বিনুর বিয়ে ঠিক হয়েছে জানিস না-কি?
না জানি না।
আমিও জানতাম না। অথচ বিয়ে সব ঠিক ঠাক। শ্রাবণ মাসে বিয়ে। ছেলে স্কুল টিচার। ছেলের গ্রামের বাড়িতেই স্কুল। ছেলের জমিজমা আছে। মনে হয় বেশ অবস্থা সম্পন্ন।
ভালতো।
জাহানারা শুভ্রর দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, সব ঘটেছে আমার নাকের ডগার সামনে। অথচ আমি কিছুই জানতে পারি নি।
তোমার এত বুদ্ধি কোনো কাজে এল না?
আমার এত বুদ্ধি মানে? ঠাট্টা করছিস?
মোটেই ঠাট্টা করছি না। আমার ধারণা তোমার অনেক বুদ্ধি। যে নিজেকে যত বেশি আড়াল করে রাখতে পারে তার তত বেশি বুদ্ধি। তুমি শুধু যে নিজেকে আড়াল করে রাখ। তাই না, আমাকেও আড়াল করে রাখ। কাজেই তোমার ডাবল বুদ্ধি।
তুই তোর জ্ঞানের কথাগুলি বন্ধ করা।
বন্ধ করলাম।
শুভ্ৰ আবার চোখ থেকে চশমা খুলেছে; জাহানারা বিরক্ত মুখে ছেলের কাণ্ড দেখছেন। বিনুর ব্যাপার নিয়ে ছেলের সঙ্গে মজা করে কিছু কথা বলবেন ভেবেছিলেন, মনে হচ্ছে শুভ্রর তেমন উৎসাহ নেই। গল্প ঠিকমত শুরু হলে ছেলের উৎসাহ তৈরি হতে পারে। জাহানারা আবারো গল্প শুরু করলেন–
বুঝলি শুভ্ৰ, আমিতো বিনু মেয়েটাকে যত দেখছি তত অবাক হচ্ছি। যে ছেলেটার সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা ফাইনাল হয়েছে সেই ছেলে এই বাসায় এসেছে মেয়ে দেখার জন্যে। বিনু তাকে চা বানিয়ে দিয়েছে। বোম্বাই টেস্ট বানিয়ে দিয়েছে। অথচ আমি কিছুই জানি না। মেয়ে আমাকে কিছুই বলে নি।
তুমি জানলে কীভাবে?
মেয়ের বাবার চিঠিতে সব জানলাম। ইন্টারেস্টিং চিঠি। পড়বি?
শুভ্র কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে হাত বাড়িয়ে বলল, দাও চিঠি পড়ে জাহানারা বললেন, চিঠি কি আমি সঙ্গে নিয়ে এসেছি? আমার ড্রয়ারে আছে। ড্রয়ার থেকে আনতে হবে।
শুভ্র বলল, চিঠি তোমার সঙ্গেই আছে মা। আমাকে চিঠিটা পড়বার জন্যেই তুমি এখন এসেছি। চিঠি তোমার আঁচলে বাধা।
শুভ্ৰ মিটিমিটি হাসছে। জাহানারা খুবই বিব্রত বোধ করছেন। ছেলের হাতে ধরা পড়া লজার ব্যাপার। এই লজার হাত থেকে বাঁচার উপায় দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে। মাথায় কিছু আসছে না। জাহানারা হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বললেন, ঠিকইতো। চিঠিটা পড়ে যে আঁচলে বেঁধে ছিলাম ভুলেই গেছি! নে পড়ে দেখ।
জাহানারা তীব্র দৃষ্টিতে ছেলেকে দেখছেন। চিঠি পড়তে পড়তে ছেলের মুখের ভাবে কিছু পরিবর্তন হবে বলে তিনি আশা করছেন। এই পরিবর্তনগুলি তিনি দেখতে চান।
অতি সম্মানীয়া
ভাবি সাহেবা,
আসসালাম। পর সমাচার আশা করি সর্বাঙ্গীন কুশল। আপনাকে একটি আনন্দ সংবাদ দিবার জন্যে আমি অধম হাতে কলম নিয়াছি। যদিও উচিত ছিল নিজে আসিয়া আপনাকে কদম বুসির মাধ্যমে সংবাদ দেয়া। বাত ব্যাধির প্রবল সংক্রমণের কারণে তাহা না পারিয়া বড়ই মনঃকষ্টে কালান্তিপাত করিতেছি।
এক্ষণে আনন্দ সংবাদটি বলি– আমার বড় কন্যা বিনুর বিবাহ ইনশাল্লাহ ঠিক হইয়াছে। পাত্র স্কুল শিক্ষক, সদবংশ জাত। পিতামাতার এক সন্তান। আল্লাহপাকের অনুগ্রহে তাহার বিষয় সম্পত্তি ভাল। স্কুল শিক্ষকতা না করিলেও তাহার দুই বেলা শাকান্ন খাইবার সামর্থ্য আছে। ছেলে দেখতেও মাশাল্লাহ খারাপ না।
জনাব মোতাহার হোসেন ভাই সাহেবকে আনন্দ সংবাদটি দিতে পারিলাম না ইহা আমার জন্য অতিব বেদনাদায়ক। কারণ উনি একবার আমাকে খবর দিয়া অফিসে নিয়া গিয়াছিলেন। সেই সময় আমি কন্যার বিবাহ নিয়া খুব পেরেসানির মধ্যে ছিলাম। ভাই সাহেব চা পান দিয়া আমাকে বিশেষ রকম যত্ন করিবার পর বলিলেন- বিনুর বিবাহ নিয়া তুমি চিন্তা করিও না। তোমার কন্যার বিবাহের দায়িত্ব আমার। আমি তার অতি ভাল বিবাহ দিব। ছেলে তোমার এবং তোমার কন্যার পছন্দ হবে।
আজ বড়ই আফসোস উনি জীবিত নাই। সবই আল্লাহপাকের বিধান এবং উনার হিসাব যাহা আমরা অতি ক্ষুদ্র মানুষ বুঝিতে পারি না। কারণ উনার বিধান এবং হিসাব বোঝা অতি জটিল।
যাহা হউক ভাবি সাহেবা, আপনি আমার মেয়েটিকে একটু খাস দিলে দোয়া করিবেন। বিনু সর্বদাই আপনার কথা বলে। সে আপনার কথা যত বলে নিজ মাতার কথাও তত বলে কি-না। এ বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে।
বাবা শুভ্ৰকে আমার আন্তরিক দোয়া এবং স্নেহশীষ দিবেন। শেষবার যখন তাহার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইয়াছে তখন তাহার মধুর ব্যবহারে বড়ই শান্তি লাভ করিয়াছিলাম। অল্প বয়সে পিতৃহীন হইয়া সে বড়ই মনস্তাপে পতিত হইয়াছে। ইহাও অতিব আফসোসের বিষয়। আল্লাহপাকের সমস্ত কাজের পিছনে মঙ্গল থাকে। ইহা ভাবিয়াই শান্তি পাইতে হইবে।
ভাবি সাহেবা, পত্রের ভুলত্রুটি মার্জনীয়। বাবা শুভ্ৰকে আমার আন্তরিক স্নেহশীষ দিবেন। আল্লাহ হাফেজ।
ইতি
আপনার স্নেহধন্য নাদান
হাবীবুর রহমান
শুভ্ৰ চিঠি শেষ করে মার দিকে তাকাল। জাহানারা বললেন, কিছু বলবি?
শুভ্ৰ বলল, না, কী বলব? বিনু চা বানিয়ে দিয়েছে, বোম্বাই টেষ্ট বানিয়েছে—এসব কথাতো চিঠিতে কিছু পেলাম না।
এই খবর আমি অন্য সোর্সে পেয়েছি। এখন তুই বল চিঠিটা পড়ে তোর কাছে খটকা লাগে নি?
উঁহু। খটকা লাগার মত কিছু কী আছে?
অবশ্যই আছে। আমারতো ধারণা পুরো চিঠিতে বানিয়ে বানিয়ে অনেক মিথ্যা কথা বলা। বাপটা মেয়ের মতই মিথ্যাবাদী।
আমার সে রকম মনে হচ্ছে না মা।
জাহানারা শীতল গলায় বললেন, চিঠিতে লেখা শেষবার যখন তোর সঙ্গে দেখা তখন তুই অনেক যত্ন টত্ব করেছিস। মধুর ব্যবহার করেছিস। মধুর ব্যবহার করা তোর ধাতে নেই। মনে করে দেখতো তুই কী করেছিলি? পিঠ চুলকে দিয়েছিস না মাথা মালিশ করেছিস?
