শুভ্ৰ পানির বোতল থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে বলল, না।
অফিসের সবাইকে ডাকি। সবার সঙ্গে কথা বল।
কথা বলার দরকার কী?
দরকার আছে। সবাই অপেক্ষা করে আছে তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্যে।
আপনাকে এত চিন্তিত লাগছে কেন?
চিন্তার অনেক কারণ আছে।
কারণগুলি বলুন শুনি।
অনেক টাকা বাইরে। আদায় বন্ধ।
কেন?
বড় সাহেব মারা গেছেন, সবাই ভাবছে ব্যবসা শেষ।
বাবার কী কী ব্যবসা ছিল?
ইটের ভাটা আছে, আর ট্রান্সপোটের ব্যবসা কিছুদিন করেছেন। এখন বন্ধ। চারটা ট্রাক ছিল, তিনটা স্যার থাকতেই বিক্রি হয়ে গেছে। কনস্ট্রাকশানের ব্যবসা মাঝে করেছেন। স্যারের ব্যবসাবুদ্ধি ভাল ছিল না। স্যারের একটা ব্যাপার ছিল লোকজন পছন্দ করতেন। তিনি থাকতেন নিজের মত কিন্তু চাইতেন। অনেক পুনু আশেপাশে থাকবে। রোজ নটার আগে অফিসে আসতেন থাকতেন।
এতক্ষণ কী করতেন? আমি যে চেয়ারে বসে আছি সেই চেয়ারে বসে থাকতেন?
চেয়ারে বসে থাকতেন। বিছানায় শুয়ে থাকতেন। তিনি ঝামেলা পছন্দ করতেন না।
শুভ্ৰ পানির বোতল খুলে গ্লাসে পানি ঢালিল। তার পানির তৃষ্ণা হয় নি। কিন্তু ভরা পানির বোতল দেখে এক চুমুক পানি খেতে ইচ্ছা করছে।
ম্যানেজার সাহেব!
বল, কী বলবা।
ছোটবেলায় আমি প্ৰায় এই অফিসে আসতাম।
জানি।
বুড়ো এক ভদ্রলোক আমাকে স্কুল থেকে অফিসে নিয়ে আসতেন। ভদ্রলোক খুব জর্দা খেতেন। আপনি কি ঐ বুড়ো ভদ্রলোক সম্পর্কে কিছু জানেন?
না।
বাবার অফিসেই চাকরি করতেন। অফিসের পুরনো কর্মচারীরা হয়ত জানবে। কিংবা অফিসে রেকর্ডপত্রও থাকতে পারে। একটু খোঁজ করে দেখবেন? আজই দেখবেন।
কারণটা কী?
কোনো কারণ নেই এমনি খোঁজ করা।
ও আচ্ছা।
বাবার অফিসে অনেক দিনের পুরনো কর্মচারী কারা আছেন?
কেউ নেই। স্যারের একটা স্বভাব হল বেশিদিন কাউকে চাকরিতে রাখতেন না। স্যার বেঁচে থাকলে আমার চাকরিও থাকত না।
বাবার মৃত্যু তাহলে আপনার জন্যে ভালই হয়েছে।
ছিঃ ছিঃ এইসব কী বল?
আমি ঠাট্টা করছি। আপনি এখন ঘর থেকে যান। আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকব। দুপুরে আমি অফিসেই খাব।
ব্যাংকের হিসাবপত্র দেখবে বলেছিলে ক্যাশিয়ারকে আসতে বলব?
না। দুপুরের পর।
আচ্ছা। দুপুরে কী খাবে?
বাবা কী খেতেন?
স্যারতো দুপুরে কিছু খেতেন না। কয়েক টুকরা পেপে, একটা টেষ্ট বিসকিট এক কাপ চা।
আমিও তাই খাব। বাবার জীবন ধারণ পদ্ধতি অনুসরণ করে দেখব।
আচ্ছা।
শুভ্ৰ চেয়ার ছেড়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ম্যানেজার সাহেব আমি আরেকটা ব্যাপার আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি— বাবা কি কোনো নেশা করতেন?
না।
শুভ্র বলল, আমার ধারণা করতেন। মদের নেশার কথা বলছি না, তারচেয়েও খারাপ কোনো নেশা। যেমন ধরুন আফিং। তিনি কি মাঝে মধ্যে আফিং খেতেন?
ম্যানেজার নিচু গলায় বলল, আমি জানি না।
অফিসের সবাইকে নিয়ে বিকেলের দিকে বসব। চা খাব। সব মিলিয়ে আপনারা কত জন?
পনেরো বিশজন হবে।
সবাইকে ডাকবেন। কেউ যেন বাদ না পড়ে।
আচ্ছা। ওসি সাহেবকে আসতে বলে দিয়েছি উনি দুপুরের দিকে আসবেন।
ওসি সাহেবকে কেন?
থানাওয়ালা ছাড়া আমাদের গতি নাই। উনাদের সাথে আমাদের মাসিক বন্দোবস্ত আছে।
তাদের কী পরিমাণ টাকা দেওয়া হয়?
ভালই দেয়া হয়।
টাকা পয়সার লেনদেন কে করে? ক্যাশিয়ার সাহেব না আপনি।
আমি। পুলিশের আরো বড় অফিসার যারা আছে তাদের সাথে বড় সাহেব লেনদেন করতেন। এখন তুমি করবা। তুমি করতে না চাইলে আমিতো আছিই।
বড় অফিসাররাও এর মধ্যে আছে?
আছে। আমাদের যোগাযোগ কনষ্টেবল থেকে শুরু করে এক্কেবারে মাথা পর্যন্ত।
ভালো তো। লেজ থেকে মাথা।
নারকোটিসওয়ালদের টাকা খাওয়াতে হয়। বলতে গেলে টাকার খেলা।
ভাল।
পলিটিক্যাল পার্টিকে টাকা দেই। মাস্তান আছে কিছু। এরা অবশ্যি আমাদের নিজেদের।
আমাদের নিজেদের মানে?
আমাদের ব্যবসার যা ধাত এতে মাস্তান পুষতে হয়।
কতজন আছে?
আছে কিছু।
সংখ্যাটা কত।
আট নয় জন হবে। কমও হতে পারে।
সঠিক সংখ্যা বলতে পারবেন না?
না। লিডারের উপর নির্ভর। আমরা লিডার রেখে দেই। সে তার দল চালায়। দলে কতজন থাকবে না থাকবে এটা তার ব্যাপার।
আমাদের যে লিডার তার নাম কী?
চায়না ভাই।
কী ভাই?
চায়না ভাই। ডাবল মার্ডারের আসামি। থানায় তার নামে এগারোটা মামলা আছে। খুনের মামলা তিনটা।
আমাদের দলের লিডার হল খুনের মামলার পলাতক আসামি।
হুঁ।
পুলিশ তাকে ধরছে না?
ধরবে কী ভাবে? পুলিশও তো আমাদের। চায়না ভাই এর বাড়িতে মাঝে মধ্যে পুলিশ রেড হয়। পুলিশ আগে ভাগে আমাদের খবর দিয়ে রাখে। কোনো অসুবিধা হয় না।
ভয়ঙ্কর একজন ফেরারি আসামিকে দলের লিডার বানাতে হল?
যে রকম দল সে রকম লিডার। তবলিগ জামাতের লিডার দিয়েতো আর মাস্তানদের দল চালানো যায় না? নৌকা যেমন মাঝিও লাগে সে রকম। পানশি নৌকার একরকম মাঝি। দৌড়ের নৌকার আরেক রকম মাঝি। চায়না ভাই অফিসে এসেছে। তুমি কথা বলবে?
হ্যাঁ কথা বলব।
এখন কথা বলবো? না পরে পাঠাব?
এখনই বলব।
তোমাকে আরেকটা কথা বলা হয় নাই। আমরা নতুন একটা মেয়ে খরিদ করেছি; পাঁচিশ হাজার টাকায় খরিদ করেছি।
তার মানে?
আমাদের যে ব্যবসা তাতে সব সময় নতুন মুখ লাগে। মেয়েটা খুবই সুন্দরী। বয়স পনেরো ষোল। ফরিদপুরের মেয়ে।
এখন তাহলে আমাদের মেয়ের সংখ্যা তিপান্ন?
জ্বি।
চায়না ভাই ঘরে ঢুকে শুভ্রর পায়ের উপর উপুড় হয়ে গেল। শুভ্র কিছু বোঝার আগেই সে শুভ্রর দুপায়ের পাতায় চুমু খেয়ে ফেলল। শুভ্ৰ পা সরিয়ে নিল না।
