বাদলা দিনে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এল বান।
কবর ঘেঁষে বিনু দাঁড়িয়ে আছে। বিনুর বাবা তার মাথার উপর ছাতি ধরে আছেন। ভদ্রলোকের নাম যেন কী? নামটা মনে পড়ছে না— তবে একটু পরেই মনে পড়বে। আমি অন্যকিছু ভাবব আর আমার মস্তিষ্ক স্মৃতির ফাইল ঘেঁটে ভদ্রলোকের নাম বের করে আমাকে জানাবে, হুট করে বলবে, হ্যালো মিস্টার নাম পাওয়া গেছে। বিনু মেয়েটার বাবার নাম হল…।
বিনুর বাবা ভিজছেন। তিনি ভিজবেন কিন্তু মেয়েকে ভিজিতে দেবেন না। ভদ্রলোক তাঁর মেয়েকে নিয়ে যেতে এসে ফেঁসে গেছেন। ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাকে হয়ত কবরস্থানে আসতে হয়েছে। বিনু কি আজ রাতে চলে যাবে? হয়ত যাবে। আমি আর মা এই দুজন বাড়ি ফিরে যাব। পুরো দুতলাটা থাকবে খালি! কাজের মেয়েটাকে মা আজ দুপুরে বিদেয় করে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই সে কোনো একটা অপরাধ করেছে; মার চোখে মস্ত বড় অপরাধ। তবে মার চোখে মস্ত বড় অপরাধগুলি আসলে হয় তুচ্ছ অপরাধ। নিতান্তই তুচ্ছ কোনো কারণে বেচারীর চাকরি গেছে। সেই কারণটা এক সময় মার কাছ থেকে জেনে নিতে হবে। আচ্ছা কাজের মেয়েটার নাম যেন কী? এই মেয়েটার নামওতো জানতাম। আজ দেখি সবই ভুলে যাচ্ছি। বিনুর বাবার নাম এখনো আমার মস্তিষ্ক খুঁজে বের করতে পারে নি। মীরাদের বাড়িতে যে আর্কিটেক্টের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার নাম কী?
হ্যাঁ তাঁর নামটা মনে আছে – আখলাক সাহেব; এই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হলে বলতে হবে।— ভাই শুনুন, আমাদের বাড়ির কাছাকাছি একটা পতিতালয় আছে কি-না। আপনি জানতে চেয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম আছে। কিন্তু আসল খবরটা দেয়া হয় নি। সেই পতিতালয়ের একটা অংশের মালিক উত্তরাধিকার সূত্রে আমি। পতিতালয়ের ভেতর তিনটা বাড়ি আছে আমাদের। তিনটা বাড়িতে তিনজন মাসি। তারাই মূল ব্যবসা দেখাশোনা করে। মেয়েদের রোজগারের পঞ্চাশ পার্সেন্ট আমরা পাই। মেয়ের সংখ্যা সব মিলিয়ে বাহান্ন। একদিন আসুন আপনাকে নিয়ে যাব।
মীরাকেও খবরটা দিতে হবে। আজ রাতেই খবরটা দেয়া ভালো।
কাজের মেয়েটার নাম মনে পড়েছে। রমিজা। বিনুর বাবার নামও মনে পড়েছে। হাবীবুর রহমান। মানুষের মস্তিষ্কের কাজকর্মের ধারা তো অদ্ভুত। তাকে প্রথমে খুঁজতে বলা হয়েছে বিনুর বাবার নাম। তারপর কাজের মেয়েটার নাম। সে আগে খুঁজে বের করেছে কাজের মেয়েটার নাম। আশ্চর্য তো।
ম্যানেজার ছালেহ একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি কী দেখছেন? শোকে কাতর সন্তানের মুখ? আমাকে দেখে কি শোকে কাতর মনে হচ্ছে? তবে মাকে মনে হচ্ছে। তিনি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর শরীর থরথর করে কাঁপছে।
বাবাকে কবরে নামানো হচ্ছে। মৃত মানুষকে বাবা ডাকছি এটা কি ঠিক হচ্ছে? মৃত মানুষ বাবা হতে পারে না। মা হতে পারে না। মৃত হলো মৃত।
কবরে মাটি ছুড়ে দেয়ার নিয়ম। কেউ একজন এসে আমার হাতে এক মুঠ মাটি এনে দিল। মাটি ছুড়ে দেবার সময় কি বলতে হয় Dust to dust? না এটা তো। খ্রিস্টানদের ব্যাপার। মুসলমানরা নিশ্চয়ই অন্য কিছু বলে–
বাবার সম্পর্কে সুখময় কোনো স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করছি। মনে পড়ছে না। মনে হচ্ছে বাবার সম্পর্কে আমার মনে কোনো সুখ-স্মৃতি নেই। একটা কিছু মনে করতে চাই। সুখ-স্মৃতি। মন দ্রবীভূত হয়ে যাবার মতো কোনো স্মৃতি।
মনে পড়ছে না। কিছুই মনে পড়ছে না; ম্যানেজার ছালেহ হাউমাউ করে কাঁদছেন। তার সঙ্গে আরো অনেকেই কাঁদছে। বাবার অফিসের লোকজন। তাদের এই শোক লোক দেখানো নয়। এই শোক হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে এসেছে। বাবাকে এরা যে ভালোবাসত এ সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই।
যে ব্যক্তি দশজন ব্যক্তির সত্যিকার ভালোবাসা পাইয়াছে তাহার বিষয়ে সাবধান। কারণ সে ঈশ্বরের অংশ।
এটা কার কথা? স্বামী বিবেকানন্দ নাকি রামকৃষ্ণ পরমহংস? মনে পড়ছে না। আমি মার দিকে তাকালাম। মা ক্ষীণ গলায় বললেন, তোমরা কেউ আমার খোকনকে ধরে; ও কেমন কাঁপছে দেখো। পড়ে যাবে তো।
হাবীবুর রহমানের মুখ দুঃশ্চিন্তায় এতটুকু হয়ে গেছে। মনে মনে ক্রমাগত দোয়া ইউনুস পড়ছেন। মহাবিপদে পড়লে এই দোয়া খুব কাজে লাগে। তিনি অতীতেও কয়েকবার বড় ধরনের বিপদে পড়েছিলেন। এই দোয়া পড়ে উদ্ধার পেয়েছেন। এবার কি পাবেন? আল্লাহ বার বার মানুষকে উদ্ধার করেন না। একজনকে তিনি কতবার উদ্ধার করবেন? ইউনুস নবীকে তিনি একবারই মাছের পেট থেকে নাজাত করেছিলেন। তিনি যদি আরো কয়েকবার মাছের পেটে ঢুকতেন তাহলে তাকে উদ্ধার করতেন কি-না কে জানে।
হাবীবুর রহমানের বিপদের কারণ হল তিনি খালি হাতে ঢাকায় এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। ভেবে রেখেছেন মোতাহার সাহেবের কাছে যাবেন, তাকে বিপদের কথা বলবেন। তিনি নেত্রকোনায় ফিরে যাবার ভাড়ার টাকা দিয়ে দেবেন। মোতাহার সাহেবের মত মানুষের জন্যে এটা কোনো ব্যাপারই না।
আল্লাহপাকের কাজ বোঝা মুশকিল। এসে দেখেন— সাড়ে সর্বনাশ। মরা বাড়ি। যার কাছে টাকা চাইবেন সে মরে পড়ে আছে। মানকের নোকরের সোয়াল জওয়াবের অপেক্ষা করছে। পুলছিরাত কীভাবে পার হবে সেই ভাবনাতেই সে অস্থির। তার কাছে টাকা চাইবে কী? সে নিজেই পাড়ের কড়ির চিন্তায় অস্থির।
সে বাড়িতে মৃত্যুর মত ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে সে বাড়িতে অন্য কারোর কাছেও টাকা ধার চাওয়া যায় না। হাবীবুর রহমান ভেবেই পেলেন না। তিনি মেয়েকে নিয়ে নেত্রকোনায় কীভাবে ফিরবেন। তার কাছে সর্বমোট আঠারো টাকা পঞ্চাশ পয়সা আছে। এই টাকায় হয়তবা কমলাপুর রেল ষ্টেশন পর্যন্ত যাওয়া যাবে। তারপর? রেলের টিকিট কীভাবে কাটবেন? বিনা টিকিটে যে ট্রেনে উঠবেন সে উপায়ও নেই। কমলাপুর ইস্টশনে ব্যবস্থা ভিন্ন। স্টেশনে ঢোকার আগেই টিকিট চায়। ধরা গেল কোনো এক কৌশলে বিনা টিকিটেই স্টেশন ঢুকলেন, এখানেই বিপদের শেষ না। ট্রেনে চেকিং হবে। টিকিট চেকার যখন টিকিট চাইবে তখন তিনি কী বলবেন? এতবড় মেয়ের সামনে টিকিট চেকার যখন তাকে ট্রেন থেকে নামাবে। তখনইবা তিনি কী করবেন? টিকিট চেকার খারাপ ধরনের অপমানও করতে পারে। তার পরিষ্কার মনে আছে একবার নান্দাইলরোড ষ্টেশনে মোবাইল কোট বসেছে। বিনা টিকিটের বিশ একুশজন যাত্রী পাওয়া গেল। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের হুকুমে তারা কানো ধরে দশবার উঠবোস করেছে। তিনি ট্রেনের জানালা থেকে এই দৃশ্য দেখে খুবই মজা পেয়ে বলেছিলেন– উচিত শিক্ষা হয়েছে।
