না জানি না।
একদল পাতি হাঁসের মাঝে যদি একটা রাজহাঁস থাকে তখন সেই রাজহাঁসটাকে কেউ পছন্দ করে না। তুই হচ্ছিস রাজহাঁস। তাও সাধারণ রাজহাঁস না, সাইজে বড় রাজহাঁস। যে ময়ূরের মত পেখম ধরতে পারে।
ও আচ্ছা। আমি যে রাজহাঁস সেটা কিন্তু আমি জানি না।
আমরা যতটা না জানি- তুই তারচে বেশি জনিস। আমরা ক্লাসের ছেলেমেয়েরা সবাই সবাইকে তুই করে বলি। তুই নিজে কিন্তু সবাইকে তুমি বলিস।
তাতেই প্রমাণিত হল আমি রাজহাঁস?
এটা একটা পয়েন্টতো বটেই। এটা ছাড়াও আমার হাতে আরো নটা পয়েন্ট আছে। আজ না, আরেক দিন বলব।
আরেক দিন কখন?
আজ রাতে। সিদ্দিকের বাসায়তো আজ রাতে আমরা সবাই যাচ্ছি। সারারাত জেগে হৈচৈ করছি। হৈচৈ এর কোনো এক ফাঁকে বাকি নটা পয়েন্ট বলব।
শুভ্ৰ চুপ করে আছে। ইউনিভার্সিটিতে পা দিয়েই সিদ্দিকের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। সিদ্দিকই তাকে মীরার ফার্স্ট হবার খবর দিয়েছে। কিন্তু সিদ্দিক রাতে তার বাড়িতে খাবার কথা কিছু বলে নি। নিশ্চয়ই ভুলে গেছে। ভুলটা কি সে জেনেশুনে করেছে?
অনেকদিন পর যখন আবার সিদ্দিকের সঙ্গে দেখা হবে, সে চোখ মুখ কুঁচকে বলবে— আচ্ছা শুভ্ৰ, রেজাল্টের দিন রাতের ডিনারে সবাই এল তুই এলি না। ব্যাপারটা কী বলতো? আমি সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছি বলে কি আমার কুণ্ঠ রোগ হয়েছে? না-কি এইডস হয়েছে যে আমাকে এভায়োড় করতে হবে? ফর ইওর ইনফরমেশন কুণ্ঠ এবং এইডস এর কোনোটাই ছোঁয়াছে না। শুভ্ৰ যদি বলে, তুমি আমাকে যেতে বল নি। তাহলে সিদ্দিক খুবই বিস্ময়ের সঙ্গে বলবে, তোকে বলি নি! মানে? কী বলছিস তুই! একবার না পরপর দুইবার বললাম। আশ্চর্য! আমি সবাইকে বলব। আর তোকে বলব না? তুই আমাকে এত ছোট ভাবলি?
বাধ্য হয়ে শুভ্ৰকে তখন বলতে হবে- তুমি নিশ্চয়ই বলেছ। আমি অন্যমনস্ক ছিলাম। শুনতে পাই নি।
সিদ্দিক বলবে, এইতো পথে এসেছিস। ঝেড়ে কাশছিস। তোর ভাবভঙ্গি দেখে আমারইতো মনে ভয় ঢুকে গিয়েছিল। আমি ভাবছিলাম— হয়তো আমিই বলতে ভুলে গেছি।
মীরা বলল, শুভ্ৰ তুই চেয়ারম্যান স্যারের সঙ্গে দেখা করে আয়। স্যার তোর কথা খুব বলছিলেন। আরেকটা কথা- তুই কিন্তু অবশ্যই সিদ্দিকের বাসায় আসবি। আমরা খুব ফান করব। একজন আধ্যাত্ত্বিক ক্ষমতাসম্পন্ন মিডিয়ামকে আনা হচ্ছে।
তাই না-কি?
হ্যাঁ। ভদ্রলোক চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ধ্যান করে তারপর অতীত বলে দেয়। তুই সিদ্দিকের বাসা কোথায় জানিস?
না।
আমার বাড়িতে চলে আসিস। আমি নিয়ে যাব।
শুভ্ৰ চেয়ারম্যান স্যারের সঙ্গে কথা বলতে গেল। ফলিত পদার্থবিদ্যার চেয়ারম্যান আলতাফুর রহমান সাহেব খুবই গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। গম্ভীর এবং রাগী। তার সম্পর্কে প্রচলিত রসিকতা হচ্ছে তিনি ছাত্রজীবনে যে মেয়েটির সঙ্গে প্রেম করছেন তাকে প্রেমের কথাগুলি বলেছেন ধমকের সঙ্গে। মেয়েটিকে বিয়ের জন্যে প্রপোজ করার পর সেই মেয়ে না-কি বলেছে, আপনি আমাকে বিয়ে করতে চান শুনে ভাল লাগছে। কিন্তু আপনি আমাকে ধমকাচ্ছেন কেন? ধমক দেবার মত কিছুতো আমি করি নি।
আলতাফ সাহেব শুভ্রকে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, বিদেশে স্ট্যান্ডিং অভেসন দেবার নিয়ম আছে। আমি তোমার জন্যে নিয়মটা চালু করলাম। উঠে দাঁড়ালাম।
শুভ্র লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসল।
তোমাকে যে আমি কতটুক পছন্দ করি তা কি তুমি জান?
জানি।
না, জান না। তবে আমার স্ত্রী জানে। ফিজিক্সের বাইরে আমি কোনো গল্প করতে পারি না। ফিজিক্সের বাইরে একটি বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে গল্প করি— সেই বিষয়টা হচ্ছে তুমি। তুমি কি আমার কথায় লজ্জা পাচ্ছ?
জ্বি পাচ্ছি।
আমি তোমার জন্যে সব ব্যবস্থা করে রেখেছি! তুমি ডিপার্টমেন্টে জয়েন করবে। এডহক ভিত্তিতে জয়েন করবে। আমি পরে সব রেগুলারাইজ করে নেব। তুমি আজই জয়েন কর।
শুভ্ৰ তাকিয়ে রইল। আলতাফ সাহেব আগ্রহের সঙ্গে বললেন- তুমি আজ জয়েন করবে। এবং বিকেলে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস নেবে। যাতে আমরা পরে বলতে পারি শুভ্ৰ নামে আমাদের এমন একজন ছাত্র ছিল যে যেদিন রেজাল্ট হয় সেদিনই ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করে— ও আচ্ছা আসল কথা বলতে ভুলে গেছি— তুমি কি জান তুমি কালি নারায়ণ স্কলার?
শুভ্ৰ কিছু বলল না; চুপ করে রইল। আলতাফ সাহেব বললেন, তুমি মন খারাপ করে বসে আছ কেন? ইজ এনিথিং রং?
শুভ্র বলল, স্যার আমি ডিপার্টমেন্টে জয়েন করতে পারব না।
আলতাফ সাহেব অবাক হয়ে বললেন, কেন?
আমাকে আমার বাবার ব্যবসা দেখতে হবে।
সেই ব্যবসা দেখার আর লোক নেই? তোমাকেই দেখতে হবে? ব্যবসাই যদি করতে হয় তাহলে এত পড়াশোনা করার মানে কী?
শুভ্ৰ নিচু গলায় বলল, জ্বি স্যার আমাকেই দেখতে হবে। বেশ কিছু লোকজন আমার বাবার ব্যবসায় উপর নির্ভর করে আছে। ওরা তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
কী ব্যবসা?
আমি পুরোপুরি এখনো জানি নী— একটা শুধু জানি— ঢাকা শহরের সবচে বড় যে পতিতালয় আছে, তার একটা অংশের আমি মালিক। সেখানে তিনটা বাড়ি আছে। তিনটা বাড়িতে বাহান্নজন মেয়ে থাকে। আমাদের অর্থ বিত্তের সবই এসেছে এইসব মেয়েদের রোজগার থেকে। ওরা যা আয় করে তার পঞ্চাশ পারসেন্ট আমরা নিয়ে নেই।
আলতাফ সাহেব শুভ্ৰর দিকে তাকিয়ে আছেন। শুভ্ৰও তার স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনের কেউই চোখ নামিয়ে নিচ্ছে না।
চেয়ারম্যান স্যারের ঘর থেকে বের হতেই মীরা তাকে ধরল। ঝলমলে মুখে বলল, স্যার তোকে কী বলল?
