আমার কোনো স্পেশালিটি নেই।
অবশ্যই আছে। যাই হোক যদি কিছু থাকে তাহলে জানা যাবে। দোষ এবং গুণ দুটার কোনোটাই মানুষ লুকিয়ে রাখতে পারে না।
আপনার স্পেশালিটি কী?
আমার স্পেশালিটি হচ্ছে। আমি আখলাকের খালা। আখলাকের অনেক আত্মীয়স্বজনের মধ্যে একমাত্র আত্মীয় যে আখলাককে পছন্দ করে। আখলাক কোনো পার্টি দিয়েছে সেখানে আমি নেই তা কখনো হয় নি।
ও আচ্ছা।
আমাকে দেখে মনে হচ্ছে না আমি মদ্যপান করি, নানান রকম হুল্লোর করি? তা কিন্তু না। আমি মদ্যপান করি না। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে এক ওয়াক্তও নামাজ কাজ হয় নি। তোমার সঙ্গে পরে আবারো কথা হবে।
জ্বি আচ্ছা।
তুমি চুপচাপ বসে আছ কেন? সবার সঙ্গে গল্প গুজব করা। আজকের পার্টির স্পেশাল ফিচার কী তুমি জান?
জানি না।
আমিও জানি না। আখলাক বলেছে স্পেশাল ফিচার রাত দশটার দিকে বলবে। এতক্ষণ আমি থাকতে পারব না। আমার এক কাজিন আসছে, তাকে রিসিভ করতে হবে।
উনার পার্টিতে কি সবসময় কোনো স্পেশাল কিছু থাকে?
হ্যাঁ থাকে। এবং প্রতিবারই আখলাক আমাকে আগে ভাগে বলে শুধু আজ কিছু বলছে না। স্পেশাল ফিচার না জেনে চলে গেলে মনে খুঁতখুঁতানি থাকবে।
আপনি টেলিফোন করে জেনে নেবেন।
টেলিফোন তো ও ধরবে না। তুমি বোধহয় আখলাককে চেন না। আখলাক বাসায় কখনো টেলিফোন ধরে না। যত ইমার্জেন্সিই হোক ও টেলিফোন ধরবে না।
এলা এগিয়ে গেলেন। তিনি যাচ্ছেন। মীরার দিকে। শুভ্রর ধারণা তিনি মীরার কাছে যাচ্ছেন কারণ মীরার কাছ থেকে তথ্য সংগ্ৰহ করবেন। শুভ্ৰ বিষয়ক তথ্য। একদল মানুষ আছেন তথ্য সংগ্রহেই যাদের আনন্দ। ভ্রমর ফুল থেকে মধু সংগ্ৰহ করে চাক ভর্তি করে। এরা সংগ্রহ করেন তথ্য।
অন্ধ মেশকাত সাহেব জমিয়ে বসেছেন। পার্টির মূল কেন্দ্ৰবিন্দু মনে হচ্ছে তিনি। ধবধবে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবিতে তাকে ঋষি ঋষি লাগছে। পায়জামা পাঞ্জাবির মত তার চুল দাড়ি সবই সাদা। তিনি একটা পাতলা চাঁদর মাথার উপর দিয়ে রেখেছেন। অন্ধ মানুষ সাধারণত সানগ্লাস পরে চোখ ঢেকে রাখে। তাঁর চোখ খোলা। অন্ধদের চোখের মণি খুব একটা নড়াচড়া করে না। প্রয়োজন নেই বলেই নড়াচড়া করে না। যে-কোনো একটি দিকে দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে। এই ভদ্রলোকের দৃষ্টি সে রকম না। সাধারণ মানুষের মত তাঁর দৃষ্টি এদিক ওদিক ঘুরছে। দৃষ্টিহীনের চোখের অস্বাভাবিকতা তার চোখে নেই।
ব্যাপার কী ঘটছে দেখার জন্যে শুভ্ৰ এগিয়ে গেল। মেশকাত সাহেবের সামনে এক ভদ্রলোক কর্পেটে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। ভরিক্কী শরীরের মানুষ। চেয়ারে বসতে অভ্যস্ত বলে কার্পেটে বসে ঠিক আরাম পাচ্ছেন না। তার চোখে মুখে এক ধরনের শঙ্কার ভাব। ডেন্টিসের কাছে রোগী গেলে যেমন হয় তেমন।
মেশকাত সাহেব সামান্য বুকে এসে বললেন, জনাব আপনার নাম?
আমার নাম সাজ্জাদ। সাজ্জাদ হোসেন।
দেখি জনাব আপনার হাতটা।
ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে দিলেন। মেশকাত সেই হাত ধরলেন। অন্ধের হাতড়ে হাতড়ে ধরা না; সরাসরি ধরা। মেশকাত সাহেব হাত ধরেই ছেড়ে দিয়ে বললেন, এই হাত না জনাব। ডান হাত।
সাজ্জাদ সাহেব অপ্ৰস্তুত গলায় বললেন, সরি। আমি লেফট হ্যান্ডেড বলে সব সময় বাঁ হাত এগিয়ে দেই।
তিনি ডান হাত বাড়ালেন। এবার মেশকাত সাহেব হাত ধরলেন না; বাড়িয়ে রাখা ডান হাতের উল্টো পিঠে আতর মাখিয়ে দিলেন।
জনাব আতরের গন্ধটা কেমন বলুন তো?
আতরের গন্ধ যে রকম হয়। সে রকম। কড়া গন্ধ।
এই আতরের নাম মেশকাতে আম্বর।
সাজ্জাদ সাহেব একটু নড়েচড়ে বসে বললেন, এখন আমার সম্পর্কে কিছু কলুন।
কী বলব?
এই ধরুন আমার স্বভাব চরিত্র এই সব।
আপনার স্বভাব চরিত্রতো আপনি সবচে ভাল জানেন। আমি নতুন করে কী বলব?
আচ্ছা ঠিক আছে আমার অতীত সম্পর্কে কিছু বলুন।
আপনার অতীতও তো আপনি জানেন। এমনতো না যে আপনার অতীত আপনি জানেন না।
আমি জানলেও আপনার কাছ থেকে শুনি। আপনার ক্ষমতা সম্পর্কে অনেক শুনেছি। পরীক্ষা হয়ে যাক।
জনাব আমিতো পরীক্ষা দেবার জন্যে আসি নাই। আমি ছাত্র না, আর আপনারাও শিক্ষক না।
পাশের একজন বললেন, এ রকম করছেন কেন। দুএকটা কথা বলুন আমরা শুনে মজা পাই। ফর ফানস সেক।
একটু পরে বলি?
না না এখনি বলুন।
দেখি আপনার ডান হাতটা আরেকবার।
সাজ্জাদ সাহেব ডান হাত বাড়ালেন। মেশকাত দুহাতে ডান হাত ধরে চোখ বন্ধ করে কিছু সময় স্থির হয়ে থাকলেন।
আপনার ছেলে মেয়ে কী?
দুই মেয়ে।
ছোট মেয়েটির নাম কী?
সীমা।
সীমা কোন ক্লাসে পড়ে?
সে এ বছর ইন্টারমিডিয়েট দেবে।
সীমা কেমন আছে?
ভাল।
কেমন ভুল?
এ বয়সের মেয়েরা যতটা ভাল থাকে ততটা ভাল। গান শুনছে। হৈচৈ করছে। কলেজে যাচ্ছে।
সে কি গতকাল কলেজে গিয়েছিল?
আমার পক্ষেতো মেয়ে রোজ রোজ কলেজে যাচ্ছে কি যাচ্ছে না। সেই খোঁজ নেয়া সম্ভব না। হয়ত গিয়েছে।
সেতে গত কয়েকদিন ধরেই বিছানায় পড়ে আছে। তার তো বিছানা থেকে নামার শক্তি নেই।
কী বলছেন আপনি? আমার নিজের মেয়ে অসুস্থ আর আমি জানব না!
আপনি জানবেন না কেন আপনি জানেন। খুব ভাল করেই জানেন। এখন না জানার ভান করছেন।
সাজ্জাদ সাহেব বিস্মিত এবং খানিকটা ভীত চোখে তাকাচ্ছেন। শুভ্রের কাছে মনে হচ্ছে মেশকাত নামের অন্ধ মানুষটি পুরো পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। তার সামনে বসা সবাইকে খানিকটা অসহায় লাগছে। মেশকাত গম্ভীর স্বরে বললেন, সাজ্জাদ সাহেব! আপনার সঙ্গে টেলিফোন আছে না। মোবাইল টেলিফোন।
