। সেটাও স্বাভাবিক। গ্রামে নিশ্চয়ই খেয়ে না খেয়ে থাকে। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে মেয়েটা সুন্দর হয়েছে। সুন্দর হবার রহস্যটা কী? বিয়ের আগে আগে মেয়েরা সুন্দর হয়। এরুতে বিয়ে হয়ে যাবার কথা। বিয়ে হয়ে যাবার পর মেয়েরা আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
তোমার বিয়ে হয়ে গেছে না?
বিনু নিচু গলায় বলল, জ্বি না।
বিয়ে হয় নি কেন?
ঝামেলা হয়েছে। গ্রামের বিয়েতে অনেক ঝামেলা হয়।
ঝামেলা হয়। আবার ঝামেল মিটেও যায়। তোমারটা মিটাল না কেন?
চাচি আমার ভাগ্যতো সব সময়ই খারাপ।
এত রাতে ঢাকায় এলে কেন? দিনে আসতে পারতে।
সকালেই রওনা হয়েছিলাম। দিনে দিনে পৌঁছতাম। বাস নষ্ট হল দুবার।
তোমার সঙ্গে কে এসেছে?
আমি একই এসেছি। সঙ্গে কেউ আসে নি।
জাহানারা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এই মেয়ে কী বলছে? রাত সাড়ে এগারোটায় ঢাকা শহরে একা উপস্থিত হয়েছে। ঢাকায় আসার তার দরকারটা কী? বিয়ে ভেঙে গেলে ঢাকায় চলে আসতে হয়? বাড়ি থেকে তাকে একা ছাড়লইবা কী মনে করে!
তোমার ঘরতো তালাবন্ধ ছিল। তালা কে খুলে দিল?
ভাইজান খুলে দিয়েছেন।
ও চাবি কোথায় পেল?
তার দিয়ে কী করে যেন খুলেছেন।
জাহানারার মাথায় আরো অনেক প্রশ্ন ঘুরছে। প্রশ্নগুলি গুছিয়ে নেয়া দরকার। তিনি এখন মোটামুটি নিশ্চিত যে বিয়ে ভাঙেনি। এই মেয়ে নিজেই পালিয়ে চলে এসেছে। পালিয়ে না এলে কেউ না কেউ মেয়ের সঙ্গে আসত। তারচেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছে পালিয়ে যদি সে এসেও থাকে, এ বাড়িতে আসবে কেন? এমনতো হয় নি যে শুভ্ৰ তাকে চলে আসতে বলেছে। তাও বা কী করে সম্ভব? শুভ্ৰ এই মেয়ের বাড়ির ঠিকানা জানবে কী করে! জাহানারা অন্ধকারে চিলা ছুঁড়লেন। খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, শুভ্ৰ কি তোমাকে তোমাদের গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় কোনো চিঠি দিয়েছে?
বিনু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শান্ত গলায় বলল, জ্বি দিয়েছেন।
চিঠিটা কি তোমার সঙ্গে আছে?
জ্বি আছে। আমাকে একটু দিয়ে যাও তো।
বলেই জাহানারা দাঁড়ালেন না। মেয়ে যেন বলার সুযোগ না পায়- চিঠিটা আপনাকে দেয়া যাবে না। আমাকে লেখা ব্যক্তিগত চিঠি আপনি কেন পড়বেন?
জাহানারা রান্নাঘরে গেলেন। গ্যাসের চুলায় কেটলি দেয়া আছে। পানি ফুটছে। তিনি মুক্তার মাকে ডেকে না তুলে নিজেই নিজের জন্যে চা বানালেন। বিনু চিঠি নিয়ে আসছে না। মনে হয় সে আসবে না। যদি না আসে তার কি উচিত। হবে। আরেকবার চাওয়া? নিশ্চয়ই উচিত হবে। তাঁর অধিকার আছে সংসারের ভাল মন্দ দেখার। জাহানারা ঠিক করলেন, চা শেষ করেই মুক্তার মাকে দিয়ে বিনুকে ডেকে পাঠাবেন। ব্যক্তিগত চিঠি আবার কী? এই পৃথিবীতে ব্যক্তিগত বলে কিছু নেই।
বিনুকে ডেকে পাঠাতে হল না। খামে বন্ধ চিঠি সে নিজেই দিয়ে গেল। খামের উপর শুভ্রর হাতের লেখা ঠিকানা।
আফরোজা বেগম (বিনু)
গ্ৰাম : সোহাগী
পোষ্ট : সোহাগী
জেলা : নেত্রকোনা।
বিনুর ভাল নাম যে আফরোজা বেগম তা তিনি জানেন না। অথচ তার ছেলে জানে। এটা কি বিস্ময়কর কোনো ঘটনা না? অবশ্যই বিস্ময়কর ঘটনা। জাহানারার হাত কাঁপছে। তাঁর মনে হচ্ছে মূল চিঠিতে তাঁর জন্যে আরো অনেক বিস্ময় অপেক্ষা করছে। বিনু টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। জাহানারা বললেন, তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? তুমি যাও। চিঠি পড়া শেষ হলে তোমার চিঠি আমি তোমাকে ফেরত দেব।
বিনু চলে গেল। জাহানারা চিঠি পড়তে শুরু করলেন। চশমা ছাড়া কাছের লেখা আজকাল তিনি পড়তে পারেন না। এই চিঠি চশমা ছাড়াই পড়তে হচ্ছে। চশমার জন্যে অপেক্ষা করার ধৈর্য তাঁর নেই। জাহানারা ঠিক করলেন কোনো মতে একবার পড়ে দ্বিতীয়বার চশমা চোখে দিয়ে ভালমত পড়বেন। দুবার কেন, দরকার হলে তিনবার চারবার পড়বেন। চিঠি নিয়ে শুভ্রর সঙ্গেও কথা বলবেন। বিনুকে যে চিঠি ফেরত দিতেই হবে তাও না। হাতের লেখা চিঠি মানে দলিল প্রমাণ। দুষ্ট মেয়েটার হাতে কোনো দলিল রাখা যাবে না। চিঠিটা অবশ্যই নষ্ট করে দিতে হবে।
শুভ্র লিখেছে—
বিনু, আমি বলেছিলাম তোমাকে চিঠি লিখব। লিখলাম। দেখেছি। আমি কথা রাখি। সবচে আশ্চর্যের কথা হচ্ছে। আমি তোমার গ্রামের ঠিকানাও মনে রেখেছি। তুমি বললে, ঠিকানা লিখে রাখেন— নয়ত আপনার মনে থাকবে না। আমি বললাম, আমার স্মৃতি শক্তি অত্যন্ত ভাল। মনে রাখার জন্যে আমি যা শুনি, তা মনে রাখি। তোমাকে স্মৃতি শক্তির একটা পরীক্ষাও দিয়ে দিলাম। এই মুহূর্তে তুমি আমার চিঠি পড়ছ— কাজেই স্মৃতি শক্তির পরীক্ষায় আমি পাশ করেছি।
এখন বল তুমি কি আমার চিঠির জন্যে অপেক্ষা করেছ? মনে পড়েছে আমার কথা? বিয়ের নানান ঝামেলায় মনে না পড়ারই কথা। বিয়ে একটি মেয়ের জীবনের অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটার আগে চারপাশের জগৎ তুচ্ছ ও অস্পষ্ট হয়ে যাবার কথা।
তুমি আমার কথা মনে কর বা না কর আমি অনেকবারই তোমাকে ভেবেছি। মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙেছে। চা খেতে ইচ্ছা করেছে। তখন মনে হয়েছে- বিনু থাকলে বেশ হত। চা বানিয়ে আনত। দুজনে চা খেতে খেতে গল্প করতাম। আমরা গল্প করতাম বলাটা ভুল হচ্ছে। আমি গল্প করতাম তুমি শুনতে। আমার সব সময় মনে হয়েছে তুমি খুব আগ্রহ নিয়ে আমার গল্প শুনতে। এখন কেন জানি মনে হচ্ছে তোমার আগ্রহটা ভদ্রতা সূচক। একজন মানুষ যদি মজার গল্প বলার চেষ্টা করে তাহলে সেই গল্প শুনে মজা পাবার ভান করাটা ভদ্ৰতা। তুমি ভদ্রতা কর বা যাই কর মাঝরাতে তোমার সঙ্গে গল্প করতে আমার সব সময় ভাল লাগতো। এই ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারি। তুমি চলে যাবার পর। হঠাৎ হঠাৎ মজার কোনো কথা আমার মনে হত তখনই মনটা খারাপ হত। কাকে এই মজার গল্প শুনাব?
চিঠি অনেক লম্বা হয়ে গেল; আমি নিজে কখনো দীর্ঘ চিঠি পড়তে পারি না। বিরক্তি লাগে। এই জন্যে খানিকটা অস্বস্তি বোধ করছি। মনে হচ্ছে তুমিও এই দীর্ঘ চিঠি হাতে নিয়ে বিরক্ত হবে।
তুমি ভাল থেকে। তোমার নতুন জীবন সুন্দর, আনন্দময় এবং মঙ্গলময় হোক। এই শুভ কামনা।
ইতি
শুভ্র
