ম্যানেজার সাহেব বলেছেন, দিনে ঘুমায়।
খারাপ লাগে না?
খারাপ লাগবে কেন? অভ্যাস হয়ে গেছে।
লিকার শপ যে চালায় তার নাম কী?
তার নাম সগীর মিয়া। সে আসবে। তাকে বলেছি। এইখানে আপনার সঙ্গে দেখা করতে।
এখনতো দিন, সগীর মিয়া নিশ্চয়ই ঘুমাচ্ছে।
জ্বি ঘুমাচ্ছে।
এই বাড়ির মেয়েগুলিও নিশ্চয়ই ঘুমাচ্ছে।
না তারা ঘুমায় নাই। আপনি আজ আসবেন সবাই জানে।
শুভ্ৰ তাকিয়ে আছে দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলামের দিকে। পোণ্ডুলাম দুলছে। পোণ্ডুলামের টাইম পিরিয়ড T ইজ ইকুয়েলস টু…
আচ্ছা সে এইসব ভাবছে কেন? তার চিন্তা স্থির হচ্ছে না। দ্রুত সরে সরে যাচ্ছে। ব্রোথেলি হাউসের কোনো ঘড়ি দেখে যদি মনে হয়। টাইম পিরিয়ড T ইকুয়েলস টু তাহলেতো মুশকিল। আচ্ছা মস্ত বড় একটা পেণ্ডুলাম তৈরি করলে কেমন হয়? পোণ্ডুলামের কেন্দ্ৰবিন্দু থাকবে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্ৰবিন্দুতে। পেন্ডুলামের দৈর্ঘ্য ধরা যাক দশ আলোকবর্ষ। পেণ্ডুলামের দোলনপথ যদি দশ আলোকবর্ষ হয় তাহলে টাইম পিরিয়ড T কত হবে? এই দোলকের দোলনকালের ওপর দর্শকের কোনো ভূমিকা কি থাকবে না? দর্শক যদি পেণ্ডুলামের ওপর বসে। থাকে তাহলে কী হবে? শুভ্রর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। মাথার ভেতরের চিন্তাগুলি জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
তোমার চারদিকে আমি অসংখ্য ছোট ছোট ধাঁধা তৈরি করে রেখেছি। এইসব ধাধা। যদি তোমার চোখে পড়ে তাহলে সমাধান করতে শুরু করা। তখন তোমাকে জটিল ধাঁধা দেয়া হবে? তোমার যদি ভাগ্য ভাল হয় তাহলে তোমাকে এমন ধাধা দেব যার সমাধান আমি নিজেও করি নি।
দ্য ব্লাইন্ড কসমস নামের এক উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কথাগুলি বলছে। প্রধান চরিত্র মানুষ না, সে একটি কম্পুটার। আচ্ছা হঠাৎ করে ব্লাইন্ড কসমস:- এর নায়কের কথা মনে হল কেন? সে কি নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্যে এসব ভাবছে?
ভেলভেটর পর্দা সরিয়ে একজন মহিলা ঢুকছেন। তাঁর বয়স পঁচিশ থেকে ত্ৰিশের ভেতর। গোলগাল মুখ। মাথা ভর্তি চুল। চুল কালো না, লালচে ভাব আছে। স্বাস্থ্য ভাল। তিনি তেমন কোনো সাজসজ্জা করেন নি, তবে চোখে গাঢ় করে কাজল দিয়েছেন। মহিলা সাধারণ বাঙালি মেয়েদের চেয়ে লম্বা। গায়ের রঙ গোলাপি না হলেও গোলাপির কাছাকাছি। শুভ্র কী করবে? উঠে দাঁড়াবে? উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েদের প্রতি সম্মান দেখানো একটি প্রাচীন নিয়ম। এই সন্মান শুধু মেয়ে বলেই কাউকে দেখানো হচ্ছে না।– মেয়ের ভেতরে একজন মা বাস করছেন, তাকে দেখানো হচ্ছে। সম্মান দেখানোর এই নিয়মটা সুন্দর এবং শোভন। শুভ্ৰ উঠে দাঁড়াল। ম্যানেজার সাহেব অবাক হয়ে শুভ্রর দিকে তাকালেন। তাঁর উঠে দাঁড়ানো হয়ত ঠিক হয় নি। মহিলাও মনে হয় লজ্জা পেয়ে গেছেন। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। ম্যানেজার সাহেব ধমকের গলায় বললেন, তোমার মা কোথায়?
মার শরীর খুব খারাপ। একশ তিন জ্বর।
ম্যানেজার বিরক্ত মুখে বললেন, যখনি আসি শুনি জ্বর। আজ ছোট সাহেবকে নিয়ে এসেছি। উনার কিছু জরুরি কথা ছিল। আসতে বল।
শুভ্ৰ বলল, না না আমার কোনো জরুরি কথা নেই। আমি শুধুইনাদের দেখতে চেয়েছিলাম। এর বেশি কিছু না।
মহিলা বসতে বসতে বললেন, সবাইরে ডাক দিব। দেখবেন?
না দরকার নেই। ম্যানেজার শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার কী সব প্রশ্ন ছিল। আপনি জিজ্ঞেস করেন। এই মেয়ের নাম আসমানী।
আসমানী বসেছে মেঝের কার্পেটে। তার মনে হয়। কার্পেটে বসে অভ্যাস আছে। সে সুন্দর করে বসেছে এবং খুবই কৌতূহলী চোখে শুভ্ৰকে দেখছে। শুভ্র অনেক কিছু বলবে বলে ভেবে এসেছিল, এখন কোনো কিছুই মনে আসছে না। বরং মেয়েটির কৌতূহলী চোখের সামনে নিজেকে খুবই অসহায় লাগছে। মেয়েটা এমন ভাবে তার দিকে তাকিয়ে না থাকলে হয়ত তার ভাল লাগত। শুভ্র নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। তারপর মনে হল এই কাজটাও ঠিক হয় নি। সে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলবে। আর তাকিয়ে থাকবে। Swing Born company-র ঘড়ির দিকে। এটা কেমন কথা? মেয়েটা কানে সাদা পাথরের দুল। পরেছে! দুলগুলি সুন্দর। ঝকঝাক। করছে। শুভ্র বলল, আপনি ভাল আছেন?
আসমানী হোসে ফেলে বলল, ভাল আছি।
ম্যানেজার সিগারেট ধরাতে ধরাতে বিরক্ত মুখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, এদেরকে আপনি করে বলার দরকার নাই।
আসমানী এবার শব্দ করে হোসে ফেলল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হাসি থামিয়ে শুভ্ৰকে বলল, আপনের ময়না পাখিটা কি বেঁচে আছে?
শুভ্ৰ বিস্মিত হয়ে বলল, ময়না পাখির খবর আপনি জানেন কীভাবে?
আসমানী বলল, পাখিটা আমার মা আমার জন্যে কলমাকান্দা থেকে আনছিল। বড় সাহেবের পাখিটা দেখে খুব পছন্দ হল। তিনি নিয়ে গেলেন। কাজটা ঠিক হয় নাই। একজনের পছন্দের জিনিস আরেকজনরে দিতে নাই। বড় সাহেব যখন দোজখে যাবেন তখন এই ময়না পক্ষী ঠোকর দিয়া তার চোখ গেলে দিবে। হি হি হি।
শুভ্র আসমানীর হাসি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বলল, বাবা কি প্রায়ই এখানে আসতেন?
মাঝে মধ্যে আসতেন।
বাবা মানুষ কেমন ছিলেন?
আসমানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সহজ গলায় বলল, একেকজন মানুষ একেকজনের কাছে একেক রকম। আপনের বাবা আপনের কাছে এক রকম, আপনের মার কাছে আরেক রকম আবার আমার কাছে অন্য আরেক রকম।
শুভ্ৰ মেয়েটির কথায় সামান্য ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেল। সে বেশ গুছিয়ে কথা বলছে। কথা বলার মধ্যে সামান্য গ্ৰাম্য টান আছে, তবে অস্পষ্টতা নেই।
