নব্যধারা জলে স্নান তোর কাছে হাস্যকর মনে হচ্ছে?
বৃষ্টিতে ভেজাটা হাস্যকর না, তবে বৃষ্টি ভেজার পেছনের আয়োজনটা হাস্যকর। ফ্লাড লাইট, গান, মাথায় শাওয়ার ক্যাপ পরে বৃষ্টিতে ভেজা— Oh my God.
বেশতো আয় গান, ফ্লাড় সব বাদ দেই! মাথায় শাওয়ার ক্যাপ রাখতেই হবে। এই বয়সে চুল ভেজালে উপায় নেই।
সরি বাবা, আমি বৃষ্টিতে ভিজব না।
কেন। তুইতো বৃষ্টিতে ভিজতে পছন্দ করিস।
সব মেয়েরাই করে। তাই বলে কোনো মেয়েকেই দেখবে না বুড়ো বাবাকে নিয়ে ধেই ধেই করে বৃষ্টিতে ভিজছে। বৃষ্টিতে ভেজার জন্যে সবচে খারাপ কোম্প্যানি হল বুড়ো বাবা।
ইয়াসিন সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, মা তুই কি কোনো কারণে আমার উপর রাগ করেছিস?
উহঁ। তুমি এমন এক ব্যক্তি যে রাগ করার মত কিছু কখনোই করে না। আবার…।
আবার কী?
না থাক। কিছু না।
বৃষ্টিতে ভিজবি না?
না। ইচ্ছা করছে না।
আমি নিজে যদি বোরিং ধরনের মানুষ হই তুইও কিন্তু তাহলে কঠিন ধরনের মেয়ে। পাথর কন্যা।
ঠিক বলেছ।
নিজের ইচ্ছা, নিজের ভাল লাগাটাই তোর কাছে ইস্পটেন্ট। আমি খুব আগ্ৰহ করে বৃষ্টিতে ভিজতে চাচ্ছি– যেহেতু তোর ইচ্ছা করছে না, সেহেতু তুই সেই কাজটা করবি না।
ভান করতে আমার ভাল লাগে না বাবা। তোমার ভান করতে ভাল লাগে। আমার লাগে না। এই যে তুমি আয়োজন করে বৃষ্টিতে ভেজার ব্যবস্থা করেছ— এটা পুরোপুরি ভান। এই ভানটা তুমি করছ নিজের সঙ্গে।
ও আচ্ছা।
আমি নিজে ভান করি না। কেউ ভান করলে সেটা আমার ভাল লাগে না।
মানুষ মাত্ৰই ভান করে। ভান করে না এমন মানুষ তুই পাবি না।
একদম যে পাব না তা না। আমি তিনজনকে চিনি যারা ভান করে না। একজন হল শুভ্র। আরেকজন—আর্কেটেক্ট আখলাক সাহেব।
তৃতীয়জনটা কে?
তৃতীয়জন আমি।
তিনজনে মিলে একটা ক্লাব করে ফেল। মেন্টেস ক্লাবের মত ভান-মুক্ত ক্লাব। যার সদস্য হতে হলে মুক্ত মানুষ হতে হবে।
মীরা হাসল। ইয়াসিন সাহেব ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোর ভান-মুক্ত ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে মাত্র একজনকে এ বাড়িতে প্রায়ই আসতে দেখি। শুভ্ৰকে আসতে দেখি না। এর কারণ কী?
ওকে আসতে বলি না বলে ও আসে না।
আসতে বলিস না কেন? শুভ্রকে কি তুই পছন্দ করিস না?
খুব পছন্দ করি। পছন্দ করি বলেই আসতে বলি না।
তোর লজিকটা বুঝতে পারছি না। যাকে পছন্দ করবি তার সঙ্গ কামনা করবি না?
না। প্ৰেম আমার খুব অপছন্দের ব্যাপার। আমি কারোর প্রেমে পড়তে চাই না।
প্রেমে পড়তে চাস না কেন?
প্রেমে পড়া মানে নির্ভরশীল হয়ে যাওয়া। আমি যার প্রেমে পড়ব সে আমার জগতের বিরাট একটা অংশ নিয়ে নেবে। আমার জগৎটা ছোট হয়ে যাবে। তুমি তোমার নিজেকে দিয়ে বিচার কর। তুমি মার প্রেমে হাবুড়ুবু খাচ্ছিলে। তোমার জগতের সবটাই মা নিয়ে নিয়েছিল। মা যখন মারা গেল সে তার সঙ্গে সেই জগৎটা নিয়ে গেল। তুমি শূন্য জগতের বাসিন্দা হয়ে গেলে। ঠিক বলেছি বাবা?
ঠিক বলছিস কি-না জানি না। তবে কথা যে গুছিয়ে বলছিস তা বুঝতে পারছি। ফিজিক্স না পড়ে তোর আইন পড়া উচিত ছিল। তোর মা ছিল বোকা টাইপের মেয়ে। তুই এমন ক্ষুরের মত বুদ্ধি কীভাবে পেলি? ক্ষুরের এক দিকে থাকে ধার। তোর দুই দিকেই ধার।
মা বোকা ছিল?
খুবই বোকা ছিল। বোকা বলাটা ঠিক হচ্ছে না। সরল মহিলা ছিল। পৃথিবীর জটিলতা কিছুই বুঝত না। আমি যা বলতাম। তাই বিশ্বাস করত।
মীরা হেসে ফেলল। ইয়াসিন সাহেব বললেন, হাসছিস কেন?
মার সম্পর্কে তোমার উদ্ভট ধারণার কথা শুনে হাসছি। বাবা শোন, মা সারাজীবন তোমার সঙ্গে বোকা এবং সরল মেয়ের অভিনয় করে গেছে।
কেমন?
কারণ মা ছিল ভয়ঙ্কর বুদ্ধিমতী। মা তার বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পেরেছে তোমার প্ৰেম পেতে হলে বোকা এবং সরল মেয়ে সাজতে হবে। মা হল বহুরূপী গিরগিটি। বহুরূপী গিরগিটি কী করে জান? যে গাছে সে বাস করে সেই গাছের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে নিজের রঙ বদলায়। যাতে কেউ গাছ থেকে তাকে আলাদা করতে না পারে। মা তোমার সঙ্গে রঙ মিলিয়ে নিজের রঙ বদলিয়েছে।
তোর কি ধারণা আমি বোকা?
অবশ্যই।
আমি বোকা বলেই তোর মা বোকা সেজে আমার সঙ্গে জীবন কাটিয়ে গেছে?
হ্যাঁ।
ইয়াসিন সাহেব অবাক হওয়া গলায় বললেন, মারে আমিতো তোর কথাবার্তা প্ৰায় বিশ্বাস করা শুরু করেছি।
আমার উপর রাগ করছ নাতো?
না। রাগ করছি না। তোকে খুবই পছন্দ হচ্ছে। তোর ধারণা আমি সত্যি বোকা।
মানবিক সম্পর্কের ব্যাপারগুলিতে তুমি বোকা। তুমি যদি বোকা না হতে আমার জন্যে খুব লাভ হত। আমি আমার কিছু কিছু সমস্যা নিয়ে আলাপ করতে পারতাম। আমি আলাপ করি না, কারণ আমি জানি আলাপ করে কোনো লাভ নেই।
ইয়াসিন সাহেব কৌতূহলী গলায় বললেন, লাভ না হলেও তোর একটা সমস্যা আমাকে বলতো শুনি। দেখি আমি বুদ্ধিমানের মত কোনো সাজেশন দিতে পারি কি-না।
পারবে না।
স্বীকার করলাম পারব না। তবু শুনি।
সত্যি শুনতে চাও?
হুঁ।
মীরা বিছানা থেকে উঠে বাবার সামনে চেয়ার টেনে বসল। ইয়াসিন সাহেব গভীর আগ্রহ নিয়ে মেয়ের কাণ্ডকারখানা লক্ষ করছেন। তিনি জানেন তার মেয়েটা আর দশটা মেয়ের মত না। কিন্তু সে যে এতটা আলাদা তা বুঝতে পারেন নি।
মীরা শান্ত গলায় বলল, বাবা শোন, শুভ্ৰ মস্ত বড় বিপদে পড়েছে। আমি তাকে সাহায্য করতে চাই। কিন্তু আমি চাই না সে জানুক যে আমি তাকে সাহায্য করছি। সেটা কীভাবে করব তা বুঝতে পারছি না।
