যদিও আঁৎকে উঠে পা সরিয়ে নেয়াই ছিল স্বাভাবিক রিফ্লেক্স একশান।
শুভ্ৰ শান্ত গলায় বলল, কেমন আছ চায়না?
চায়না মাথা নিচু করে বলল, ছোট সাহেবের দোয়া।
শুভ্ৰ বলল, মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলবে না। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বল। আমি চোখের উপর চোখ না রাখলে কথা বলতে পারি না।
চায়না তাকাল। স্বাভাবিক মানুষের চোখ। কোনো বিশেষত্ব নেই, কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। চেহারাও সাধারণ। রোগা, লম্বা। শুধু গলাটা অস্বাভাবিক লম্বা। গায়ের রঙ ফর্সা। রোদে পুড়ে রঙ জ্বলে গেছে। গায়ে খয়েরি রঙের গেঞ্জি। পরনে ঢোলা প্যান্ট। পায়ে কাপড়ের জুতা। জুতা জোড়া মনে হচ্ছে আজই কেনা হয়েছে। ঝকঝক করছে।
চায়না তোমার বয়স কত?
হিসাব নাই। চল্লিশ হতে পারে। আবার বেশিও হইতে পারে।
বিয়ে করছ?
জ্বি।
ছেলেমেয়ে আছে?
একটা মেয়ে।
মেয়ের নাম কী?
জরিনা বেগম।
জরিনা বেগমের বয়স কত?
হিসাব নাই। এগারো বার বছর হইব।
তোমার ভাল নামটা কী?
ভাল নাম ফজলু। এই নামে কেউ চিনে না। সবাই আমারে চায়না ভাই নামে জানে।
নামের পেছনে ভাই কেন?
আমারে খাতির কইরা ভাই ভাই ডাকত। এই ভাই ভাই ডাক থাইক্যা। আমি হইলাম চায়না ভাই।
চায়না নামটা কী চীন থেকে এসেছে?
জ্বে না। বাপ মা চায়না, এই থাইক্যা চায়না।
সবাই এখন চায়না ভাই ডাকে?
জ্বি।
জরিনীও কি তোমাকে চায়না ভাই ডাকে?
জরিনা কে?
জরিনা হচ্ছে তোমার মেয়ে। জরিনা বেগম। যার বয়স দশ এগারো।
চায়না কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে হঠাৎ সব দাঁত বের করে হেসে ফেলল। ছোট সাহেবের সামনে বেয়াদবি হচ্ছে। সে হাসি সামলাবার চেষ্টা করুল। পারল না; হাসির মধ্যেই বলল— ছোট সাহেব এক্কেবারে আসল জায়গায় হাত দিছেন। জরিনাও আমারে চায়না ভাই ডাকে। একদিন দিলাম ধমক। বললাম, বাপারে ভাই ডাকিছ? এমন আছাড় দিব। মেয়ে খলবলাইয়া হাসে। এই একজনরে দেখলাম আমারে ভয় পায় না।
আর সবাই ভয় পায়?
জ্বি পায়।
আমার বাবা কি ভয় পেতেন?
বললে বেয়াদবি হবে। কিন্তু সত্য কথা হইল। উনি ভয় পাইতেন।
আমি? আমি কি তোমাকে ভয় পাচ্ছি?
জ্বি না।
কেন ভয় পাচ্ছি না সেটা বলতে পারবে?
যে নিজেরে ভয় পায় সে অন্যেরে ভয় পায়। যে নিজেরে ভয় পায় না, সে কারোরেই ভয় পায় না।
আচ্ছা ঠিক আছে তুমি যাও। চায়না শোন আমার পায়ের পাতায় আর কখনো চুমু খাবে না। আমার ভাল লাগে না।
কদমবুসি করি?
কর।
চায়না ভাই শুভ্ৰকে কদমবুসি করে বের হয়ে গেল। তাকে উৎফুল্ল এবং আনন্দিত মনে হল। নতুন মালিক তার পছন্দ হয়েছে। বেশ পছন্দ হয়েছে।
শুভ্ৰ সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসের কাগজপত্র দেখল। পুরনো ফাইল ঘটিল। ক্যাশিয়ারের সঙ্গে কয়েক দফা বসল। এর মধ্যে লালবাগ থানার ওসি সাহেব এসেছিলেন খালি হাতে আসেন নি, ফুলের তোড়া নিয়ে এসেছিলেন, তাঁর সঙ্গে চা খেতে খেতে গল্প করল। টেলিফোনে কথা হল ওয়ার্ড কমিশনার সাহেবের সঙ্গে হাজি সুরত আলী]। ওয়ার্ড কমিশনার আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন- আপনি কোনো রকম দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনার পিতা অতি বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। আমাদের আপনার মানুষ। আপনিও আমাদের নিজের লোক। সুখে শাস্তিতে বাস করতে হলে মিল মুহকবতটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ইনশাল্লাহ মিল মুহকবতের সঙ্গে আমরা কাজ করব। আপনি আমারে দেখবেন। আমি দেখােব আপনারে। এবং আমাদের দুইজনরে দেখবেন আল্লাহপাক। যিনি দিন দুনিয়ার মালিক। ভদ্রলোক টেলিফোন কাঁপিয়ে হাসলেন। শুভ্রও তার সঙ্গে গলা মিলিয়ে হাসল।
সন্ধ্যার পর শুভ্র ম্যানেজারকে ডেকে পাঠাল। ছালেহ ঘরে ঢুকে উদ্বিগ্ন গলায় বলল, কোন সকালে এসেছ, সন্ধ্যা হয়ে গেছে এখন বাসায় যাও!
শুভ্র বলল, যাচ্ছি। যাবার আগে আপনার সঙ্গে একটু কথা বলে যাই। আপনি বসুন।
মাগরেবের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। যা বলার তাড়াতাড়ি বল।
কথা অল্পই বলব আপনার নামাজের ওয়াক্ত থাকবে। দাঁড়িয়ে থাকবেন না। বসুন।
ছালেহ বসল। শুভ্ৰ শান্ত গলায় বলল, আপনাকে আমি বলেছিলাম। ময়না পাখির খাঁচাটা আসমানীকে ফেরত দিতে। আপনি ফেরত দেন নাই।
কোনো প্রয়োজন নাই।
প্রয়োজন আছে কি-না সেটা বড় কথা না। বড় কথা হল আপনাকে যা কাজটা করতে বলা হয়েছে সেই কাজটা আপনি করেন নি।
কিছু কাজ কর্ম আছে নিজের বিবেচনায় করতে হয়।
এই অফিসে কাজ করত একজন বুড়ো লোকের খোঁজ বের করতে বলেছিলাম। সেটি করেছেন?
আজইতো বললা। এত তাড়াহুড়ার কী আছে?
যাই হোক আমি ভদ্রলোকের ঠিকানা খুঁজে বের করেছি। আপনি অফিসে সারাদিন বসেই ছিলেন এর মধ্যে কাজটা করে ফেলা যেত।
আমার কাজকর্ম কি তোমার পছন্দ হচ্ছে না?
আপনি বাবার পুরনো কর্মচারী এবং অত্যন্ত বিশ্বাসী। ব্যবসা খুব ভাল বুঝেন। কিন্তু আপনার কাজকর্ম আমার পছন্দ না। আপনাকে আমি অফিসে রাখব না। অনেকগুলি কারণে রাখব না, তার মধ্যে একটা তুচ্ছ কারণও আছে। তুচ্ছ কারণটা হল আপনি ছোটবেলা থেকে আমাকে দেখেছেন। তখন তুমি তুমি করে বলতেন। এখনো বলেন। কোনো কর্মচারী মালিককে তুমি করে বললে অন্যদের উপর তার প্রভাব পড়ে। পড়ে না?
পড়ে।
আপনাকে বরখাস্ত করার আরেকটা কারণ বলি। এই কারণটা তুচ্ছ না, বড় কারণ। কারণটা মন দিয়ে শুনুন- আপনি অফিসের খুবই ক্ষমতাবান একজন মানুষ। এই অফিসে আমাকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলে ক্ষমতাধর একজনকে তাৎক্ষণিকভাবে সরাতে হবে। তবেই বাকি সবাই ধাক্কার মত খাবে; আমার কথাগুলি কি বুঝতে পারছেন?
