শুভ্ৰ মানিব্যাগ খুলল। আহমদ উল্লাহ মানিব্যাগের দিকে তাকিয়ে বললেন, আর একটু বেশি দিতে পারলে খুবই ভাল হয়। বাবা। দুইশ টাকা দাও।
শুভ্ৰ দুটা একশ টাকার নোট দিল। আহমদ উল্লাহ সাহেব নোট দুটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এখনো তার চোখ শুভ্ৰর মানিব্যাগের দিকে। মানিব্যাগে বেশ কিছু পাঁচশ টাকার নোট দেখা যাচ্ছে। প্রথমবার পঞ্চাশ টাকা না চেয়ে পাঁচশ টাকা চাওয়া দরকার ছিল। শুভ্র বলল, স্যার যাই।
আহমদ উল্লাহ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। তার দিনটাই নষ্ট হয়ে গেছে। শুভ্র আবারো ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় নামল। দ্রুতগামী কোনো গাড়ির সামনে দাঁড়াতে ইচ্ছা করছে। কিছুক্ষণের জন্য হলেও কাজটা করতে হবে। এটা না করলে ইচ্ছাটা মনের ভেতর থেকে যাবে। এবং ইচ্ছাটা বাড়বে। যে-কোনো ইচ্ছা মনের ভেতর পুষিলেই দ্রুত বাড়ে। এক সময় মানুষ তার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তখন মানুষ ইচ্ছার পিঠে চাপে না। ইচ্ছা মানুষের পিঠে চাপে।
শুভ্ৰ যে ঘরে বসে আছে
শুভ্ৰ যে ঘরে বসে আছে সেটা বেশ বড়। মোটামুটিভাবে পরিচ্ছন্ন। শুভ্ৰ আসবে এই জন্যেই কি ঘর পরিষ্কার করা হয়েছে? কার্পেটের ধূলা ঝাড়া হয়েছে? তিনটা গদি আটা চেয়ার। চেয়ারে গাদির ভেলভেটের লাল রং চটে গিয়েছে। তাতে অসুবিধা হচ্ছে না, কারণ সাদা কাপড়ের কভার লাগানো হয়েছে। কভারগুলি ধুয়ে ইস্ত্রি করা। পরিষ্কার-পরিষ্কার গন্ধ বের হচ্ছে।
শুভ্র বসেছে মাঝখানের চেয়ারে। ম্যানেজার সাহেব সঙ্গে এসেছেন। তিনি ইচ্ছা করলেই শুভ্রর পাশের কোনো একটা চেয়ারে বসতে পারতেন। তিনি তা করেন নি— শুভ্রর বা পাশে ডিভানে বসেছেন। সেই ডিভানেও সাদা কাপড়ের চান্দর। এই চাঁদরও ধুয়ে ইস্ত্রি করা। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। ফ্যানে বাতাসের চেয়ে শব্দ হচ্ছে বেশি। পুরনো কালো রঙের একটা ওয়ারডোব দেয়ালের সঙ্গে লাগানো। ওয়ারডোবের ওপর বড় ক্যাসেট প্লেয়ার। ক্যাসেট প্লেয়ারটা নতুন। দুটা সাউন্ড বক্স ওয়ারডোবের দুপাশে মেঝেতে নামানো। ক্যাসেট প্লেয়ারের ওপর গাদা করে রাখা ক্যাসেট।
শুভ্রর ডান পাশে বেতের বড় ইজিচেয়ার। ইজিচেয়ারে একটা বালিশ এবং কোলবালিশ। দুটাতেই সাদা ওয়ার। ইজিচেয়ারটা দেখে শুভ্রর খানিকটা অস্বস্তি লাগছে। ঠিক এ রকম একটা ইজিচেয়ার তাদের বাড়িতে আছে। বারান্দায় থাকে। মোতাহার সাহেব এই চেয়ারে অনেক সময় কাটিয়েছেন। তবে সেই চেয়ারে বালিশ বা কোলবালিশ কোনোটাই নেই। এ ব্লকম একটা চেয়ার শুভ্ৰ তার বাবার অফিসেও দেখেছে। সেখানে বালিশ আছে কি-না শুভ্ৰ মনে করতে পারছে না।
শুভ্রর বাবা কি এই বাড়িতে প্রায়ই আসতেন? এই বড় ঘরটা কি বিশেষভাবেই তার জন্যে সাজানো? ম্যানেজার সাহেবকে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে। এই মুহূর্তে তাঁকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করছে না। মঞ্জুকে জিজ্ঞেস করলেও জানা যাবে। মোতাহার সাহেবের খাস বেয়ারা মঞ্জু শুভ্ৰর সঙ্গে এসেছে। সে ভেতরে ঢুকে নি, বারান্দায় মোড়ায় বসে আছে। এবং একটু পরপরই মাথা ঘুরিয়ে শুভ্রকে দেখার চেষ্টা করছে। মঞ্জুর ভাবভঙ্গি দেখে শুভ্রর মনে হচ্ছে তার বাবা যতবার এই বাড়িতে এসেছেন, মঞ্জুও ততবার এসেছে। তবে কখনো ঘরে ঢুকে নি। মঞ্জুকে ঘরের বাইরে মোড়াতে বসেই সময় কাটাতে হয়েছে।
শুভ্র ঘরের দৃশ্য দেখায় মন দিল। দেয়ালে তিনটা ছবি আছে। তিনটা ছবিই রঙ পেন্সিলে আঁকা। ছবির নিচে শিল্পীর নামের আদ্যক্ষর ইংরেজিতে লেখা— A, চার বছর আগের তারিখ দেয়া। শিল্পীর পছন্দের বিষয়বস্তু মনে হয়। সূর্যস্ত। নদীতে সূর্যস্ত হচ্ছে। পাখি উড়ে যাচ্ছে। মেঘের ওপর সূর্যের লাল আলো পড়েছে। ছবিগুলি কাচা তারপরেও দেখতে ভাল লাগছে। ঘরে মোট তিনটা দরজা। একটা বাইরে থেকে ঘরে ঢোকার জন্যে। আর দুটা দরজা অন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্যে। তিনটা দরুজাতেই লাল ভেলভেটের পর্দা। মনে হচ্ছে লাল ভেলভোটের পর্দা এদের খুব পছন্দ। ঘরের দেয়াল ঝকঝকি করছে। খুব সম্ভব অল্প কিছুদিন হল প্লাষ্টিক পেইন্ট করা হয়েছে। রঙের গন্ধ ঘরের ভেতর আটকা পড়ে আছে, এখনো যায় নি। শুভ্রর ঠিক মুখোমুখি একটা দেয়াল ঘড়ি আছে। পেন্ডুলাম ঘড়ি— তবে ঘড়ির ঘণ্টা নষ্ট। কিছুক্ষণ আগে এগারোটা বেজেছে। কিন্তু কোনো ঘণ্টা বাজে নি। দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলাম বাক্সে লেখা–Swing Burn Company Calcutta. ঘরে কোনো ফুলদানী দেখা গেল না। তাঁর কেন জানি মনে হচ্ছিল। ফুল ভর্তি ফুলদানী দেখবে। হলুদ রঙের বড় বড় ফুল। সূর্যমুখী ফুল। এত ফুল থাকতে সূৰ্যমুখী ফুলের কথা তার মনে হচ্ছে কেন তাও পরিষ্কার হচ্ছে না।
কোনো গ্রান্ডমাস্টারের আঁকা ব্রথেল হাউসের ছবির ক্লিপ্রিন্ট-এ কি সে সূৰ্যমুখী ফুলের ছবি দেখেছে। শুভ্ৰ মনে করতে পারল না। সূর্যমুখী ফুলের ছবি সবচে বেশি কে এঁকেছেন? গাগিনী। কান কেটে প্রেমিককে তিনিই কি পাঠিয়েছিলেন?
শুভ্রর নিজের কাছে খুব অদ্ভুত লাগছে। আজ রবিবার, সময় সকাল এগারোটা। সে তার ম্যানেজার এবং অফিসের খাস বেয়ারা নিয়ে এসেছে তার মৃত বাবার একটি বিশেষ ধরনের ব্যবসার খোঁজখবর করতে। পুরো ব্যাপারটায় এক ধরনের সূক্ষ্ম হিউমার আছে। হিউমারটা ঠিক কোথায় শুভ্র ধরতে পারছে না। শুধু বুঝতে পারছে তার কেন জানি হাসি পাচ্ছে। মানুষ পৈতৃক সূত্রে অনেক কিছু পায়। কেউ পায় বৈভব, কেউ দেন, কেউ সম্মান, কেউ বা অসম্মান। সে পৈতৃক সূত্রে ছোটখাট একটা ব্রোথেল পেয়েছে। একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। চোরাকারবারির মত কোনো বেআইনি ব্যবসা না। খুবই আইনসম্মত ব্যবসা। এর জন্যে যথারীতি ট্যাক্স দেয়া হয়। এই বাড়িতে একটা লিকার হাউস আছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স পাওয়া লিকার হাউস! ক্যাশিয়ার সাহেবের কাছে শুভ্ৰ শুনেছেএই ব্যবসাটাই সবচে লাভের এবং ঝামেলা সবচে কম। লিকার শপটাও শুভ্ৰর দেখার শখ ছিল। অফিস থেকে বলা হয়েছে, লিকার শপ দেখার কিছু নাই। ছোটখাট গুদামের মত। দুজন কর্মচারী লিকার শপ চালায়। যার দরকার বোতল কিনে নিয়ে যায়; বাকিতে কোনো বিক্রি হয় না। দোকান খুলে সন্ধ্যার পর, চালু থাকে। সারা রাত। ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে দোকান বন্ধ হয়ে যায়। শুভ্র অবাক হয়ে বলেছে- দোকান যারা চালায় তারা ঘুমায় না?
