গতরাতে জাহানারা একটা স্বপ্ন দেখেছেন। স্বপ্নটা বেশ জটিল। সোলেমানি খাবনাময় জটিল স্বপ্ন নেই। জাহানারা খুবই চিন্তিত বোধ করছেন। বাড়িতে এমন কেউ নেই যে স্বপ্ন নিয়ে কথা বলবেন। শুভ্ৰ আছে। স্বপ্ন নিয়ে শুভ্রের কাছে যাওয়া যাবে না। তাছাড়া স্বপ্নটা শুভ্ৰকে নিয়েই দেখা।
যেন শুভ্রর বিয়ে হচ্ছে। বর-কনে পাশাপাশি বসা। আয়নায় মুখ দেখাদেখি হবে। একজন একটা আয়না নিয়ে এল। সেই আয়নায় মুখ দেখা যাচ্ছে না। কাচের পারা উঠে গেছে। শুভ্র বলল, মা এটা কী আয়না? এখানে তো কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তিনি এসে আয়না। হাতে নিয়ে দেখেন— আয়না না, শুধু কাঠের একটা ফ্ৰেম। ফ্রেমটা সুন্দর। জাফরি কাটা। তাতে কী? শুভ্র রাগী রাগী গলায় বলল, কেউ কি একটা আয়না আনবে না? হাঁটু গেড়ে কতক্ষণ বসে থাকব? আমার পা ধরে গেছে। সবাই ছোটাছুটি করছে। কেউ আয়না খুঁজে পাচ্ছে না। শেষে বিনু একটা আয়না নিয়ে এল। এই হল স্বপ্ন।
সোলেমানি খাবনামায় আছে— আয়নায় মুখ দেখিলে চরিত্রহানী হয়। তিনি নিজে আয়নায় মুখ দেখেন নি। কাজেই খাবনামার এই অর্থ অবশ্যই গ্রহণযোগ্য হবে না। জাহানারা চিন্তিত মুখে বিছানা থেকে নামলেন। মুক্তার মাকে টাকা দিয়ে বাজারে পাঠাতে হবে। মুরগি কিনে আনবে। তিনি সদকা দেবেন। জাহানারা মনে প্ৰাণে বিশ্বাস করেন স্বপ্ন হচ্ছে আল্লাহপাকের ইশারা। তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁর বান্দাদের সাবধান করে দেন। কেউ আয়না খুঁজে পেল না। বিনু খুঁজে পেল- এর মানে কি এই যে বিনু মেয়েটি চরিত্রহীনা? আয়নার সঙ্গে চরিত্রের একটা যোগ নিশ্চয়ই আছে।
জাহানারা বাথরুমে ঢুকলেন। অজু করে। ফজরের নামাজ আদায় করবেন। বেশ কিছুদিন হল তার ফজরের নামাজ কাজ হচ্ছে না। আজানের আগেই ঘুম ভাঙছে। এখানেও আল্লাহপাকের হাত আছে। আল্লাহপাক তাঁর পছন্দের বান্দাদের ফজর ওয়াক্তে ঘুম ভাঙিয়ে দেন। দুষ্ট লোকদের কাছে শয়তান চলে আসে। শয়তান তাদের পায়ে সুড়সুড়ি দেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কাজেই ফজর ওয়াক্তে তারা কিছুতেই ঘুম থেকে উঠতে পারে না। দুষ্টলোকদের রাতের ঘুম ভাল হয় না, কিন্তু সোবে হাসাদেকের সময় গাঢ় ঘুম হয়।
নামাজে দাঁড়িয়ে জাহানারা শুনলেন বারান্দায় মেয়েলি গলার আওয়াজ। চুড়ির শব্দ। আবার যেন চায়ের কাপে চামচ নাড়ার শব্দও হচ্ছে। ব্যাপারটা কী? মুক্তার মা তো হতেই পারে না। তার ঘুম ভাঙাতে হবে ধাক্কাধাক্কি করে। তাছাড়া মুক্তার মা নিশ্চয়ই বারান্দায় বসে চা খাবে না। চুড়ির টুং-টাং শব্দ মুক্তার মার হতে পারে। তার হাত ভর্তি চুড়ি; জাহানারা সূরা পাঠে ভুল করে ফেললেন। তিনি নতুন করে সূরা ফাতেহা ধরলেন আর তখন স্পষ্ট শুনলেন, কে ফেন হাসছে। গলা অবিকল বিনুর মত। কিন্তু বিনু দেশের বাড়িতে। এতদিনে তার বিয়ে হয়ে যাবার কথা। সে থাকবে শ্বশুর বাড়িতে। এই বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসবে না। জাহানার আবারো সূরা ফাতেহা-য় ভুল করলেন। ভুল ভাল নামাজ পড়ার কোনো মানে হয়। না। ব্যাপার কী- সেই খোঁজ নিয়ে এসে নামাজ শুরু করলে হয়। নামাজ একাগ্রতার ব্যাপার। আল্লাহকে ডাকতে হবে এক মনে। মাঝখানে যদি বিনু ঢুকে পড়ে তাহলে কীভাবে হবে! জাহানার নামাজ বন্ধ করে বারান্দায় এসে দেখেন বেতের ইজিচেয়ারে শুভ্ৰ আধশোয়া হয়ে আছে। তার হাতে মগ। সে চুকচুক করে কফি খাচ্ছে। কফির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কে তাকে কফি বানিয়ে দিল? মুক্তার মা কফি বানাতে পারে না।
শুভ্ৰ মাকে দেখে বলল, গুটেন টাগ।
জাহানারা বললেন, গুটেন টাগ আবার কী?
শুভ্র বলল, জার্মান ভাষায় গুটেন ট্যাগ হচ্ছে- শুভ দিন।
তুই আজ এত সকালে ঘুম থেকে উঠেছিস কীভাবে?
সারারাত ঘুমাই নি। কাজেই ঘুম থেকে উঠার প্রশ্ন আসে না।
ঘুমাস নি কেন?
ঘুম আসে নি বলে ঘুমাইনি। আমি কী করি জান মা? পুরোপুরি যখন ঘুম আসে তখন ঘুমুতে যাই। অনেকে আছে চোখে ঘুম নেই, বিছানায় পড়ে আছে। ভেড়া গুণছে। আমি ভেড়া গোণার দলে নাই। ঘুম ভাল মত আসবে— তারপর বিছানায় যাব।
জাহানারার কাছে মনে হল শুভ্ৰ বেশি কথা বলছে। হড়বড় করছে। সেতো। হড়বড় করার ছেলে না। তাছাড়া তার রাতে ঘুম কেন হবে না? ঘুম হবে না বুড়ো মানুষদের! এই বয়সের ছেলে বিছানায় যাবে। আর ঘুমিয়ে পড়বে।
তুই কি কফি খাচ্ছিস?
হু! তুমি খাবে?
কফি বানিয়ে দিল কে?
বিনু।
জাহানারা হতভম্ব গলায় বললেন, বিনু মানে? বিনু কোথেকে এল?
শুভ্ৰ পা নাচাতে নাচাতে বলল, বিনু এসেছে কাল রাত সাড়ে এগারোটায়। তুমি ঘুমুচ্ছিলে বলে জানতে পার নি।
জাহানারার চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল। তাঁর উচিত এই মুহূর্তেই বিনুর সঙ্গে কথা বলা। কথা বলতে গেলেই দেরি হবে। নামাজের সময় কাজ হয়ে যাবে।
বিনুর বিয়ে হয় নি?
জানি না তো মা। আমি জিজ্ঞেস করি নি।
নিশ্চয় বিয়ে হয় নি। বিয়ে হলে এ বাড়িতে এসে উঠত না।
শুভ্ৰ বলল, ওর বিয়ে হয়েছে কি হয় নি, এটা আমার কাছে তেমন জরুরি না। তোমার কাছে যদি জরুরি মনে হয় তুমি জিজ্ঞেস কর।
জাহানারা বিনুর ঘরের দিকে রওনা হয়েও শেষ পর্যন্ত গেলেন না। আগে নামাজটা শেষ হোক। কথাবার্তা যা বলার নামাজ শেষ করে বলবেন। অন্যদিন নামাজের পর কিছুক্ষণ কোরান পাঠ করেন। আজ মনে হয় কোরান পাঠ হবে না।
নামাজে দাঁড়িয়ে জাহানারার অন্য একটা কথা মনে এল। বিনুর ঘরতো। তালাবন্ধ ছিল। সেই তালার চাবি ছিল তাঁর কাছে। তাহলে ঘরের তালা কীভাবে খোলা হল? তালা ভাঙা হয়েছে? তোলা ভাঙা হলে তালা ভাঙার শব্দে তার ঘুম অবশ্যই ভাঙতো! ঘুম যখন ভাঙেনি কাজেই তালা ভাঙা হয় নি। তাহলে রাতে বিনু কি শুভ্ৰর ঘরে ছিল? শুভ্ৰ যে সারারাত ঘুমুতে পারে নি তা কি এই কারণে? বিনুর সঙ্গে গল্পগুজব করে রাত পার করেছে। বিনুর আবার গল্প কী? বিনু যা করেছে তা হল ছেলে ভুলানো কৌশল। চা-কফি বানিয়ে খাইয়েছে। শুভ্রর প্রতিটা কথা মুগ্ধ হয়ে শুনেছে যেন এমন কথা সে ইহজীবনে শুনে নি।
