আল্লাহপাক মনে হয় এতদিন পর সেই ঘটনার শোধ নিচ্ছেন। সেদিন তিনি নিশ্চয়ই তার উপর খুবই রাগ হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন- হে বান্দা তুমি অন্যের অপমান দেখে মজা পেয়েছে; অন্যের লজ্জা দেখে আনন্দ করেছ। ইহা উচিত কর্ম নহে। একদিন এই অবস্থার ভিতর দিয়ে তোমাকেও যাইতে হইবে। ইহাই আমার বিধান।
গ্রামের কথা আছে – যে যার নিন্দে, তার দুয়ারে বসে কান্দে।
হাবীবুর রহমান পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে তাঁর কপালে এই দুৰ্দশা আছে। দুয়ারে বসে গলা ছেড়ে তাকেই কাঁদতে হবে।
কমলাপুর রেলস্টেশনে ঢুকতে তাঁর কোনো অসুবিধা হয় নি। টিকিট চেকার অন্যদের কাছে টিকিট চাইলেও তার কাছে চায় নি। ট্রেনের কামরায় তিনি ভাল সীটও পেয়ে গেলেন। জানালার পাশে সীট। কামরাও ফাঁকা, ভিড় তেমন নেই।
সব কিছুই ঠিকঠাক মত এগুচ্ছে। এর ফল শুভ নাও হতে পারে। হাবীবুর রহমান ট্রেন ছাড়ার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত ক্টেশনের প্লাটফর্মে হাঁটাহাটি করলেন। তাঁর দেখার বিষয় একটাই। টিকিট চেকার কোন কামরায় উঠে। তার মন একবার বলছে, এত ভয় পাবার কিছু নেই। পাকিস্তান আমলে ট্রেনে যত কড়া চেকিং হত, এখন তত কড়া চেকিং হয় না। পরীক্ষণেই মন বলছে- জীবনের সবচে বড় অপমান আজই হতে হবে। মেয়ের সামনে তাকে নিয়ে হাজতে ঢুকিয়ে দেবে।
হাবীবুর রহমানের হাতের শেষ সম্বল পাঁচ টাকাটা তিনি খরচ করে ফেললেন। মেয়ের জন্যে একটা সাগর কলা, একটা বিসকিট এবং এক কাপ চা কিনলেন। ট্রেন ছাড়তে দেরি আছে। বিনু কিছু খাওয়া দাওয়া করে নিক। মেয়েটা মরা বাড়ি থেকে আসছে- সারাদিন নিশ্চয়ই কিছু খায় নি।
বিনু কোনোরকম আপত্তি না করে কলাটা খেল। চায়ে ড়ুবিয়ে বিসকিট খেল। চায়ের শেষ ফোঁটাটা পর্যন্ত খেল। মেয়েটা এত আগ্রহ করে খাচ্ছে দেখে হাবীবুর রহমানের চোখে পানি এসে গেল। আহা বেচারী, নিশ্চয়ই খুব ক্ষিধে লেগেছে। বোঝাই যাচ্ছে মরা বাড়িতে সারাদিন সে কিছুই খায় নি। তার কাছে টাকা থাকলে মেয়েটার জন্যে এক প্যাকেট বিরিয়ানী কিনে আনতেন। তিনি দেখেছেন রেল স্টেশনের স্টলে প্যাকেট বিরিয়ানী বিক্রি হচ্ছে। ফুল প্লেট পঞ্চাশ টাকা। হাফ প্লেট ত্ৰিশ টাকা। হাফ প্লেটে দুই পিছ মাংস, একটা চপ এবং অর্ধেকটা ডিম আছে।
হাবীবুর রহমান বললেন, মারে পান খাবি?
বিনু বলল, খাব।
হাবীবুর রহমান মেয়ের জন্যে মিষ্টিপােন কিনে আনলেন।
বিনু বলল, বাবা তুমি প্লাটফর্মে হাঁটাহাটি করুছ কেন? উঠে এসো। হাবীবুর রহমান বললেন, ট্রেনের বগির ভিতর কেমন দমবন্ধ দমবন্ধ লাগে। ট্রেন ছাড়ার আগে আগে উঠবরে মা।
তাহলে জানালার কাছে থাক। তুমি দূরে গেলে আমার অস্থির লাগে।
এই কথাতেও হাবীবুর রহমানের চোখ ভিজে গেল। তিনি দূরে গেলে মেয়েটার অস্থির লাগে। মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবে। সে তো দূরে চলে যাবেই। আহারে বেচারি। খুব অস্থির থাকবে।
বিনু বলল, বাবা তোমাকে এত চিন্তিত লাগছে কেন?
হাবীবুর রহমান বিব্রত গলায় বললেন, চিন্তিত নারে মা। মনটা খারাপ। মানুষটা মরে গেল। একটা ভাল মানুষ পৃথিবী থেকে কমে গেল।
উনি খুব ভাল মানুষ ছিলেন বাবা?
অত্যাধিক ভাল ছিলেনরে মা। বিপদে পড়ে যতবার তার কাছে সাহায্যের জন্যে গিয়েছি ততবার তিনি সাহায্য করেছেন। তার কাছে আমার যে ঋণ সেই ঋণ কীভাবে শোধ দিব। তাই ভাবতেছি।
সব ঋণ শোধ করতে হয় না।
তাও ঠিক। তবে মা আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গ্রামে ফিরেই উনার জন্যে কোরান মজিদ খতম দিব। কিছু ফকির মিসকিন খাওয়াব।
বিনু বলল, তুমি আবার ফকির মিসকিন কি খাওয়াবা? তুমি নিজেইতো ফকির মিসকিন।
তাও সত্যি মা। অতি সত্য কথা।
বাবা তুমি কি টিকিট করেছ? তোমাকে টিকিট করতে দেখলাম না।
হাবীবুর রহমান চুপ করে রইলেন, কিছু বললেন না। বিনু বলল, তোমার কাছে কি টিকিট কিনার টাকা নাই?
হাবীবুর রহমান এই কথারও জবাব দিলেন না। লজ্জায় তাঁর মরে যেতে ইচ্ছা করছে। বিনু বলল, যাও টিকিট কেটে আনা। আমার কাছে টাকা আছে।
তুই টাকা কোথায় পেলি?
চাচি দিয়েছেন।
হঠাৎ তোকে টাকা দিলেন কেন? তুই চেয়েছিল।
ছিঃ আমি চাইব কেন? তুমি একটা চিঠি লিখেছিলে না। টাকা নেই বলে আমাকে নিতে আসতে পারছি না। এই চিঠিটা উনি পড়েছিলেন। আমার মনে হয়। এই জন্যেই দিয়েছেন। আমি নিতে চাই নি। উনি জোর করেই দিয়েছেন।
কত টাকা?
দুই হাজার টাকা।
হাবীবুর রহমান ধরা গলায় বললেন, অতি মহিয়সী মহিলা। ঠিক নারে মা? কতবড় বিপদ তাঁর মাথার ওপর। স্বামী মারা গেছে। সব আঁউলা ঝাউলা। এর মধ্যেও মনে রেখেছেন– তোর হাত খালি। আল্লাহপাক যে বেহেশতো তৈরি করে। রেখেছেন সেই বেহেশতো আমার মত নাদানের জন্যে না। এইসব মানুষের জন্যে। বুঝলি মা আমি ঠিক করেছি— শুভ্ৰ সাহেবের মার জন্যেও আমি কোরান খতম দিব। ফকির মিসকিন খাওয়াব।
যাকে তোমার পছন্দ হয় তার জন্যেই তুমি কোরান খতম দাও। ফকির মিসকিন খাওয়াও। তোমার জীবনতো কেটে যাবে কোরান খতম দিতে দিতে। আর ফকির মিসকিন খাওয়াতে খাওয়াতে।
মাগো এইটাও আল্লাহপকের নির্ধারণ করা। আল্লাহপাক আমার জন্যে কোরান পাঠ নির্ধারণ করে রেখেছেন। আমি কী করব বল?
ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। হাবীবুর রহমান মেয়ের পাশে বসে আছেন। তাঁর মন আনন্দে পরিপূর্ণ। কারণ তিনি টিকিট কেটেছেন। হাফ প্লেট বিরিয়ানী কিনে মেয়েকে খাইয়েছেন। মেয়ে বাবার ঘাড়ে মাথা রেখে ঘুমুচ্ছে। ঘুমের মধ্যে মেয়েটা বোধহয় দুঃস্বপ্ন দেখছে। কেঁপে কেঁপে উঠছে। হাবীবুর রহমান জানোলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। জানালার বাইরে ঘন অন্ধকার। সেই অন্ধকার দেখতেও তার ভাল লাগছে। তিনি মনে মনে তাঁর মেয়ের জন্য পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করছেন
