পারতেছি।
না পারার কোনোই কারণ নেই। অংকটা জটিল না। সহজ অংক। শুধুই যোগ বিয়োগ। আপনার মত বুদ্ধিমান একজন মানুষ সহজ যোগ বিয়োগ জানবেন না তা হয় না। আচ্ছা যান। আপনার নামাজের সময় পার হয়ে যাচ্ছে।
আমার তাহলে চাকরি নাই?
না।
এই মাসটাতো আমি থাকব?
না থাকবেন না; মাগরেবের নামাজ পর্যন্ত আপনার চাকরি। নামাজের পর চাকরি নেই।
ছোট বাবু তুমি খুব ভুল করতেছ।
হয়ত করছি। শুদ্ধ করে করে কিছু শেখা যায় না। আমাকে শিখতে হবে ভুল করতে করতে। যত বড় ভুল করব তত বেশি শিখব। আচ্ছা আপনি এখন যান।
তুমি কি আছ কিছুক্ষণ, না বাসায় চলে যাবে?
বাসায় এখন যাব না। আমার এক জায়গায় নিমন্ত্রণ আছে। আর্কিটেক্ট আখলাক সাহেব আমাকে দাওয়াত করেছেন। সেখানে যাব। সেখান থেকে বাসায় ফিরব।
বন্ধুর বাসায় কখন যাবে?
এখনই যাব।
একটু দেরি করে যাও। তোমাকে খুবই জরুরি কিছু কথা বলা দরকার। আমাদের যে ব্যবসা সেখানে নানান রকম গ্রুপিং আছে। এগুলি জানা না থাকলে খুব সমস্যা। আমি এমন অনেক কিছু জানি যা বড় সাহেবও জানতেন না।
একটা বিষয় কর্মচারী জানবে অথচ মালিক জানবে না এটাতো ঠিক না।
তোমার বাবা ছিলেন এক রকম মানুষ, তুমি অন্য রকম। তোমার বিষয়ে ভিন্ন ব্যবস্থা হবে। তোমার এডমিনস্ট্রেশনে কর্মচারী যা জানবে মালিকও তাই জানবে।
না। আমার এডমিনস্ট্রেশনে তার মালিক কর্মচারীদের চেয়েও অনেক বেশি জানবে। আচ্ছা ঠিক আছে আপনি যান। মাগরেবের ওয়াক্ত খুব অল্প সময়ের জন্যে থাকে। আপনার সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
ছালেহ দাঁড়িয়ে আছেন। যাচ্ছেন না। শুভ্র বলল, কিছু বলবেন?
ছালেহ শান্ত গলায় বললেন, তুমি তোমার বাবার ব্যবসা ভালই চালাবে।
শুভ্র বলল, থ্যাংক য়্যু।
আপনি একা থাকেন
আপনি একা থাকেন?
না। এইত এখন আপনি আছেন। আপনাকে নিয়ে দুজন।
আখলাক সাহেব হাসলেন। ভদ্রলোকের দাঁত সুন্দর। টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের মত না হলেও সুন্দর। যারা খুব সিগারেট খায় তাদের দাঁত এত পরিষ্কার থাকে না। হলুদ ছোপ পড়ে— স্ম্যোকারস টিথ। আখলাক সাহেব খুব সিগারেট খান। দশ মিনিটও হয় নি শুভ্র এ বাড়িতে এসেছে। এর মধ্যেই আখলাক সাহেব তিনটা সিগারেট শেষ করে চতুর্থ সিগারেট ধরাচ্ছেন। তাঁর দাঁত এত পরিষ্কার থাকার কথা না।
শুভ্ৰ আমার বাড়িটা কেমন?
খুব সুন্দর। আপনি যদি কখনো বাড়ি বানান তাহলে কি এরকম একটা বাড়ি বানাবেন?
না।
বাড়িটা যদি খুব সুন্দর হয়ে থাকে তাহলে এমন বাড়ি বানাবেন না কেন?
শুভ্র বলল, বাড়িটা অচেনা লাগছে।
আখলাক সাহেব বললেন, কিছুদিন বাস করলে কি চেনা লাগবে না?
না লাগবে না। যে বাড়ি প্রথমদিন অচেনা লাগে সেই বাড়ি শেষ দিনও অচেনা লাগে।
আখলাক সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে সহজ গলায় বললেন, আপনার কথা ঠিক। পেতলের ঘণ্টায় আপনি বাড়ি দিলেন। একটা শব্দ হল। প্ৰথম বাড়িতে যে শব্দটা হবে, শেষবাড়িতেও একই শব্দ হবে।
শুভ্র বলল, আমি কি অনেক আগে চলে এসেছি?
আখলাক সাহেব বললেন, না, আপনি ঠিক সময়মতই এসেছেন। আমি একেকজনকে একেক সময়ে আসতে বলেছি।
পার্টি শুরু হবে কখন?
পার্টি শুরু হয়ে গেছে। যেই মুহুর্তে আপনি কলিং বেলে হাত দিলেন, পার্টি শুরু হয়ে গেল। আপনাকে সবার আগে আসতে বলেছি কারণ আপনার সঙ্গে আমি বেশি সময় কাটাতে চাই।
পার্টিতে কারা আসবেন?
অনেকেই আসবেন। একজন দুজন ছাড়া আপনি কাউকে চেনেন বলে মনে হয় না। এটাই মজার। কেউ কাউকে চেনে না, আবার সবাই সবাইকে চেনে। আচ্ছা শুভ্ৰ আপনি কি পাঁচ মিনিট একা একা বসে থাকতে পারবেন?
পারব।
আমি গত তিনদিন ধরে মেশকাত নামের একজনকে ধরার চেষ্টা করছি। তাকে পার্টিতে হাজির করতে পারলে দারুণ ব্যাপার হবে। মেশকাত ভবিষ্যৎ বলতে পারে। একটা মোবাইল নাম্বার কিছুক্ষণ আগে পেয়েছি, চেষ্টা করে দেখি। আপনি বরং কফি খান। কফি পটে কফি আছে। আমি বানিয়ে দেব?
না আমি বানিয়ে নেব। You take your time.
আখলাক সাহেব দোতলায় উঠে গেলেন। বাড়িটা ড়ুপ্লেক্স টাইপ। একতলা দোতলা মিলিয়ে থাকার ব্যবস্থা। একতলায় রান্নাঘর এবং হলঘরের মত বড় একটা বসার ঘর। বসার ঘর জাপানি কায়দায় সাজানো। সোফা নেই- কার্পেট এবং কার্পেটের উপর নানান ধরনের বাহারি গদি। দেয়ালে কিছু পেইনটিং আছে– সবই জাপানি ছবি। চেরী ফুল ফুটেছে। জাপানি ললনা কিমানো পরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ছোট ছোট চোখে রাজ্যের বিস্ময়! পাতলা ঠোঁটে রহস্যময় হাসি।
বসার ঘরের সঙ্গেই খাবার ঘর। খাবার ঘরটা তুলনামূলকভাবে ছোট। ঘরের মাঝখানে বড় একটা ডাইনিং টেবিল। ডাইনিং টেবিলের সঙ্গে কোনো চেয়ার নেই। টেবিল ভর্তি স্নেকস জাতীয় খাবার, পটেটো চিপস, পনীর, শুকনো মাংস, নানান ধরনের ভাজ্যভুজি। ডাইনিং রুমের দেয়ালে দামি ফ্রেমে একটাই ছবি। যে কারণে চট করে ছবির দিকে চোখ যায়। ছবিটা জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের ছবি। ডাষ্টিবিনে মানুষ এবং কুকুর একসঙ্গে খাবার খুঁজছে। খাবার ঘরে এ রকম একটা ছবি ঝুলিয়ে রাখার পেছনে আখলাক সাহেবের নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য আছে। ভদ্রলোক উদ্দেশ্যহীন কোনো কাজ করেন বলে মনে হয় না। কিংবা হয়ত উদ্দেশ্যহীনভাবেই সব কাজ করেন। অথচ মনে হয় কাজটার পেছনে কোনো উদেশ্য আছে!
বাড়িটা বেশ বড় হলেও লোকজন নেই। এপ্রন পরা একটি মেয়েকে রান্নাঘরে দেখা যাচ্ছে। মেয়েটা আখলাক সাহেবের কোন আত্মীয়া না কাজের মেয়ে তা শুভ্র ঠিক বুঝতে পারছে না। মেয়েটা দেখতে সুন্দর। চেহারায় মায়া ভাব অত্যন্ত প্রবল। শুভ্রর সঙ্গে একবার মেয়েটির চোখচুখি হল। মেয়েটি ভুরু কুঁচকে এমনভাবে তাকাল যার অর্থ – এই যে ভদ্রলোক! আপনি এভাবে আমাকে দেখছেন কেন? আমি আমার কাজ করছি। আপনি আপনার কাজ করুন। শুভ্ৰ লজ্জা পেয়ে কফির মগ হাতে বসার ঘরে চলে এল।
