সে কী বিপদে পড়েছে?
শুভ্ৰর বাবা মারা গেছেন।
এটা কোনো বিপদ না। সবার বাবাই মারা যায়। আমিও মারা যাব।— তার মানে এই না যে তুই ভয়ঙ্কর বিপদে পড়ে যাবি।
শুভ্রর বাবা তোমার মত না বাবা। তিনি একটু আলাদা। আলাদা বলেই সমস্যা।
কী রকম?
শুভ্রর বাবার একটা ব্রোথেল আছে। তাঁর মৃত্যুর পর শুভ্ৰ উত্তরাধিকার সূত্রে সেই ব্রোথেলের মালিক হয়েছে।
কী আছে বললি? ব্রোথেল?
হ্যাঁ, ব্রোথেল এ হোর হাউজ যেখানে ফিফটি টু নিশিকন্যা থাকে।
কী বলছিস তুই! শুভ্রর বাবা…
হ্যাঁ, শুভ্ৰর বাবা।
সর্বনাশ! শুনেইতো আমার সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
বাবা, তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ – শুভ্ৰ এই ঘটনার জন্যে প্রস্তুত ছিল না। তার পুরো ভুবন এলোমেলো হয়ে গেছে। এখন বল— আমি তার ভুবন ঠিকঠাক করার জন্যে কীভাবে সাহায্য করব?
কারোরই এখানে করার কিছু নেই। যা করার শুভ্রকে করতে হবে। সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের মত জীবন যাপন করবে।
বাবা শোন, শুভ্ৰ যদি সাধারণ কেউ হতো। সে তা-ই করত। সে সাধারণ কেউ না। কাজেই সে কী করবে জান? সে বাবার ব্যবসা উঠিয়ে দিবে না। সে গভীর আগ্রহের সঙ্গেই ব্যবসাটা দেখবে। ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করবে। বার বার মেয়েগুলির কাছে যাবে। তাদের বিচিত্র জগৎ বোঝার জন্যে নিজেকে সেই জগতের অংশ করার চেষ্টা করবে। শুভ্ৰ একশ ভাগ বিজ্ঞানের ছাত্র। বিজ্ঞানের ছাত্র জানে–কোনো সিস্টেমকে বুঝতে হলে সিস্টেমের অংশ হতে হয়। আমি তার ধ্বংসটা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু তাকে কীভাবে সাহায্য করব কিছু বুঝতে পারছি না। তুমি কি পারছ?
ইয়াসিন সাহেব ক্ষীণ গলায় বললেন, না।
মীরা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, চল যাই বৰ্ষা যাপন করি।
বৃষ্টিতে ভিজি।
বৃষ্টিতে ভিজবি?
হ্যাঁ।
আমি নাচ জানলে খুব ভাল হত। আমার কী ধারণা জান বাবা— বৃষ্টিতে নাচ খুব ভাল হবে। পায়ে নুপুর বাজবে— বৃষ্টির শব্দও নুপূরের শব্দের মতই। বাবা কথা বলছ না কেন?
ইয়াসিন সাহেব ঘোর লাগা মানুষের গলায় বললেন, শুভ্ৰ সম্পর্কে কথাগুলি এখনো হজম করতে পারছি না।
শুভ্ৰ সম্পর্কে এখন না ভাবলেও হবে। ঐ সুইচটা অফ করে দিয়ে বর্ষা যাপনের সুইচটা অন কর।
ইচ্ছমত সুইচ অন-অফ করা যায়?
অবশ্যই যায়। চেষ্টা করে দেখ। আমি পারি, তুমি কেন পারবে না? ইয়াসিন সাহেব মেয়েকে নিয়ে ছাদে বৃষ্টিতে ভিজতে গেলেন।
জাহানারাকে দেখে মনে হচ্ছে
জাহানারাকে দেখে মনে হচ্ছে তাঁর বয়স কমে গেছে। চোখ-মুখ উজ্জ্বল। মুখের চামড়ায় খসখসে ভাব নেই। চোখের নিচে কালি পড়ে থাকত। সেই কালি দূর হয়েছে। পিঙ্গল চুলে কালচে ভাব এসেছে। শুভ্র চশমার ভেতর দিয়ে খুব আগ্ৰহ নিয়ে মার দিকে তাকিয়ে আছে। জাহানারা বললেন, এই তুই কী দেখছিস?
শুভ্ৰ চোখ থেকে চশমা নামিয়ে নিয়ে চশমার কাচ পরিষ্কার করতে করতে বলল, তোমাকে দেখছি।
আমাকে দেখার কী আছে?
অনেক কিছুই আছে। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার বয়স কমে গেছে।
বয়স আবার কমবে কী? তুই সব সময় পাগলের মত কথা বলিস।
শুভ্র চশমা চোখে দিয়ে পরীক্ষকের চোখে মার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাসিমুখে বলল, সত্যি তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার বয়স কমেছে এবং তুমি আনন্দে আছে।
জাহানারা রাগী গলায় বললেন, আনন্দে থাকব কেন? আনন্দে থাকার মত কিছু হয়েছে?
অবশ্যই হয়েছে। মানুষের জন্মই হয়েছে আনন্দে থাকার জন্যে। কাজেই আনন্দে থাকাটা অপরাধ না। নিরানন্দে থাকাটাই অপরাধ।
তাহলে তুই নিরানন্দে থাকিস কেন? তোকে দেখেই মনে হয় তোর জন্ম হয়েছে নিরানন্দে থাকার জন্যে। সারাক্ষণ মুখ ভোতা করে বসে থাকিস। আর শোন, এই বিশ্ৰী অভ্যাসটা করেছিস কবে থেকে? দেখলেই রাগ লাগে।
কোন অভ্যাসটার কথা বলছ?
এই যে একটু পরপর চোখ থেকে চশমা হছিল। চশমার কাচ ঘষাঘষি করছিস।
শুভ্র আগ্রহী গলায় বলল, তুমি সারাক্ষণই আমার দিকে তাকিয়ে থাক। তাই না মা? আমি কী করছি না করছি কিছুই তোমার চোখ এড়ায় না। ঠিক বলছি?
জাহানারা কিছু বললেন না; শুভ্রর খাটে এসে বসলেন। এখন বাজছে বিকেল তিনটা। এই সময়টা রোজই তিনি ঘুমুতেন। কিছুদিন হল দুপুরের ঘুম না হয়ে ভালই হচ্ছে। গল্প গুজব করার সময় পাওয়া যাচ্ছে। শুভ্রর সঙ্গে অনেক কিছু নিয়ে তার কথা বলতে ইচ্ছা করে। কিন্তু বলা হয় না। কেন জানি ছেলেকে তিনি আজকাল সামান্য ভয়ও পান। তারপরেও এই কদিনে গুটুর গুটুর করে অনেক গল্প করে ফেলেছেন। ছোটবেলায় সিলেটে থাকতেন। একবার চা বাগানে বেড়াতে গিয়ে তিনি হারিয়ে গেলেন। তাঁকে খুজে পাওয়া গেল রাত দশটায়। সন্ধ্যার দিকে তাঁর খুবই ভয় লাগছিল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত কারণে ভয় কমতে লাগল। এইসব হাবিজাবি গল্প। শুভ্ৰ গল্পগুলি শুনেছেও খুব আগ্রহ নিয়ে। আজও মনে হয় সে রকম হবে। শুভ্র খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। আজ কি গল্প করা যায়?
শুভ্র।
বল।
তোকে কদিন ধরেই খুব জরুরি একটা কথা বলব বলে ভাবছি।
বলে ফেল।
তুই আবার রাগই করিস কি-না সেটাই আমার ভয়।
শুধু শুধু রাগ করব কেন?
বিরক্তও হতে পারিস।
যা বলতে চাচ্ছ চট করে বলে ফেল।
জাহানারা এতক্ষণ পা বুলিয়ে খাটে বসেছিলেন, এখন পা তুলে বসলেন। শুভ্র হাসি হাসি মুখে মার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুখের ভঙ্গি থেকে মনে হচ্ছে সে জানে মা কোন প্রসঙ্গে কথা বলবেন।
