হ্যাঁ শুনেছি।
আমাদের হয়েছে সাপে ব্যাঙ গেলার অবস্থা। আমরা ব্যাঙ গিলতেও পারব না, উগরাতেও পারব না। আমাদের পক্ষে হাজার চেষ্টা করেও এই ব্যবসা থেকে বের হওয়া সম্ভব না।
আপনি এক সময় বলেছেন সম্ভব। চব্বিশ ঘণ্টার ভেতর সম্ভব। আপনার হাতে পার্টি আছে। তাদেরকে ব্যবসা বিক্রি করে দেবেন।
আপনাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে বলেছিলাম। আসলে সম্ভব না। আমাদের ব্যাঙ গিলে ফেলেছি। ছোটখাট ব্যাঙ না, বিরাট গঁতা ব্যাঙ।
এরকম অবস্থা যখন হয় তখন সাপটায় কী হয়? সাপটা কি ব্যাঙ মুখে নিয়ে মারা যায়?
ছালেহ উদ্দিন কিছু বললেন না। তাকিয়ে রইলেন। তার ভুরু কুঁচকে আছে। তাকে খুবই চিন্তিত মনে হচ্ছে। সেই তুলনায় শুভ্রকে হাসি খুশি দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে সে তার দল নিয়ে বেড়াতে বের হয়েছে।
ম্যানেজার সাহেব।
জ্বি।
চা খেতে ইচ্ছা করছে। ঐ যে দোকানটায় চা বানাচ্ছে, লোকজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে- ওদের খাওয়া দেখে মনে হচ্ছে চা-টা ভাল। চলুন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাই।
শুভ্রর ধারণা হয়েছিল ম্যানেজার আপত্তি করবে। তা করল না। শুভ্রর মনে হল— ম্যানেজার ভদ্রলোকের বুদ্ধি আছে। একজন বুদ্ধিমান ম্যানেজার মালিকের প্রতিটি ইচ্ছা পালন করবে। শুধু বিশেষ বিশেষ ইচ্ছার ক্ষেত্রে বলবে— না। সেই না বলা হবে শক্ত গলায়। সেই না কখনো হ্যাঁ হবে না।
ম্যানেজার সাহেব।
জ্বি।
আপনার ধারণা বাবার এই ব্যবসা থেকে আমরা মুক্তি পাব না?
পাব না কেন, অবশ্যই পাব। তবে সময় লাগবে।
কত সময় লাগবে?
এখনো বুঝতে পারছি না।
এটা কি বুঝতে পারছেন যে আমি এই ব্যবসা থেকে মুক্তি চাই।
বুঝতে পারছি।
একটা কাজ করতে পারবেন?
কী কাজ বলুন দেখি পারি কি-না।
যে কটি মেয়ে ঐ বাড়িতে থাকে তাদের সবার নাম, বয়স, কে কোথেকে এখানে এসেছে, তাদের পড়াশোনা, তাদের শখ, তাদের স্বপ্ন এইসব খুব গুছিয়ে লিখে আমাকে দিতে পারবেন?
তার দরকার কী?
দারকার আছে।
আচ্ছা আমি দেব।
কবে দেবেন?
খুব শিগগীরই দেব। তুমি কি চা খেয়ে অফিসে আসবে? অফিসের কাগজপত্র তোমাকে বুঝে নিতে হবে।
আজ থাক। আরেক দিন যাব।
আচ্ছা থাক।
আপনাকে আরেকটা কাজ করতে হবে।
বল কী কাজ।
ময়না পাখিটা আসমানীকে পৌঁছে দেবেন।
আচ্ছা।
চায়ের দোকানি শুভ্ৰকে দেখে খুবই অবাক হল। চা বানানো বন্ধ করে সে ছুটে গিয়ে কোথেকে যেন একটা টুল নিয়ে এল। শুভ্র বলল, আপনি কি আমাকে চেনেন?
দোকানদার হাসি মুখে বলল, জ্বি চিনি।
আমার নাম জানেন?
জ্বি না। নাম জানি না।
আমার নাম শুভ্ৰ। আপনার নাম কী?
আমার নাম কেরামত আলি।
আপনি আমার নাম জানেন না, অথচ আমাকে চেনেন। এটা কীভাবে হল?
আপনার পিতাকে চিনতাম। সেইভাবে আপনারে চিনি।
আমার বাবা কি আপনার দোকানো কখনো চা খেয়েছেন?
জ্বি না।
আপনার সঙ্গে তার কি কখনো কোনো কথা হয়েছে?
জ্বি না।
তারপরেও আপনি তাকে চেনেন? আমার বাবা তাহলে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন?
জ্বি অবশ্যই।
একজন বিখ্যাত মানুষের পুত্র আপনার দোকানে এসে চা খাচ্ছে। আপনার সঙ্গে গল্প করছে। আপনার ভাল লাগছে না?
কেরামত কিছু বলল না। ভীত চোখে তাকাল ম্যানেজারের দিকে। ম্যানেজার সিগারেট ধরিয়াছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় সে তার মুখ ঢেকে ফেলেছে।
চা খেতে ভাল হয় নি। গাদাখানিক চিনি দেয়া হয়েছে। সর ভাসছে। কিন্তু শুভ্ৰ আগ্রহ করেই সেই চায়ে চুমক দিচ্ছে। সে হঠাৎ চায়ের কাপ নামিয়ে কেরামতের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার দোকানে আগরবাতি পুড়ছে কেন? শুধু আপনার দোকানো না- সব দোকানেই দেখছি আগরবাতি। কারণটা জানতে পারি?
কোনো কারণ নাই। অনেকদিন থাইকাই চলতাছে। আমার বাপজানরেও দেখছি আগরবাতি জ্বালাইতে। আমিও জ্বালাই।
আপনার বাপজান এখন কোথায়?
উনার ইন্তেকাল হয়েছে।
বাবার পর আপনি এইখানেই দোকান দিলেন।
জ্বে। এই জাগায় একবার যে বসে হে আর বাইর হইতে পারে না। বড় কঠিন জায়গা।
ছালেহ বলল, শুভ্ৰ চা খাওয়াতো হয়েছে। চল এখন উঠি।
শুভ্র বলল, আমি পান খাব। হাফিজ মিয়ার দোকানের পান। আর আমি এখন যাব না। কেরামতের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করব। আপনার কাজ থাকলে চলে যান।
ম্যানেজার গেলেন না। একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে আছে। তিনি বিরক্তি সামলাতে পারছেন না। মঞ্জু ছুটে গেছে পান আনতে।
শুভ্ৰ কেরামতের দিকে তাকিয়ে বলল, এই জায়গাটা সম্পর্কে কিছু বলুনতো শুনি।
কী বলব। কন? এইটা সাক্ষাত হাবিয়া দোজখ।
আপনার রুটি রুজি সবই এইখানে— আপনারতে হাবিয়া দোজখ বলা উচিত না।
কেরামত নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এই জায়গা থাকব না। এইটা উইঠা যাইব।
কোন?
পরিষ্কার আলামত আছে। অন্য কেউ বুকুক না বুঝুক আমরা বুঝি।
কীভাবে বুঝেন?
এইসব জায়গায় সব সময় কিছু হিজড়া থাকে। এরার নিজেরার কোনো ভাগ্য নাই বইল্যা এরা যে জায়গায় থাকে সেই জায়গার জন্যে ভাগ্য নিয়া আসে। এইখান থাইক্যা সব হিজড়ারা উঠাইয়া দিছে।
উঠিয়ে দিল কেন?
জানি না। জানার চেষ্টাও করি না। আমি দোকানদার মানুষ। অত জানলে আমার পুষে না। আমি চা বেচি। আর রং দেখি।
শুভ্ৰ উঠে দাঁড়াল। চায়ের দাম দিতে গেল। কেরামত জোড়হস্ত করে বিনীত গলায় বলল, চায়ের দাম দিলে মনে কষ্ট পাব ছোট সাহেব। বড়ই কষ্ট পাব।
শুভ্র তার মনে কষ্ট দিল না। চায়ের দাম না দিয়েই রওনা হল। তার এখন বাড়িতে যেতে ইচ্ছা করছে না। অফিসেও যেতে ইচ্ছা করছে না। ইচ্ছে করছে। পরিচিতি কারো সঙ্গে গল্প করতে। মীরার সঙ্গে গল্প করতে পারলে ভাল হয়। অনেকদিন মীরার সঙ্গে গল্প করা হয় না।
