শুভ্র বলল, আপনি পড়াশোনা কতদূর করেছেন?
সামান্য।
সামান্যটা কতটুক?
বাংলা বই পড়তে পারি। স্কুল কলেজে কোনোদিন যাই নাই।
আপনে কি গান জানেন?
না, আমি গান জানি না।
আসমানী আবারো শব্দ করে হাসতে গিয়েও হাসল না। হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, আপনে যে কথা বলেছেন, বড় সাহেবও যেদিন আমাকে প্রথম দেখলেন এই কথা বললেন। বললেন, আসমানী তুমি গান জান? আমি যখন বললাম, না— তখন তিনি মনে দুঃখ পেলেন।
দুঃখ পেলেন বুঝলেন কী করে?
দেখে বুঝলাম। কেউ দুঃখ পেলে বোঝা যায়।
সব সময় বোঝা যায় না। আমি আপনাকে দেখে খুবই দুঃখ পাচ্ছি। কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন না।
আসমানী কিছু বলল না। তাকিয়ে রইল।
শুভ্র বলল, বাবা কি আপনাকে খুব পছন্দ করতেন?
জানি না। কোনোদিন জিজ্ঞাস করি নাই। তবে আমার বুক তাঁর খুব পছন্দ ছিল। আপনেরও পছন্দ হবে। ব্লাউজ খুলব? বুক দেখবেন?
ম্যানেজার ছালেহ উদ্দিন ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, আসমানী খবরদার। তোমার বেয়াদবী অনেক সহ্য করেছি। আর না।
আসমানী মিষ্টি করে হাসল। ম্যানেজারের কথায় সে ভয় পেয়েছে বলে মনে হল না। শুভ্ৰ বলল, বাবা মারা গেছেন এই খবর শুনে কি আপনার মন খারাপ হয়েছিল?
না হয় নাই। আমার দুঃখ কষ্ট কম।
শুধু আপনারই দুঃখ কষ্ট কম না-কি আপনার মত যারা এখানে থাকেন তাদের সবারই দুঃখ কষ্ট কম?
সবারই কম। তবে আমার একটু বেশি কম।
ম্যানেজার শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি আসল কথা যা বলতে এসেছ বলে শেষ কর। চল যাই। এইখানকার মেয়েরা সব দুষ্ট প্রকৃতির। আসল কথাটা বল।
আসমানী বলল, আসল কথাটা কী?
শুভ্ৰ বলল, আসল কথাটা হচ্ছে আমি এসেছি আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্যে। আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি যে এমন কিছুর সঙ্গে আমরা যুক্ত।
আপনে আর যুক্ত থাকবেন না?
না।
আমরা যাব কোথায়? আমাদের যাবার কোনো জায়গা নাই। আমাদের দেশের বাড়ি বলে কিছু নাই। বাড়ি ঘর বলে কিছু নাই। এইটাই আমাদের ঠিকানা।
আমি আপনাদের সবার জন্যে ব্যবস্থা করে দেব। বলতে পারেন ক্ষতিপূরণ।
কী দিয়া ক্ষতিপুরণ করবেন? টাকা দিয়া?
যেভাবেই হোক আমি ক্ষতি পূরণ করব।
আচ্ছা ভাল। আর কিছু বলবেন?
শুভ্র বলল, দেয়ালের এই ছবি তিনটা কি আপনার আঁকা?
আসমানী বলল, না। পুরুষ মানুষের সঙ্গে শোয়া ছাড়া আমার অন্য কোনো গুণ নাই। আমি আপনের বাবার সঙ্গে বিছানায় গেছি- আপনে চাইলে আপনার সঙ্গে যাব।
আসমানী তীক্ষ্ণ এবং তীব্র দৃষ্টিতে শুভর দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে ঘৃণা ছাড়া আর কিছু নেই। শুভ্র এই ঘৃণার কারণ ধরতে পারল না। ম্যানেজার শুভ্ৰর দিকে তাকিয়ে বললেন, চলতো উঠি। যথেষ্ট হয়েছে। তোমাকে এখানে আনা ভুল হয়েছে। বিরাট ভুল।
শুভ্ৰ উঠে দাঁড়াল। সে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে অস্বস্তি বোধ করছে। তার বারবারই মনে হচ্ছে কী একটা জরুরি কথা জিজ্ঞেস করার ছিল। জিজ্ঞেস করা হয় নি। কথাটা এখন মনে পড়ছে না, পাৱে মনে পড়বে; তখন খুব কষ্ট লাগবে। এইসব ক্ষেত্রে প্রশ্নটা সাধারণত খুবই তুচ্ছ ধরনের হয়। তুচ্ছ প্রশ্ন বলেই মস্তিষ্ক প্রশ্নটা উপস্থিত সময়ে ভুলে যায়, পরে মনে করে। তখন তুচ্ছ প্রশ্ন আর তুচ্ছ থাকে না। ভারী একটা প্রশ্ন হয়ে মাথায় চাপ ফেলতে থাকে।
রাস্তার পাশেই গাড়ি দাঁড়ানো। সরু রাস্তা, ছোট্ট গাড়িতেই রাস্তা আটকে গেছে। রিকশাওয়ালা গালি দিতে দিতে অনেক কস্টে গাড়ির পাশ দিয়ে রিকশা পার করছে। শুভ্র ম্যানেজারকে বলল, গাড়িকে চলে যেতে বলুন, আমি হেঁটে যাব।
ম্যানেজার বলল, হাঁটার দরকার কী?
দরকার নেই। তবু হাঁটব। এমন কিছু দূরতো না। দেখতে দেখতে যাই।
ছালেহ উদ্দিন বললেন, এইসব জায়গায় দেখার কিছু নাই। নোংরা, ময়লা। ডাস্টবিন পরিষ্কার করার জন্যে মিউনিসিপালটির গাড়ি পর্যন্ত আসে না। নরকের রাস্তাঘাট এরকমই থাকে।
মঞ্জু গাড়ির দিকে ছুটে গেল। ড্রাইভারকে হাতের ইশারায় চলে যেতে বলে আবারো ছুটে ছোট সাহেবের কাছে চলে এল; মঞ্জু গত এক সপ্তাহ ধরে ছোট সাহেবকে ছায়ার মত অনুসরণ করছে। সম্ভবত তাকে কিছু বলা হয়েছে। মঞ্জু এখন আর অফিসে ঘুমায় না। ছোট সাহেবের বাড়ির বারান্দায় শুয়ে থাকে। সে রাতে ঘুমায় না বলেও মনে হয়। রাতে শুভ্ৰ যতবার দরজা খুলে বাইরে আসে ততবারই মঞ্জু বিছানায় উঠে বসে শুভ্রর দিকে তাকায়। শুভ্ৰ আবার ঘরে ঢুকলে মঞ্জু শুয়ে পড়ে।
রাস্তার লোকজন শুভ্ৰর দলটার দিকে তাকাচ্ছে। তাদের চোখে কৌতূহল। কৌতূহলের সঙ্গে চাপা কৌতুক। রাস্তার পাশের পান-সিগারেটের ছোট ছোট দোকানগুলির মালিকরা কি শুভ্রকে চিনে? তারা প্ৰত্যেকেই শুভ্রকে সালাম দিল। দোকানিদের আরেকটা ব্যাপারও শুভ্ৰকে বিস্মিত করল। তাদের সবার মাথায় টুপি। সবার চেহারাতেই ধাৰ্মিক ভাব। কারো কারো চোখে সুরমা।
ছালেহ উদ্দিন শুভ্রর পাশে পাশে হাঁটছেন। তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। সিগারেটের ধোঁয়ায় শুভ্রর কষ্ট হচ্ছে; শুভ্ৰ আগে তাঁকে কখনো সিগারেট খেতে দেখে নি। বাবার মৃত্যুর দিন দেখেছে আর আজ দেখছে। আজ তাঁকে মনে হচ্ছে চেইন স্মোকার। সে একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছে। মুখের সামনে ধোঁয়া না থাকলে লোকটার মনে হয় ভাল লাগে না। ধোয়ার ভেতর দিয়ে কথা বলতেই তার বোধহয় ভাল লাগে।
ছোট সাহেব।
জ্বি।
শুনেছেন বোধহয় সাপ মাঝে মাঝে ব্যাঙ গিলে খুব অসুবিধায় পড়ে। না পারে ব্যাঙটাকে পুরোপুরি গিলতে, না পারে পুরোপুরি উগরে ফেলতে।
