হে আল্লাহপাক। হে গাফুরুর রহিম, ইয়া জালজালালে ওয়াল একরাম— তুমি দয়া করি আমার মেয়েকে। বড়ই ভাল মেয়ে, বড়ই লক্ষ্মী মেয়ে। তাঁর জীবনটা তুমি আনন্দে পরিপূর্ণ করে দাও। তোমার অসীম দয়া; তার এক বিন্দু যদি তুমি আমার মেয়েকে দাও— তোমার দয়া তাতে কমবে নাগো— পারওয়ার দেগার। এই নিশিরাতে আমি আমার মেয়ের হয়ে তোমার দরবারে হাত তুললাম।
জানোলা দিয়ে হুহু করে বাতাস আসছে। হাবীবুর রহমান চিন্তিত বোধ করছেন। মেয়েটার না। আবার ঠাণ্ডক্স লেগে যায়। পাতলা চাঁদর থাকলে মেয়েটাকে ঢেকে দিতে পারতেন। ট্রেনের খোলা জানালার হাওয়া খুব খারাপ জিনিস। ঠাণ্ডক্সটা বুকে বসে যায়। তাঁর একবার এইরকম করে ঠাণ্ড লেগে গেল। তবলীগ জামাতে মুসুল্পীদের সঙ্গে চিটাগাং যাচ্ছিলেন। জানালার কাছে বসেছিলেন। ঠাণ্ডা এক্কেবারে বুকে বসে গেল। জীবন-মরণ সমস্যা। মুসুল্পীরা তাকে চিটাগাং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বারান্দায় রেখে বান্দারধান চলে গেল। চিটাগাং-এ তিনি কাউকে চেনেন না। সঙ্গে টাকা পয়সা না থাকার মত। আল্লাহর অসীম মেহেরবানী ডাক্তাররা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে নিল। তাঁর চিকিৎসা করুল খুবই অল্প বয়েসী একজন মেয়ে ডাক্তার। একরাতে তিনি মোটামুটি নিশ্চিতই হলেন মারা যাচ্ছেন। অল্পবয়েসী ডাক্তারমেয়েটা ছোটাছুটি শুরু করল অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্যে। মেয়েটাকে দেখে মনে হল খুব ভয় পেয়েছে। তিনি মনে মনে বললেন, মাগো তুমি ভয় পেও না! মৃত্যু আল্লাহপাকের বিধান। কোরান মাজিদে তিনি স্পষ্ট বলেছেন- প্রতিটি জীবিত প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতে হইবে। মাগো তুমি যে সেবা এই অচেনা অজানা মানুষটার জন্য করেছ আল্লাহপাক তোমাকে তার পুরস্কার অতি অবশ্য দিবেন। আমি নিজেও খাস দিলে অন্তর থেকে তোমাকে দোয়া দিলাম। আমি নাদান হয়ত পুলসিরাত পার হতে পারব না। কিন্তু মা তুমি হাসিমুখে পার হবা।
সেই যাত্রা আল্লাহপাকের দরবারে তার হায়াত মঞ্জুর হয়েছিল। তিনি সুস্থ হয়ে বিছানায় উঠে বসতে পেরেছিলেন।
ডাক্তার মেয়েটা শাসনের ভঙ্গিতে আংগুল উঠিয়ে বলেছিল— এরকম ঠাণ্ডা আর লাগাবেন না। আপনার নিউমোনিয়া হয়েছিল। দুটা লাঙ্গসই এফেকটেড হয়ে কী বিশ্ৰী অবস্থা। না না হাসবেন না। আপনার হাসি আমার একেবারেই ভাল লাগছে না। আপনি কী মনে করে শীতের কাপড় ছাড়া বাড়ি থেকে বের হলেন?
তাঁর তখন বলতে ইচ্ছা করছিল— মাগো আমার অন্তরের একটা ইচ্ছা যে পিতামাতা তোমার মত সুসন্তানের জন্ম দিয়েছে তাদের সঙ্গে মোলাকাত করা। তিনি তাঁর মনের কথা মেয়েটিকে বলতে পারেন নি, সাহসে কুলায় নি, কারণ ডাক্তার মেয়েটা বদরাগী। কথায় কথায় সবাইকে ধমকাধামকি করে।
আচ্ছা বিনু প্রসঙ্গেও কি কোনোদিন লোকজন বলবে— বিনুর মত সুসন্তানের যে পিতামাতা জন্ম দিয়েছেন তাদের দেখতে পারলে ভাল হত। অবশ্যই বলবে। বিনু সেই জাতের মেয়ে। কে জানে হয়ত শুভ্রর বাবা-মাও এমন কথা বলবেন। শুভ্ৰর মা নিশ্চয়ই মনে মনে ভাবেন- এ রকম একটা মেয়ে তার ছেলের বউ হলে ভাল হত।
বিনু ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসল। হাবীবুর রহমান ব্যস্ত হয়ে বললেন, পানি খাবি মা? এক বোতল পানি কিনে রেখেছি।
বিনু বলল, পানি খাব না।
জানালার কাচটা নামায় দেই? ঠাণ্ড বাতাস আসছে।
জানোলা খোলা থাকুক। বাবা দেখতো আমার জ্বর কিনা।
হাবীবুর রহমান মেয়ের কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠলেন। কপালটা গরম। চিন্তিত হবার মত কিছু না, কিন্তু তাঁর চিন্তা লাগছে। তিনি বললেন, আমার পিঠে মাথা রেখে শুয়ে থাক।
উঁহু। ঘুম কেটে গেছে।
হাবীবুর রহমান মেয়ের দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, শুভ্রর মা তোকে খুবই পছন্দ করেন। তাই না রে।
হুঁ করেন।
অতি মহিয়সী মহিলা। নিজের এত বড় বিপদেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে তোকে টাকাটা দিলেন। ভাবা যায় না।
টাকা আছে- দিয়েছে।
উনাকে অসম্মান করে এ ধরনের কথা বলবি না। টাকা অনেকেরই আছে। কয়জন আর টাকা বিলায়? ঠিক বলেছি না?
হুঁ।
মানুষের মধ্যে ভাল মন্দ দুইই আছে। ভালটার কথা বলতে হয়। মন্দটা চেপে যেতে হয়। সহি হাদিস আছে— যে ব্যক্তি অন্যের ভাল গুন নিয়া আলোচনা করে, মন্দ বিষয়ে নীরব থাকে, আল্লাপাক তার ভেতর থেকে মন্দ উঠেয়ে নেন।
তাহলেতো বাবা তোমার মধ্যে কোনো মন্দ নেই। আল্লাহপাক সব উঠায়ে নিয়েছেন। তোমার চোখেতে সব মানুষই ভাল।
মানুষ যদি ভাল হয় আমি কী করব বল? যে ভাল আমিতো তাকে জোর করে মন্দ বলতে পারি না।
হাবীবুর রহমান আবারো মেয়ের কপালে হাত দিলেন। জ্বর সামান্য বেড়েছে। বাড়তে যখন শুরু করেছে তখন আরো বাড়বে। আল্লাহপাকের সব কাজের পেছনে ভাল কিছু আছে। এই যে মেয়েটার জ্বর বাড়ছে এরও ভাল দিক অবশ্যই আছে। তিনি ধরতে পারছেন না।
বিনু
হুঁ।
শরীর বেশি খারাপ লাগছে?
না।
আমরা মনে হয় মা একটা ভুল করলাম।
কী ভুল?
একটা মানুষ মারা গেছে। পরিবারের অন্যদের কত বড় দুঃখের ব্যাপার। এই সময় আমাদের উচিত ছিল তাদের পাশে থাকা। সান্ত্বনা দেয়া। বিশেষ করে শুভ্ৰ।
উনার সান্ত্বনার দরকার নেই বাবা।
কেন?
উনি তোমার আমার মত না। খুব আলাদা। একটা ঘটনা বললেই বুঝবে— উনার বাবা মারা গেছেন। উনি সেই খবর পেয়েছেন। খবর পাওয়ার পর খুব স্বাভাবিকভাবে মার সঙ্গে বসে চা খেলেন। তার কিছুক্ষণ পরই আমাকে ডেকে বারান্দায় নিয়ে গভীর ভঙ্গিতে একটা বক্তৃতা দিয়ে ফেললেন।
