শুভ্ৰ মাথার চুল টানতে টানতে বলল, কী করেছি মনে পড়ছে না। হয়ত হাসি মুখে তাকিয়েছি। হয়ত বলেছি- আপনি কেমন আছেন। এতেই বেচারা মহাখুশি হয়েছে। কিছু মানুষ আছে খুব অল্পতে খুশি হয়।
তোর বাবা তাকে খাতির করে অফিসে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গেল। বিতং করে বলল, মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। সে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেবে। এটা আরেকটা মিথ্যা না? লোকটা মারা গেছে এখন তাকে নিয়ে যা ইচ্ছা তা বলা যায়। সত্য মিথ্যা যাচাই করার উপায় নেই। তোর বাপিতো আর কবর থেকে উঠে এসে বলবে না— ইহা মিথ্যা।
মৃত একজন মানুষকে নিয়ে উনি শুধু শুধু মিথ্যা কথা কেনই বা বলবেন?
যার মিথ্যা বলার অভ্যাস সে মৃত মানুষ নিয়েও বলবে, জীবিত মানুষ নিয়েও বলবে।
শুভ্র বলল, আমার নিজের ধারণা ভদ্রলোক সত্যি কথাই বলছেন। বাবা নিশ্চয়ই চাচ্ছিলেন বিনু মেয়েটার ভাল একটা বিয়ে দিতে।
কার সাথে বিয়ে দেবে? তোর বাবা কি কোলে পাত্র নিয়ে বসে ছিল?
শুভ্ৰ হাসি মুখে বলল, একটা পাত্র বাবার হাতে অবশ্যই ছিল। আমি ছিলাম। আমি মোটামুটি নিশ্চিত বাবা বিনু মেয়েটাকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন।
জাহানারা অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। শুভ্ৰ এত সহজে এমন ভয়ঙ্কর একটা কথা বলে ফেলতে পারে এটা তার ধারণার মধ্যেই নেই। তার মনে হল তিনি ভালমত নিঃশ্বাসও নিতে পারছেন না। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, শুভ্র তুই এমন উদ্ভট একটা কথা কী করে বললি?
শুভ্র বলল, মা আমি যথেষ্ট পরিমাণে উদ্ভট একটা ছেলে। যে কথাটা তোমার কাছে খুব উদ্ভট মনে হয়েছে তার চেয়ে অনেক উদ্ভট কথা আমি মাথায় নিয়ে ঘুরি। অন্য কেউ তাতে খুব কষ্ট পেত, আমি তেমন কষ্টও পাই না।
জাহানারা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, তুই কী কথা মাথায় নিয়ে ঘুরিস? আরেক দিন বলব মা। আজ থাক।
না। আজই বল। এখনি বল।
উঁহু, আজ বলব না। আজ তুমি খুবই রেগে গেছ। তোমার রাগ আজ আর বাড়ব না। কফি খেতে ইচ্ছা করছে। কফি খাবার ব্যবস্থা করতো মা।
জাহানারা যেমন বসে ছিলেন তেমনই বসে রইলেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন- এক পলকের জন্যেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন না। শুভ্র বলল, মা শোন আমি যা বলি খুব চিন্তা ভাবনা করে বলি। একটা কিছু আমার মনে এল আর আমি হুট করে বলে ফেললাম তা কিন্তু কখনো হয় না। আমার ধারণা আমি আমার এই অভ্যাস পেয়েছি বাবার কাছ থেকে। বাবাও খুব চিন্তা ভাবনা করতেন। তাঁকে দেখে তা মনে হত না। তিনি যে বিনুর সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তার সলিড গ্রাউন্ড ছিল। সে সম্পর্কে জানতে চাও?
জাহানারা বললেন, না, জানতে চাই না। এক সংসারে এতগুলি জ্ঞানী হবার দরকার নেই। তুই জ্ঞানী হয়েছিস, মহাজ্ঞানী অতীশ দীপঙ্কর হয়েছিস— এই যথেষ্ট।
শুভ্র বলল, বাবা কী কারণে ভদ্রলোককে তার মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন এটা তুমি শুনলে তোমার রাগ একটু কমবে।
আমার রাগ কমানোর জন্যে তোকে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি এমন কেউ না। আমার রাগে করে কোনো ক্ষতি হবে না।
শুভ্র মাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নিজের মনের কথা বলে যেতে লাগল। জাহানার খুব চেষ্টা করলেন ছেলে কী বলছে না বলছে সেদিকে নজর না দিতে। তা পারলেন না। তাঁকে ছেলের কথা খুব মন দিয়ে শুনতে হল।
শুভ্র বলছে— বুঝলে মা, বাবা ছিলেন দারুণ চিন্তাশীল মানুষ। যে-কোনো সমস্যা তিনি নানা দিক দিয়ে ভেবে একটা সমাধানে আসতেন। এ ধরনের গুণ খুব কম মানুষের থাকে। পৃথিবীতে বড় বড় বিজ্ঞানী যারা ছিলেন তাঁদের সবারই এই গুণ ছিল। সমস্যাকে তারা জটিল অঙ্ক মনে করতেন। তারপর শুরু হত অঙ্কের সমাধান। অঙ্কের একটাই কিন্তু সমাধান। সেই সমাধানে নানানভাবে পৌঁছানো যায়। বিজ্ঞানীয়া প্রতিটি সমাধান পরীক্ষা করে দেখেন। বাবাও ছিলেন ঠিক তাদের মত। বাবা দেখলেন, তার ছেলে শুভ্রর এমন একটি মেয়ে দরকার যে শুভ্ৰর ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামাবে না। শুভ্রর বাবা কী ছিলেন তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তগ্রস্ত হবে না। পৈত্রিক সূত্রে শুভ্র কী পেল তা নিয়ে চিন্তিত হবে না। মেয়েটির সমগ্ৰ চেতনায় শুধু মানুষ শুভ্ৰ থাকবে। আর কিছু থাকবে না। সে হবে শুভ্রর ছায়া, শুভ্রর সঙ্গে থাকতে পারায় আনন্দেই সে আনন্দিত হবে। বাবা আমার ব্যাপারে কোনো রিসক নিতে রাজি হন নি। বিনু হচ্ছে এমন একটি মেয়ে যাকে নিয়ে কোনো রিসক নেই।
জাহানারা বললেন, তুই তোর বাবাকে পুরোপুরি বুঝে ফেলেছিস?
শুভ্র বলল, না। উনি মানুষ হিসেবে অত্যন্ত জটিল। এত সহজে তাকে বোঝা যাবে না। তবে আমি চেষ্টা করছি। মা তুমি শুনে হয়ত খুশি হবে। আমি আগামী সপ্তাহ থেকে বাবার অফিসে নিয়মিত বসব বলে ঠিক করেছি।
জাহানারা ছেলেকে দেখছেন। এইতো মোটা কাচের চশমা পরা ছেলে। মাথাভর্তি চুল। সেই চুল হাওয়ায় উড়ছে। অনেক দূরে বসেও তিনি ছেলের গায়ের গন্ধ পাচ্ছেন। অথচ ছেলেকে চিনতে পারছেন না। নিজের ছেলে তাঁর কাছে অচেনা হয়ে গেছে।
কতদিন পর বাবার অফিসে এসেছে তা শুভ্ৰ মনে করতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে অনেক দিন পর এসেছে। ছোটবেলায় প্রায়ই আসত। খুব বুড়ো এক ভদ্রলোক তাকে রিকশা করে স্কুল থেকে অফিসে নিয়ে আসতেন। তিনি কড়া গন্ধওয়ালা জর্দা খেতেন। জর্দার গন্ধে শুভ্ৰর মাথা ধরে ফ্ৰেত। আবার গন্ধটা ভালও লগত। অতিরিক্ত জর্দা এবং অতিরিক্ত পান খাওয়ার জন্যে ভদ্রলোকের জিহ্বা মোটা হয়ে গিয়েছিল। তিনি শুভ্ৰ বলতে পারতেন না। শুভ্ৰকে বলতে—শুবরু।
