কী বক্তৃতা?
উনি বললেন- রাস্তায় যে ইলেকট্রিক পোলগুলি দেখছি সেগুলির দুটা তার আছে। একটা দিয়ে ইলেকট্রিসিটি পাস করে। কোনো পাখি যখন সেই তার স্পর্শ করে তার অবধারিত মৃত্যু। পাখিরা এই ঘটনা জানে। এসো নিজের চোখে দেখ কাক ইলেকট্ৰিক তারে বসার আগে কী করে। এই বলে তিনি আমাকে কাক দেখাতে লাগলেন।
হাবীবুর রহমান আগ্রহের সঙ্গে বললেন, শুভ্ৰ কি তোকে খুব পছন্দ করে?
বিনু হাই তুলতে তুলতে বলল, উনি কাউকে পছন্দও করেন না, আবার অপছন্দও করেন না।
ট্রেন দ্রুত গতিতে ছুটছে। বিনু জানোলা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে। চলমান অন্ধকার দেখছে।
বিনু।
কী?
একটু দুঃসংবাদ আছেরে মা।
বল শুনি।
থাক বাড়িতে গিয়ে শুনবি।
দুঃসংবাদ শুনে এখন আমার কিছু হবে না। মস্ত বড় দুঃসংবাদেও মাথা ঠাণ্ডা রাখার কৌশল আমি শিখেছি।
শুভ্রর কাছে শিখেছিস?
হ্যাঁ। আমি একেকজনের কাছ থেকে একেকটা জিনিস শিখি। এখন বল দুঃসংবাদটা কী?
লিচু গাছটা তোর মা কাটায়ে ফেলেছে।
ও।
কাজটা সে খুবই অন্যায় করেছে। তুই তোর মার উপর কোনো রাগ রাখবি না। মা যতবড় অন্যায়ই করুক তার উপর রাগ করা কঠিন নিষেধ আছে। পিতা অন্যায় করলে তার উপর রাগ করা যায়। মার উপর করা যায় না।
আমি রাগ করি নি।
আলহামদুলিল্লাহ, শুনে বড় খুশি হলাম মা; বড়ই খুশি হয়েছি। বিনু আবারো জানোলা দিয়ে মুখ বের করল। তার খুবই কান্না পাচ্ছে। কেন কান্না পাচ্ছে সে বুঝতে পারছে না।
একটা চিরকুট
শুভ্রর বাসায় কেউ একজন একটা চিরকুট পাঠিয়েছে। কে পাঠিয়েছে শুভ্র ধরতে পারছে না। চিরকুটটা ইংরেজিতে লেখা। টাইপ রাইটারে টাইপ করা। কোনো নাম সই করা নেই। হাতের লেখা হলো- লেখা থেকে প্রেরক কে আন্দাজ করা যেত। যে পাঠিয়েছে সে নিশ্চয়ই চায় না— শুভ্র তার নাম জানুক। চিরকুট লেখা— Please come to the department, tomorrow.
শুভ্র ডিপার্টমেন্টে এসে প্রথম যে কথাটা শুনল তা হচ্ছে — রেজাল্ট হয়েছে। ফার্স্ট হয়েছে মীরা। শুভ্ৰর লজ্জা লজ্জা করতে লাগল। মীরা প্ৰথম হয়েছে শুনে তার নিজের ভাল লাগছে। এতটা ভাল যে করবে তা ভাবা যায় নি। পড়াশোনা নিয়ে মীরাকে কখনো সিরিয়াস মনে হয় নি। তার নজর ছিল হুজুগের দিকে। হৈচৈ এর দিকে। নাটকের একটা দলও পরীক্ষার আগে আগে করে ফেলল। নাটক লেখাও হল। নাটকের নাম নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসের ভেতরের প্রোটন এবং নিউট্রন নিয়ে গল্প। ইলেকট্রনের সঙ্গে প্রোটনের প্ৰেম। প্রোটন হচ্ছে মেয়ে, ইলেকট্রন ছেলে। প্রেমের জটিল পর্যায়ে মেয়েটি হঠাৎ ছেলে হয়ে যায়। তাদের প্রেম তাতে নষ্ট হয় না। অন্যরূপ নেয়; সব নিয়ে ভয়াবহ ধরনের জটিলতা নিয়ে ভয়াবহ নাটক। নিউক্লিয়াস-এর গল্প মীরার লেখা। নাটকের পরিচালকও সে। এই মেয়ে পরীক্ষায় ফার্স্ট হবে ভাবা যায় না।
শুভ্ৰ তার নিজের রেজাল্ট এখনো জানে না। কাউকে জিজ্ঞেস করতেও অস্বন্তি লাগছে। নোটিশ বোর্ডে রেজাল্ট টানানো হয় নি। চেয়ারম্যান স্যারের ঘরে ঢুকে পড়া যায়। ঢুকতে ইচ্ছা করছে না। নিজের রেজাল্ট জানার জন্যে যে প্রচণ্ড আগ্ৰহ হচ্ছে তাও না। তবে কেন জানি খুব হৈচৈ করতে ইচ্ছা করছে। রেজাল্টের পরপর সব ছেলেমেয়েরা মিলে খানিকক্ষণ খুব চেচামেচি করে। দল বেঁধে চাইনীজ খেতে যায়। এমন দলের সঙ্গে মিশে যেতে পারলে ভাল হত। মীরা যে নাটকটা করছে। সেই নাটকের একটা পাট পাওয়া গেলে মন্দ হত না। মূল চরিত্র সে করতে পারবে না। পার্শ্ব চরিত্র- যেমন হাই এনার্জি গামা রশ্মি। কিংবা আপ কোয়ার্ক, ডাউন কোয়ার্ক।
এই শুভ্ৰ।
শুভ্র চমকে তাকাল।
চেয়ারম্যান স্যারের ঘর থেকে মীরা বের হয়ে আসছে। সে কি জানত আজ তার রেজাল্ট হবে? চিরকুটটাকি সেই পাঠিয়েছে? আগুন রঙ শাড়ি পরে এসেছে। তাকে লাগছে ইন্দ্রনীর মত। শুভ্র বলল, ডিপার্টমেন্টে আসার জন্যে চিরকুটটা কি তুমি পাঠিয়েছিলে?
মীরা বলল, না। আমি কাউকে চিরকুট পাঠাই না। সরাসরি উপস্থিত হই। শুভ্র শোন, এত ভাল রেজাল্ট করলাম, কই তুইতো এখনো আমাকে কনগ্রাচুলেট করলি না।
শুভ্ৰ বলল, কনগ্রাচুলেশান্স।
মীরা বলল, থ্যাংকস। আমরা ঠিক করেছিলাম দল বেঁধে সবাই তোর বাসায় যাব। চেয়ারম্যান স্যারও বলছিলেন যাবেন। এই নিয়েই কথা হচ্ছিল। আমরা খুব মন খারাপ করেছি।
কেন?
তোর জন্যে খুব ভাল খবর আছে। আমি খবরটা তোকে দিতে পারতাম। কিন্তু চেয়ারম্যান স্যার খবরটা দিতে চাচ্ছেন।
তোমার কাছ থেকে একবার শুনি- তারপর স্যারের কাছ থেকে শুনব।
তুই এখন কে এন এস। কালী নারায়ণ স্কলার। তুই রেকর্ড নাম্বার পেয়েছিস। চেয়ারম্যান স্যারের ধারণা তোর এই রেকর্ড কেউ ভাঙ্গতে পারবে না।
শুভ্র একটু হকচাকিয়ে গেল। এতক্ষণ যে শুনছে। মীরা ফার্স্ট হয়েছে সেটা তাহলে কী?
মীরা বলল, আমি আজ ইউনিভার্সিটিতে এসেই শুনি আমি ফার্স্ট হয়েছি। আমিতো। হতভম্ব। চেয়ারম্যান স্যারের কাছে গেলাম। স্যার বললেন— মীরা মিষ্টি খাওয়াও। প্রথম হবার মিষ্টি। আমি বললাম, শুভ্ৰ! শুভ্ৰর রেজাল্ট কী? তখন স্যার বললেন— ওকে হিসাবের বাইরে রেখে তুমি ফার্স্ট। স্যারের কথা শুনে আমার খুশি হওয়া উচিত ছিল। আমি খুশি হই নি। বরং আমার রাগ লাগছে।
রাগ লাগছে?
অবশ্যই রাগ লাগছে। ছাত্রদের মধ্যে কেউ পড়াশোনায় ভাল হবে, কেউ মন্দ হবে। এই ভাল মন্দের মধ্যেও একটা মিল থাকবে। কিন্তু যদি দেখা যায় এমন কেউ আছে যাকে দলের মধ্যেই ফেলা যাচ্ছে না। তাকে বাদ দিয়ে হিসেব করতে হচ্ছে। তখন মন খারাপ হয়। শুভ্ৰ তুই কি জানিস কেউ তোকে পছন্দ করে না?
