মৃতদেহ নিয়ে যে গাড়ি যায় সেই গাড়ির দিকেও সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে তাকায়। গাড়িতে একটা লাল নিশান উড়ে। লাল নিশান মানেই শব বহনকারী গাড়ি। তবে সবাই আগ্রহ নিয়ে তাকালেও মৃতদেহের মুখ কেউ দেখতে চায় না। মৃতদেহ নিয়ে যারা যাচ্ছে তাদেরকে দেখতে চায়। মৃত মানুষকে দেখে কী হবে? মৃত মানুষের কোনো গল্প থাকে না। মানুষ গল্প চায়।
খোকন!
মা আমার আরো কাছে সরে এলেন। আমি মার দিকে তাকলাম।
মা ফিস ফিস করে বললেন, তোর বাবার উপর তুই কোনো রাগ রাখিস না। মৃত মানুষের উপর কোনো রাগ রাখতে নেই।
আমার কোনো রাগ নেই।
তোর বাবা মানুষ খারাপ ছিল না।
খারাপ থাকবে কেন?
মা কথা ঘুরিয়ে বললেন, তোর বমি বমি ভাবটা কি দূর হয়েছে?
হ্যাঁ।
আমাদের ঠিক সামনেই সাদা পিক-আপ ভ্যান। সেই ভ্যানে বাবার অফিসের কর্মচারীরা বসে আছে। তাদের মাঝখানে বাবার মৃতদেহ। এইসব কর্মচারীরা এক সময় বাবার ভয়ে অস্থির ছিল। এখনো তারা ভয় পাচ্ছে। তাদের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা ভয় পাচ্ছে। মৃত মানুষকে সবাই ভয় পায়।
রাস্তার যানজট পরিষ্কার হয়েছে। তবে পুলিশ আমাদের গাড়ি আটকে রেখেছে। শুধু লাশবহনকারী পিকআপ ছেড়ে দিয়েছে। নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী বা এই পর্যায়ের কেউ যাবেন। মা বললেন, ভাল যন্ত্রণায় পড়া গেল দেখি।
আমার মনে হচ্ছে এটা মায়ের কথার কথা। তার সামনে থেকে লাশের গাড়িটা চলে গেছে। এই ঘটনায় তিনি আনন্দিত।
শুভ্র!
হুঁ।
শুরুত্ৰ নামটা আসলে তোর বাবা রাখে নি। এখন মনে পড়েছে! তোর বাবার এক বন্ধু তোকে দেখে অবাক হয়ে বলেছিল— ছেলের কী অদ্ভুত গায়ের রঙ! একেবারে তুষার-শুভ্ৰ। সেই থেকে তোর নাম শুভ্ৰ।
বাবার ঐ বন্ধুর নাম কী?
রহমান সাহেব।
তাকে কি আমি দেখেছি?
খুব ছোটবেলায় দেখেছিস। রোড একসিডেন্টে মারা গেছেন।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছে। গাড়ির ড্যাম বোর্ডের ঘড়িতে চারটা চল্লিশ বাজে। আকাশ অন্ধকার। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে। বৃষ্টির পানিতে কবর ভর্তি হয়ে যাবে। পানির ভেতর কফিন নামিয়ে মাটি চাপা দিয়ে আমরা চলে আসব। ব্যস শেষ।
শুভ্ৰ, তোর কি মাথা ধরেছে?
না।
চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে শুয়ে থাক, ভালো লাগবে।
আমি মাতৃভক্ত সন্তানের মতো চোখ বন্ধ করে গাড়ির পেছনের সিটে হেলান দিয়ে শুয়ে আছি। ডায়েরি লেখা এখন প্ৰায় শেষ পর্যায়ে। কারণ আমরা প্ৰায় পৌছে। গেছি। শেষ অংশে ইন্টারেস্টিং কিছু লিখতে হবে।
আমি মাতৃভক্ত সন্তানের মতো চোখ বন্ধ করে গাড়ির পেছনের সিটে হেলান দিয়ে শুয়ে আছি। ডায়েরি লেখা এখন প্ৰায় শেষ পর্যায়ে। কারণ আমরা প্ৰায় পৌঁছে। গেছি। শেষ অংশে ইন্টারেস্টিং কিছু লিখতে হবে।
এখন বাজছে চারটা পঞ্চাশ। টিপটপ করে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টিকে শুভ ও মঙ্গলময় ধরা হয়। মৃত্যুও শুভ এবং আমার বাবা মোতাহার হোসেন সাহেব মঙ্গলময় বৃষ্টিতে তাঁর যাত্রা শুরু করবেন। এটা মন্ত না। পুত্র হিসাবে তার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। একজন মানুষকে এই পৃথিবীতে নানান ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়। পিতার ভূমিকায়, স্বামীর ভূমিকায়, বন্ধুর ভূমিকায়…। সবাই সব অভিনয় পারে না। যে পিতার ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করে দেখা যায় স্বামীর ভূমিকায় তার অভিনয় খুব খারাপ হচ্ছে। অভিনয় এতই খারাপ হয় যে তাকে অভিনয় করতে দেয়া হয় না। স্টেজ থেকে নামিয়ে দেয়া হলো। বাবা নিশ্চয়ই কিছু কিছু চরিত্রে খুব ভালো অভিনয় করেছেন। পিতার চরিত্রে তার অভিনয় ভালো ছিল।
আমরা এসে পৌঁছে গেছি। গেটের কাছে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বাবার অফিসের ম্যানেজার এগিয়ে আসছে। তার মুখ গম্ভীর। সে হাঁটছেও মাথা নিচু করে। বেচারা বোধহয় তাড়াহুড়ার কারণে টুপি আনতে ভুলে গেছে। হলুদ রঙের একটা রুমাল মাথায় দিয়েছে।
আমি মার দিকে তাকিয়ে বললাম, আচ্ছা মা, একটা কথা— স্বামী হিসেবে বাবা কেমন ছিল?
মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ভালো।
ভালো মানে কতটুকু ভালো?
মা একটু থেমে বললেন, তোর বাবা ছিল আদর্শ স্বামী।
মাকে আমার আরো একটা প্রশ্ন করার ইচ্ছা ছিল। প্রশ্ন করা হলো না। ম্যানেজার সাহেব এসে গাড়ির দরজা খুলে দিয়েছেন। বৃষ্টি বেশ ভালোই নেমেছে। আজকের বৃষ্টিটা মনে হয় আকাশের অনেক উপরের থেকে আসছেখুব ঠাণ্ডা! গা শিরশির করছে। খাটিয়া নামিয়ে রাখা হয়েছে। খাটিয়ার উপর দুজন মানুষ ছাতা ধরে আছেন। শবদেহে যেন বৃষ্টির ফোঁটা না পড়ে। খাটিয়ার পাশে হাতলওয়ালা এক চেয়ার। সেখানে মৌলানা সাহেব বসে আছেন। তার গায়ে সৌদিদের মতো পোশাক। আজকাল মৌলানাদের মধ্যে এই জাতীয় পোশাকের খুব চল হয়েছে। মৌলানা সাহেব বিরক্ত মুখে গাড়ি দেখছেন। মনে হচ্ছে তার অন্য কোনো এপয়েন্টমেন্ট আছে; আয় কেউ হয়তো মারা গেছে। তাকেও কবরে নামাতে হবে।
ডক্টর জিভাগো উপন্যাসে শবদেহ সমাধিস্ত করার সুন্দর বর্ণনা আছে- ঝড় বৃষ্টির মধ্যে শবদেহ কবরে নামানো হল। কবরে কয়েকটা জীবন্ত ব্যাঙ। ব্যাঙ সহই মাটি চাপা দেয়া হল। বাচ্চা একটি মেয়ে দৃশ্যটি দেখছে। তার মাথায় ঘুরছে শুধুই জীবন্ত ব্যাঙগুলির কথা।
বৃষ্টি আরো বাড়ছে। ম্যানেজার সাহেব একটা ছাতা এনে মায়ের মাথার সামনে ধরেছেন। আমার মাথায় কবিতার লাইন ঘুরছে—
বাদলা দিনে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এল বান।
আমি খুবই অস্বস্তি বোধ করছি, কারণ এই দুটা লাইন আজ আমার মাথায় ঢুকে যাবে। আমার মগজের ভেতর বসে কেউ একজন টানা টানা গলায় ক্রমাগত বলতে থাকবে–
