শুভ্র।
শুভ্ৰ তাকালো। আখলাক সাহেব ঘরে ঢুকেছেন। ভদ্রলোক এর মধ্যেই পোশাক বদলেছেন। কালো প্যান্টের উপর লাল টকটকে হাফ শার্ট। হাফ শার্টের উপর সামার কোটের মত কোট। সামার কোটি পরার মত গরম নেই। কিন্তু ভদ্রলোককে সুন্দর লাগছে। লাল রঙের শার্টটা না পরলে তাঁকে এত সুন্দর লগত বলে মনে হয় না।
শুভ্র আপনার ভাগ্যটা খুব ভাল। মেশকাতকে পাওয়া গেছে।
আমার শুভাগ্য ভাল বলছেন কেন? তিনি কি বিশেষ করে আমার ভাগ্য বলার জন্যেই আসছেন?
উনি সবার ভাগ্য বলবেন। তাকে নিয়ে কড়াকড়ি পড়ে যাবে। পার্টি জমানোর জন্যে এ রকম দুএকজন মানুষ দরকার।
উনি কি সত্যি ভাগ্য বলতে পারেন?
আরে দূর। ভাগ্য কোথেকে বলবো? তবে যা বলে খুবই বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলে। শুনলেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে। মজাটা এই খানেই। একজন অন্ধ মানুষ। সাদা চুল, সাদা দাড়ি। ঋষি ঋষি চেহারা। গলার স্বরও অদ্ভুত। সব কিছু মিলিয়ে একটা রহস্য তৈরি হয়। রহস্যের কারণে সে কথা বললেই শুনতে ইচ্ছা করে।
পার্টি জমানোর জন্যে আপনি সব সময় এরকম কিছু মানুষ রাখেন?
হ্যাঁ রাখি। রাখতে হয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিয়ের কথাবার্তা অনুষ্ঠানে কিছু লোক ভাড়া করে আনা হয়। তাদের কাজ হচ্ছে গল্পগুজব করে আসর জমিয়ে দেয়া। এদের নাম— আলাপী। কাজেই দেখতে পাচ্ছেন পার্টি জমানোর ব্যাপারটা আমাদের কালচারেরই অংশ।
শুভ্ৰ হাসল। আখলাক সাহেব বললেন, আমি একা থাকি। আমার জন্যে পার্টি খুব দরকার। প্রচুর লোকজন, প্রচুর হৈচৈ। পার্টি যখন খুব জমে। তখন আমি আবারো একা হয়ে যাই। জনতার মধ্যেই আছে নির্জনতা। সেই নির্জনত রকম। আমার খুব পছন্দের নির্জনতা।
আখলাক সাহেব ঘড়ি দেখলেন। শুভ্ৰ বলল, আপনার লোকজন কখন আসবে?
দেরি আছে! আচ্ছা শুভ্ৰ আমিতো বয়সে অনেক বড়। আমি তোমাকে তুমি করে বলি?
বলুন। প্রথম যেদিন আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল সেদিনও শুরুতে আপনি আপনি করে বললেন পরে তুমিতে চলে গেলেন।
তাহলে তো ঠিকই আছে। তাহলে তুমি শুরু করা যাক। কেমন আছ শুভ্ৰ?
ভাল।
তোমাকে অনেক আগে আসতে বলেছি কেন আন্দাজ করতে পার?
জ্বি না। আমার অনুমান শক্তি ভাল না।
তোমাকে মীরা সম্পর্কে দুএকটা কথা জিজ্ঞেস করার জন্যেই আরো আগে আসতে বলেছি। তুমি ইচ্ছা করলে জবাব দিতে পার। আবার নাও দিতে পার। প্রশ্নগুলি করব?
জ্বি করুন।
প্রথম প্রশ্ন, তুমি কি মীরাকে বিয়ে করছ?
শুভ্ৰ খুবই অবাক হয়ে বলল, এই প্রশ্নটি করার কারণ কী?
কারণ হচ্ছে মীরাকে আমার দিকে আকৃষ্ট করার জন্যে আমি নানান ধরনের কায়দা কানুন করছি। কোনোটিই তেমন কাজ করছে না বলে আমার ধারণা হয়েছে সম্ভবত তুমি সূত্রধর।
সূত্রধর মানে?
সূত্রধর মানে, মীরার সুতা অনেকখানি তোমার হাতে। তুমি সুতা নাড়ছ বলে সে নড়ছে।
আপনার এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই। কারোর সুতাই আমার হাতে নেই। এমন কি আমার নিজেরটাও না।
এটাতো ভালই বলেছ।
আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন?
না। আমার প্রশ্নের জবাব সহজভাবে দেবার জন্যে ধন্যবাদ। এখন তুমি যদি কোনো প্রশ্ন করতে চাও করতে পার।
আমি কোনো প্রশ্ন করতে চাচ্ছি না। এবং পার্টিতেও থাকতে চাচ্ছি না। যে জন্যে আমাকে ডেকেছিলেন সেটা তো হয়েছে। আমাকেতো আর দরকার নেই।
খুব দরকার আছে। আমাকে মীরা একটি দায়িত্ব দিয়েছে, সেই দায়িত্ব এখনো পালন করতে পারি নি। পার্টি জমে উঠলে সেই দায়িত্ব পালন করব। কাজেই তোমাকে থাকতে হবে।
কলিং বেল বাজছে। আখলাক সাহেব বললেন, মীরা এসেছে। বলেই তিনি শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার নিম্ন ধরনের কিছু আধ্যাত্মিক ক্ষমতা আছে। বেলের শব্দ শুনে কে বেল টিপছে তা ধলে দিতে পারা হচ্ছে তার একটি। শুভ্ৰ তুমি কি আমার হয়ে দরজাটা খুলবে? মীরা দরজা খুলেই তোমাকে দেখে খুব খুশি হব এই জন্যে বলছি। I want to make her happy.
শুভ্র দরজা খুলল, মীরা আসে নি মোটাসোটা এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে দুটা শপিং ব্যাগ। শুভ্ৰ তাকাল আখলাক সাহেবের দিকে। তিনি হাসছেন। তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা কাজ করে নি দেখে মনে হচ্ছে তিনি খুশি।
পার্টি জমে উঠেছে। শুভ্র গুণে দেখেছে সব মিলিয়ে মোট আঠারো জন মানুষ। আঠারো জনের মধ্যে মীরাকে নিয়ে সাতজন মেয়ে। এই সাতজনের মধ্যে দুজনের বয়স খুবই কম। কিছুতেই সতেরো আঠারোর বেশি না। একজন মহিলার বয়স পঞ্চাশের উপরে। ইনি খুবই হাসি খুশি। সারাক্ষণ হাসছেন। গায়ে হাত না দিয়ে তিনি মনে হয় কথা বলতে পারেন না; যার সঙ্গে কথা বলছেন তারই হাত ধরে বা কাঁধে হাত রেখে কথা বলছেন; শুভ্ৰর সঙ্গেও তার কথা হল। শুভ্রের পিঠে হাত রেখে বললেন, এক্সকিউজ মি। আপনার নাম শুভ্ৰ না?
জ্বি।
আপনার সঙ্গে আগে কখনো দেখা হয় নি কেন? এই বাড়ির পার্টিতে যারা আসেন তাদের সবার সঙ্গেই আমার পরিচয়। আমার নাম এলা।
আমার যখন ত্ৰিশ বছর বয়স তখন আমার স্বামী মারা যান। তারপর আর বিয়ে করি নি। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে অভিজ্ঞতার জন্যে একটা মেয়ের একটি পুরুষই যথেষ্ট। একটা পুরুষকে চেনা মানে সব পুরুষকে চেনা।
সবাই এক রকম?
অবশ্যই। আপনার পরিচয়টা বলুন।
আমার কোনো পরিচয় নেই। আমার নাম শুভ্ৰ। নামতো আপনি এর মধ্যেই জেনেছেন। মীরার সঙ্গে আমি এ বছর পাশ করেছি।
তাহলে তো তোমাকে কিছুতেই আপনি বলা যায় না। মীরা আমাকে রাগাবার জন্যে গ্রান্ড মা ডাকে। ইচ্ছা করলে তুমিও গ্রান্ড মা ডাকতে পার। ভাল কথা, আখলাকের পার্টিতে যারা আসে তাদের সবারই কোনো-না-কোনো স্পেশালিটি থাকে। তোমার স্পেশালিটি কী?
