শুভ্ৰ বলল, তেমন কিছু না।
তেমন কিছু না-টা কী?
শুভ্ৰ হাসছে। মীরা বলল, তোর হাসি দেখতে ভালো লাগছে না। তোর কি কোনো সমস্যা হয়েছে? এরকম করে হাসছিস কেন?
সামান্য সমস্যা হয়েছে।
আমি কি শুনতে পারি?
না।
না কেন?
শুভ্ৰ শান্ত গলায় বলল, আমাদের সমস্যাগুলি পরীক্ষার মত। নিজের পরীক্ষা নিজেরই দিতে হয়। পরীক্ষার হলে যখন বসি তখন একজন নিশ্চয়ই অন্যজনের পরীক্ষা দেয় না।
তুই বলতে চাচ্ছিস আমরা কখনো কোনো সমস্যায় অন্যের কাছে থেকে সাহায্য নেব না? এই মহাজ্ঞান তুই পেয়ে গেছিস?
হ্যাঁ।
মীরা বলল, তোর সম্পর্কে আমার নিজের ধারণা হল, তুই অহঙ্কারী এবং বোকা। তোর অহঙ্কারটা প্রকাশিত হয় বিনয়ে এবং বোকামীটা প্ৰকাশিত হয়। জ্ঞানে। মিথ্যা জ্ঞানে।
রেগে যাচ্ছ কেন মীরা?
রাগ উঠছে এই জন্যে রেগে যাচ্ছি। তুই কি হৈচৈ করার জন্যে আজ আমাদের সঙ্গে যাবি?
না।
তুই কী করবি? বাড়িতে চলে যাবি? কোনো বই মুখের সামনে ধরে থাকবি?
তা করতে পারি।
কী বই পড়বি জানতে পারি? Octavio Paz-এর কবিতা না-কি String theory of Universe.
শুভ্ৰ আবারো হাসল। মীরা বলল, তোর বইপত্র আজকের দিনটার জন্যে তোলা থাক। আয় আজ আমরা হৈ চৈ করি। তুই তোর ব্যক্তিগত পরীক্ষণ দে। কিন্তু আজকের দিনটা বাদ থাক। মনে কর আজ পরীক্ষা হচ্ছে না। হরতালের কারণে ছুটি হয়ে গেছে।
শুভ্ৰ বলল, না। আজ আমার অন্য কাজ আছে। আজ আমি রাস্তায় রাস্তায় হাঁটব।
আজ কোনো ছুটির দিন না। আওয়ামী লীগ, বিএনপিদের কেউ হরতালও ডাকে নি। তবু রাস্তাঘাট ফাঁকা ফাকা লাগছে। শুভ্র ফুটপাত ছেড়ে পিচের রাস্তায় নেমে গেল। ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে ভাল লাগছে না। রাজপথই ভাল। মাঝে মাঝে ঝড়ের মত কিছু ট্রাক অবিশ্য গা ঘেষে যাচ্ছে। ড্রাইভাররা বিরক্ত চোখে শুভ্ৰকে দেখছে। এ ছাড়া অন্য কোনো সমস্যা নেই। শুভ্ৰর মনে হল রাস্তার রঙ সব সময় কালো কেন? নীল রঙের রাস্তা হল না কেন? পিচের সঙ্গে নীল রঙ মিশিয়ে রাস্তা নীল করাটা খুব কঠিন কিছুতো না! নীল রঙের রাস্তা মানেই নদী নদী ভাব। ভবিষ্যতের পৃথিবীর রাস্তার রঙ কেমন হবে? কালোই থাকবে না, নীল হলুদ গোলাপি হবে?
শুভ্রর ইচ্ছা করছে তার কোনো আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে হঠাৎ গিয়ে উপস্থিত হতে। দরজার কড়া নাড়বে। অনেকক্ষণ পর একজন কেউ দরজা খুলে অবাক হয়ে বলবে, আরো কে, শুভ্ৰ না? তারপর সেই মানুষটা ভেতরের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলবে, দেখে যাও কে এসেছে! দেখে যাও।
তার সে ধরনের আত্মীয়স্বজন নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু তাদের ঠিকানা শুভ্ৰ জানে না। শুভ্ৰ তাদের কাউকেই চেনে না। তারাও হয়ত শুভ্ৰকে চেনে না।
একদিন আলতাফুর রহমান স্যার ক্লাস নিচ্ছিলেন। তিনি মাঝপথে লেকচার থামিয়ে হঠাৎ বললেন তোমরা কেউ কি বলতে পারবে মানুষ তার সমগ্র জীবনে সবচে বেশি কোন শব্দটা বলে? কেউ উত্তর দিল না। স্যার চক দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ড বড় বড় করে লিখলেন– না।
না শব্দটা মানুষ সবচে বেশিবার বলে।
তুমি ভাল আছ?
না।
মন ভাল?
না।
বেড়াতে যাবে?
না।
মানুষের পৃথিবী হচ্ছে না—ময় অথচ মানুষকে তৈরি করা হয়েছে হ্যাঁ বলার মত করে।
Listen my boy, মানুষ যেন কখনো হ্যাঁ ছাড়া না বলতে না পারে প্রকৃতি সেই ব্যবস্থা। কিন্তু করে রেখেছে। তোমরা একটু ভেবে দেখ— নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর ভাব।
হে মানব সম্প্রদায়, তোমরা কি ক্যানসারের ওষুধ বের করতে পারবে?
হ্যাঁ পারব।
এইডস এর ওষুধ?
হ্যাঁ পারব।
তুমি নক্ষত্রমন্ডল জয় করতে পারবে?
হ্যাঁ পারব।
জরা রোধ করতে পারবে?
হ্যাঁ পারব।
মৃত্যু। মৃত্যু রোধ করতে পারবে?
হ্যাঁ পারব।
মজার ব্যাপার দেখ, কোনো প্রশ্নের উত্তরে মানুষ কিন্তু না বলছে না। অথচ সেই মানুষই তার ব্যক্তি জীবন না বলে বলে কাটিয়ে দিচ্ছে। মানুষের ভেতর যত কনট্রাডিকশন আছে– আর কোনো কিছুতেই এত কনট্ৰডিকশন নেই। এইটা মনে রেখা। দেখবে জীবনযাত্রা সামান্য হলেও সহজ হবে।
শুভ্রর জীবনযাত্রা সহজই ছিল। এখন থাকবে কি-না সে বুঝতে পারছে না। দ্রুত গতিতে একটা ট্রাক আসছে। ট্রাকের ড্রাইভার একবার অবহেলার দৃষ্টিতে শুভ্রর দিকে তাকাল। শুভ্ৰর হঠাৎ ইচ্ছা করুল— আচমকা ট্রাকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে। আচ্ছা এই রকম একটা চিন্তা কি শুরু থেকেই তার মাথায় ছিল? হয়ত ছিল। না হলে ফুটপাত ছেড়ে সে রাস্তায় নেমে হাঁটছে কেন?
ট্রাক ড্রাইভার হর্ন দিচ্ছে। সেই হর্নের শব্দ বিকট। শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে মাথা ধরে যায়। শুশ্রীর মাথা ধরে গেছে।
এই শুভ্র! এই!
শুভ্র চমকে তাকাল। বুড়োমত এক ভদ্রলোক ফুটপাত থেকে তাকে ডাকছে। বুড়োর গায়ে ময়লা পাঞ্জাবি। মুখ ভর্তি পান। পানের রস গড়িয়ে থুতনিতে পড়েছে। বুড়ো দুহাত উঁচিয়ে শুভ্রকে ডাকছেন। শুভ্র ফুটপাতে উঠে এল।
আমাকে চিনেছ?
জ্বি না।
আমি তোমার শিক্ষক ছিলাম। যখন ছোট ছিল তখন তোমাদের বাসায় প্রাইভেট পড়াতে যেতাম। আমার নাম আহমেদ উল্লাহ। আমারে চিনতে পার নাই?
জ্বি না।
আমি তোমারে দেখেই চিনেছি। তোমার চেহারা বদলায় নাই। আগে যেমন ছিল এখনও তেমন আছ। তোমারে দুই মাস পড়ায়েছি। তারপর জানি না। কী কারণে তোমার বাবা আমারে পছন্দ করল না। থাক এইসব ইতিহাস। আছ কেমন বল?
জ্বি ভাল।
রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ায়ে ছিলা কেন? রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকবা না। একসিডেন্ট হবে। যাই হোক বাবা শোন— খুবই খারাপ অবস্থায় আছি, পঞ্চাশটা টাকা দিতে পারবো? না পারলে বিশ পঁচিশ যা পার দাও। শিক্ষককে সাহায্য করা সোয়াবের ব্যাপার। এবং কর্তব্যও বটে। শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড।
