রিকশায় আসার সারা পথ তিনি শুবরুর সঙ্গে গল্প করতেন। হাত টাত নেড়ে গল্প। যেন শ্রোতা শুধু শুভ্ৰ একা না, আরো অনেকে। অধিকাংশ গল্পই ধর্ম বিষয়ক।
বুঝলা শুবরু, দুই ফিরিস্তা ছিল নাম হারুত আর মারুত। দুইজনেই ছিল বড় পবিত্র।
পবিত্র কী?
পবিত্র বুঝলা না? যেটা নোংরা ময়লা সেটা অপবিত্র, যেটা পরিষ্কার সেটা পবিত্র। এই যে তুমি সুন্দর জামা কাপড় পরে রিকশায় বসে আছা তুমি পবিত্র? তুমি যদি রিকশায় না বসে নর্দমার দূষিত পানিতে বসে থাকতা তুমি হইতা অপবিত্র।
দূষিত পানি কী?
দূষিত পানি হইল অপবিত্র পানি। পবিত্ৰ পানি হইল টলটলা পানি।
টলটলা পানি কী?
টলটলা পানি হইল…
বৃদ্ধ ভদ্রলোকের ধৈর্য ছিল সীমাহীন। তিনি ব্যাখ্যা করতে করতে গল্প নিয়ে এগুতেন। শুভ্ৰ তাকে কখনোই বিরক্ত হতে দেখে নি। ধৈর্যহারা হতে দেখে নি। ভদ্রলোক তাকে অফিসে এনে চেয়ারে বসাতেন। রিকশা থেকে নামিয়ে চেয়ারে বসানো কাজটা করতে তার কষ্ট হত। কারণ শুভ্ৰকে তিনি কোল থেকে নামাতেন না। শুভ্ৰ যতই বলত আমি হেঁটে যেতে পারব তিনি বলতেন, অবশ্যই পারব্বা, কেন পারব না? তুমি যেমন হেঁটে যেতে পারব আমিও তেমন কোলে করে নিতে পারব।
শৈশবে শুভ্ৰকে প্রায়ই সন্ধ্যা পর্যন্ত বাবার অফিসে থাকতে হত। জাহানারা বেশির ভাগ সময় খুবই অসুস্থ থাকতেন। কোনো একটা অপারেশন হয়েছে যে কারণে হাসপাতালে, কিংবা অপারেশন ছাড়াই হাসপাতালে। মোতাহার সাহেবের হাসপাতাল ভীতি ছিল। তিনি কিছুতেই ছেলেকে হাসপাতালে পাঠাতেন না। হাসপাতাল কাউকে একবার ছয়ে দিলে তাকে বারবার হাসপাতালে যেতে হয়। মোতাহার সাহেব এই তথ্য মনেপ্ৰাণে বিশ্বাস করতেন।
অফিস ঘিরে বসে থাকতে শুভ্রর খুব খারাপ লাগত না। বৃদ্ধ ভদ্রলোক নানানভাবে শুভ্ৰকে ব্যস্ত রাখতেন। বেশির ভাগই গল্প বলে—
বুঝলা শুবরু সাইন্ধ্যাকালে আসমানে যে তারা দেখা যায়। তার নাম জান?
ইভিনিং স্টার?
হয়েছে। বাংলায় বলে শুকতারা। আরবিতে বলে- আয জোহরা। আসলে এটা তারা না।
এটা কী?
আয জোহরা হল এক আরব রমণী। সে মস্ত বড় একটা পাপ করেছিল বলে তাকে তারা বানায়ে আকাশে ঝুলায়ে দেয়া হয়েছে। তার জন্যে শাস্তি।
কে ঝুলায়েছে?
কে আবার? আল্লাহপাক ঝুলায়েছেন। রোজ হাশর পর্যন্ত তাকে এইভাবে ঝুলে থাকতে হবে।
রোজ হাশর কী?
রোজ হাশর হল মহাবিচারের দিন।
মহাবিচার কী?
মহাবিচার হল আল্লাহপাকের বিচার…. উনার বিচারকে ভয় পাবার কিছু নাই। উনি দয়ালু বিচারক। অপরাধ করলেও উনি ক্ষমা দিয়ে দেন। সবাই তাঁর কাছে মাফ পায়। নামেই তিনি বিচারক, আসলে তিনি ক্ষমারক।
ক্ষমারক কী? যিনি ক্ষমা করেন। তিনিই ক্ষমারক।
বৃদ্ধ শুভ্রর সকল প্রশ্নের জবাবই হয়ত দিতেন, কিন্তু তিনি এক বর্ষাকালে অসুখে পড়ে গেলেন। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল সর্দি জ্বর। বৃষ্টি পানি বৃদ্ধদের সহ্য করে না। বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লেগেছে। পরে দেখা গেল ব্যাপার তারচেয়েও জটিল। এক সময় ডাক্তাররা সন্দেহ করলেন ক্যানসার। বৃদ্ধ মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হয়ে শয্যা গ্রহণ করলেন। এবং তিনটি জিনিশের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন—
মৃত্যু
জর্দা ভর্তি পান
এবং
শুভ্র
জর্দা দিয়ে পান তাঁর জন্যে নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন শেষ সময়ে দয়াপরবশ হয়ে কেউ হয়ত মুঠো ভর্তি জর্দা দিয়ে এক খিলি পান বানিয়ে তাকে দেবে। শুভ্ৰকে তার কাছে আসতে দেয়া হবে না, এটা কখনো ভাবেন নি। দিনের পর দিন তিনি খবর পাঠাতেন— পাঁচ মিনিটের জন্যে কি শুভ্ৰকে তার কাছে পাঠানো যায়। মাত্ৰ পাঁচ মিনিট। তিনি ছেলেটার সঙ্গে দুটা কথা বলবেন। এর বেশি কিছু না।
জাহানারা ক্যানসার রোগীর কাছে ছেলেকে পাঠানোর চিন্তা এক সেকেন্ডের জন্যেও মনে স্থান দিলেন না। অবোধ শিশু মৃত্যুর ভয়াবহ রূপ দেখে ভয় পাবে। কী দরকার? শৈশবের ভয় চিরস্থায়ী হয়ে যায়। মানুষের মনে নানান ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করে। জটিলতার ভেতর দিয়ে যাবার কোনো দরকার নেই।
শুভ্ৰ জানতেও পারল না। মৃত্যুপথযাত্রী এক বৃদ্ধ কী গভীর মমতা নিয়েই না তার জন্যে দিনের পর দিন প্ৰতীক্ষা করেছে।
শুভ্ৰ আজ অফিসে আসবে এই খবরটা অফিসের সবাই জানে। ঝাড়ুদার সকালবেলা একবার অফিসে ঝাড়ু দিয়েছিল। এগারেটার দিকে আবার অফিস ঝাড়ু দিয়ে ফেলল। মোতাহার সাহেবের খাস কামরা শুধু যে ঝাঁট দেয়া হয়েছে তাই নয়, পুরো এক কোটা এয়ার ফ্রেশনার ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। জানালা এবং দরজায় নতুন পর্দা লাগানো হয়েছে। বড় বড় ফুল তোলা রঙিন পর্দাঁ। অফিসের কর্মচারীরাও আজ একটু ফিটফাট হয়ে এসেছে। আজ একটা বিশেষ দিন। অফিসের মালিকানা বদল হচ্ছে। ছোট সাহেব অফিসে বসবেন। কে জানে আগের চেয়ে সব কিছু হয়ত অনেক ভালভাবে চলবে। অন্তত আশা করতে তো দোষের কিছু নেই।
মোতাহার সাহেবের ঘরে শুভ্ৰ বসেছে। এসি ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এসিতে গ্যাস নেই বলে শো শো শব্দই হচ্ছে, ঘর ঠাণ্ড হচ্ছে না। শুভ্রর সামনে খালি একটা গ্লাস। গ্রাসের পাশে মিনারেল ওয়াটারের বোতল। বোতলটা ফ্রিজ থেকে বের করা হয়েছে। বোতলের গায়ে বিন্দু বিন্দু পানি জমছে। দেখতে ভাল লাগছে। শুভ্র এমনভাবে বোতলের দিকে তাকিয়ে আছে যেন বোতলের গায়ে পানি জমার অপূর্ব দৃশ্য সে অনেকদিন দেখে নি।
শুভ্রর সামনে ম্যানেজার ছালেহ উদ্দিন বসেছেন। তাঁর চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। শুভ্ৰ কদিন থেকেই ম্যানেজারের দুশ্চিন্তা লক্ষ্য করছে। কিছু জিজ্ঞেস করে নি। ছালেহ উদ্দিন সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, ছোট বাবু চা বা কফি খবো?
