জ্বি।
সেই টেলিফোনে মেয়ের সঙ্গে কথা বলেন না কেন? কথা বলে তারপর আমাদের জানান—সে কেমন আছে?
আমি তার দরকার দেখি না; আমার মেয়ে কেমন আছে, না আছে সেটা আমার ব্যাপার। You have no business there.
আমিও আপনাকে শুরুতে তাই বলছিলাম। আপনি মানুষটা কেমন? আপনার অতীত কী? তা আপনার ব্যাপার। সেই নিজের ব্যাপার অন্যের কাছ থেকে জানতে চাওয়া ঠিক না।
সাজ্জাদ সাহেব উঠে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর মুখ থমথম করছে। মনে হচ্ছে তিনি পার্টি ছেড়ে চলে যাবেন। শুভ্ৰ লক্ষ করল দূর থেকে আখলাক সাহেব পুরো ব্যাপারটা দেখছেন। তার ঠোঁটের কোণায় অস্পষ্ট হাসির রেখা। আখলাক সাহেবব এগিয়ে এসে বললেন, যাদের গলা শুকিয়ে গেছে তারা প্রয়োজন বোধ করলে গলা ভেজাতে পারেন। মিনি বার অপেন হয়েছে। একটা পাঞ্চ আমি নিজে বানিয়েছি ভারমুখ– অরেঞ্জ জুস- টাকিলা এবং গোলমরিচ দিয়ে বানানো এক চামুচ করে হলেও সবাই চেখে দেখবেন।
লোকজন সবাই যেন একটু নড়েচড়ে বসল। শুভ্রর কাঁধে কে হাত রেখেছে। এলা নামের সেই মহিলা না-কি? শুভ্ৰ অস্বস্তির সঙ্গে মাথা ফিরিয়ে দেখে মীরা। মীরার মুখ হাসি হাসি। এর অর্থ মীরা রেগে আছে। তার মুখ যখন খুব হাসি হাসি থাকে তখন বুঝতে হবে সে রেগে আছে। হাসি দিয়ে সে রাগ চাপার চেষ্টা করছে।
শুভ্র আমার সঙ্গে একটু আয়তো।
শুভ্র মীরাকে অনুসরণ করল। মীরা নিতান্ত পরিচিত ভঙ্গিতে সিঁড়ি বেয়ে একতলা থেকে দোতলায় উঠছে। অন্য কোন অতিথিকে শুভ্ৰ দোতলায় উঠতে দেখে নি। দোতলায় উঠেই খানিকটা ফাঁকা জায়গা। বড় টিভি আছে। টিভিতে কার্টুন চলছে। মিকি ইদুর তাড়া করছে। টিভিতে কোনো শব্দ নেই। টিভির কোনো দর্শকও নেই।
মীরা বলল, তোকে এ বাড়িতে দেখে আমি খুবই অবাক হয়েছি।
শুভ্র বলল, কেন?
তুই এখানে এসেছিস কেন?
তুমি যেমন নিমন্ত্রণ পেয়ে এসেছ আমিও তাই।
তুই এ বাড়িতে কখনো আসবি না। নেভার এভার… বুঝতে পারছিস?
না।
এটা খুব স্ট্রেঞ্জ একটা জায়গা। এখানে আসা ঠিক না।
তুমিতো আসছ।
আমি এসেছি বলেই আমি জানি।
চলে যেতে কলছ?
হ্যাঁ।
পার্টিটা শেষ পর্যন্ত দেখে যেতে ইচ্ছা করছে।
কিছু দেখতে হবে না। তুই এক্ষুণি আমার সঙ্গে রওনা হবি। আমি তোকে তোর বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসব।
মীরা সিঁড়ি বেয়ে নামছে। মীরার পেছনে পেছনে নামছে শুভ্ৰ। দরজার কাছে আখলাক সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। মীরা বলল, আমি শুভ্ৰকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি, ওর প্রচণ্ড মাথা ধরেছে।
আখলাক সাহেব বললেন, তুমি কি ফিরে আসছ?
মীরা বলল, হ্যাঁ ফিরছি।
আখলাক সাহেব শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, আবার দেখা হবে।
গাড়ি চালাচ্ছে মীরা। তার মুখ থমথম করছে। শুভ্র মীরার পাশে বসেছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা না। প্রচুর ট্রাফিক। মীরা গাড়িতে স্পীড় দিতে পারছে না। তাকে খানিকটা বিরক্ত দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে তার ইচ্ছা অতি দ্রুত শুভ্ৰকে নামিয়ে দিয়ে চলে আসা।
শুভ্র বলল, আমাকে এখানে কোথাও নামিয়ে দিলেই হবে। আমার বাড়ি পর্যন্ত গেলে ফিরতে রাত হয়ে যাবে। দেখবে পার্টি শেষ।
মীরা জবাব দিল না। শুভ্র বলল, আচ্ছা মেশকাত নামের ঐ লোকটাকে তুমি কি আগে দেখেছ?
মীরা বলল, হ্যাঁ। শুভ্র বলল, লোকটার কি কোনো অতিন্দ্রীয় ক্ষমতা আছে?
মনে হয় আছে।
লোকটা কি অন্ধ?
হ্যাঁ।
শুভ্ৰ বলল, আমার মনে হয় না। সাজ্জাদ সাহেব নামের এক ভদ্রলোকের হাতে তিনি আতর দিয়ে দিলেন। যেখানে আন্তর মাখানো হয়। তিনি ঠিক সেখানে আন্তর মাখালেন; হাতের তালুতে না উল্টো পিঠে। কোনো অন্ধ এই কাজটা পারবে না।
মীরা বিরক্ত মুখে বলল, লোকটা অন্ধ।
ও।
শুভ্ৰ তোর সঙ্গে আমার খুব জরুরি কিছু কথা আছে। তুই কি কোনো একদিন আমাদের বাড়িতে চলে আসবি?
হ্যাঁ আসব।
তুই আছিস কেমন?
ভাল।
বাবার ব্যবসা দেখছিস?
হ্যাঁ।
কোনো সমস্যা বোধ করছিস?
এখনো না।
তোর কী মনে হয়— তোর কোনো সাহায্য বা পরামর্শ দরকার? প্রশ্নটা আগে একবার করেছিলাম। এখন আবার করলাম।
না মনে হয় না। সমস্যাগুলি আমার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। সমস্যাগুলিকে আমি দেখছি সেকেন্ড অর্ডার ডিফারেনশিয়েল ইকুয়েসনের মত। যার দুটা সলিউশন- দুটা উত্তর। একটা উত্তর রিয়েল আরেকটা ইমাজিনারি। অর্থাৎ একটা সত্যি উত্তর একটা মিথ্যা। আমার কাজ হচ্ছে কোন উত্তরটা সত্যি তা বের করা।
তোর কাছে পুরো ব্যাপারটা খুব একসাইটিং লাগছে?
হ্যাঁ।
তোর বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি- একটা অস্বস্থিকর প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করছে। করব?
হ্যাঁ কর।
যে বাহান্নজন মেয়ের কথা বলেছিলি তাদের সঙ্গে কি তোর দেখা হয়েছে?
বাহান্ন না এখন তিপান্ন- আমরা নতুন একটা মেয়ে কিনেছি।
মেয়ে কিনেছি মানে?
এগারো হাজার টাকায় অল্প বয়েসী একটা মেয়ে কিনেছি। আমাদের এ ধরনের ব্যবসায় সব সময় নতুন মুখ দরকার।
ও আচ্ছা।
মীরা হাত বাড়িয়ে গাড়ির ক্যাসেট চালু করল। তবলা এবং পাখোয়াদের যুগলবন্দি। শুনতে ইন্টারেস্টিং লাগছে। কিছুক্ষণ পর পর একজন আবার মুখে বোল দিচ্ছে। মূল তবলার চেয়ে বোলগুলি শুনতে ভাল লাগছে।
স্বপ্ন মনে রাখার ক্ষমতা
স্বপ্ন মনে রাখার ক্ষমতা জাহানারার অসাধারণ। অতি তুচ্ছ স্বপ্নও তাঁর মনে থাকে। ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই স্বপ্ন নিয়ে ভাবতে বসেন। স্বপ্ন তথ্যের উপর তাঁর দুটা বই আছে। একটার নাম স্বপ্ন ও তিলতত্ত্ব, অন্যটার নাম সোলেমানি খাবনামা। সোলেমানি খাবনামা বইটি তার অত্যন্ত প্ৰিয়। কারণ তাঁর বেশ কিছু স্বপ্ন সোলেমানি খাবনামায় দেয়া স্বপ্লের অর্থের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। সোলেমানি খাবনামায় লেখা মাঢ়ির দাঁত পড়তে দেখলে মুরুব্বি মারা যান। জাহানারা একবার মাঢ়ির দাঁত পড়া স্বপ্ন দেখলেন। তার এক সপ্তাহের মধ্যে তার দাদিজান মারা গেলেন।
