কাগজ কলম দিয়ে কিছু লিখতে আমার ভাল লাগে না, তবে মনে মনে ডায়েরি লিখতে আমার ভাল লাগে।
আমার নাম শুভ্ৰ এই বাক্যটি দিয়ে আমি লেখা শুরু করেছি। শুরুতেই ভুল করেছি। — শুরুর বাক্যটা হওয়া উচিত ছিল— আজ আমার বাবা মারা গেছেন। এখন আমরা তাঁর মৃতদেহ নিয়ে বনানী গোরস্তানের দিকে যাচ্ছি। বনানী গোরস্তানে বাবার জন্যে জায়গা কেনা আছে। সেখানে তার কবর হবে। কবর বঁধানো হবে। শ্বেতপাথরের নামফলক বাধানো কবরে লাগিয়ে দেয়া হবে। যতবার আমরা গোরস্তানে আসব নামফলকের নাম আগ্রহ নিয়ে পড়ব। জন্ম এবং মৃত্যুর তারিখ পড়ব। এক সময় তার চেহারা আমাদের কাছে অস্পষ্ট হতে শুরু করবে। শ্বেতপাথরের লেখাটাও নষ্ট হতে থাকবে। মোতাহার-এর র-এর ফোটা উঠে গিয়ে হয়ে যাবে মোতাহাব।
আমার কাছে এখনই বাবাকে অস্পষ্ট লাগছে। তিনি চুলে কীভাবে সিঁথি করতেন? আশ্চৰ্য মনে পড়ছে নাতো। মাকে কি জিজ্ঞেস করব? মা! এখন শান্ত ভঙ্গিতেই বসে আছেন। মাঝে মধ্যে সরু চোখে আমাকে দেখছেন। বনানী যেতে সময় লাগবে। গাড়ি জামে পড়বে, মহাখালি রেল ক্ৰশিং-এ গেস্ট পড়ে যাবে। এতক্ষণ কি আমরা চুপচাপ বসে থাকব!
শুভ্ৰ পানি খাবি?
মার কথা শুনে চমকে উঠলাম। কেন চমকালাম- আমি কি ধরেই নিয়েছি মা সারাপথ কথা বলবেন না। চোখ এবং নাক মুছতে মুছতে সময় পার করবেন।
আমি মার প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ-না কিছুই বললাম না। মা খয়েরি রঙের ব্যাগের ভেতর থেকে পানির বোতল বের করলেন। গ্লাস বের করলেন। পানি ঠাণ্ডা। ফ্ৰীজ থেকে বোতল নিয়ে এসেছেন। আমার যে এতটা তৃষ্ণা পেয়েছিল বুঝতে পারিনি। পরপর দুগ্লাস পানি খেয়ে ফেললাম। তারপরেও মনে হল তৃষ্ণা যায় নি। আরো এক গ্ৰাস পানি খেতে পারব।
মা আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। পিতার মৃত্যু-শোকে আমি কতটা কাতর হয়েছি। এই কি বুঝতে চেষ্টা করছেন? নাকি অন্য কিছু?
খালি পেটে দুগ্ৰাস পানি খাবার জন্যেই বোধহয় এখন কেমন বমি বমি আসছে।
গাড়ি থামিয়ে পানের দোকান থেকে আমি কি একটা পান। কিনে নেব? মিষ্টি পান। খুবই হাস্যকর ব্যাপার হবে না? সাদা রঙের পিক আপ ভ্যানে বাবার মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার পেছনে পেছনে যাচ্ছি। আমি। পথে গাড়ি থামিয়ে আমার একটা মিষ্টি পান। কিনে নেয়াটা খুব কি দোষনীয় হবে?
কথা ছিল মৃতদেহের সঙ্গে আমি যাব। তাই না-কি নিয়ম— অতি প্রিয়জনরা মৃতদেহের সঙ্গে যায়। আমিও খুব আগ্রহের সঙ্গেই যেতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু মা রাজি হলেন না। তিনি বললেন, না না খোকন ভয় পাবে। শুভ্ৰ ভয় পাবে না বলে তিনি বললেন, খোকন ভয় পাবে। হঠাৎ হঠাৎ মা আমাকে শুভ্ৰ না ডেকে খোকন ডাকেন। কেন ডাকেন? মানুষের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের পেছনে কারণ থাকে। শুভ্র না ডেকে খোকন ডাকার পেছনে কারণ কী?
আমি মার দিকে তাকলাম। মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, কীরে শরীর খারাপ লাগছে?
না।
একটু পরপর ঠোঁট চাটছিস কেন?
শরীর খারাপ লাগছে মা, বমি বমি লাগছে। পান খেতে ইচ্ছা করছে।
মা আবারো তার খয়েরি ব্যাগে হাত দিলেন। ব্যাগ থেকে এখন কি মিষ্টি পান বের হবে? আর কী আছে। এই ক্যাগে? চা আছে? মা কি ফ্লাস্ক ভর্তি চা নিয়ে এসেছেন? নোনতা বিসকিট? মাথা ধরার এসপিরিন ট্যাবলেট?
মিষ্টি পান না, সুপারির কোটা বের হল। সুপারি মুখে দিতে দিতে বললাম, মা আমার শুভ্ৰ নাম কে রেখেছে? তুমি?
না। তোর বাবা।
তুমি যে মাঝে মাঝে আমাকে খোকন ডাক। খোকন নাম কে রেখেছে? কেউ রাখে নি। খোকন, বাবু এইসব নাম রাখতে হয় না। আপনা আপনি হয়ে যায়।
বলতে বলতে মা নিজেও দুটুকরা সুপারি মুখে দিলেন। এতক্ষণ তাঁর মাথায় ঘোমটার মত শাড়ির আঁচল ছিল। এখন সেই আঁচল পড়ে গেল। তিনি আঁচল তুলে দিলেন। তাকে এখন কত সহজ স্বাভাবিক লাগছে; মনেই হচ্ছে না। এই মহিলা তাঁর স্বামীর মৃতদেহ কবর দিতে নিয়ে যাচ্ছেন। বরং মনে হচ্ছে তিনি তাঁর ছেলেকে চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন। ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার পথে কোনো এক কফি শপের কাছে গাড়ি থামাবেন। মাতা ও পুত্র গাড়িতে বসে থাকবে। ড্রাইভার এক দৌড়ে পেপার কাপে দুজনের জন্যে কফি নিয়ে আসবে। ফেনা ওঠা এক্সপ্রেসো কফি।
গাড়ি জামে আটকা পড়েছে। ট্রাফিক পুলিশ, ট্রাফিক সার্জেন্টিরা ছোটাছুটি করছে। ক্রমাগত বাঁশিতে ফু দিচ্ছে। একজন রিকশাওয়ালাকে কোনো কারণ ছাড়াই ধাক্কা দিয়ে রিকশা থেকে ফেলে দিল। যানজট খুলে দেবার জন্যে তাদের এত ব্যস্ততার কারণটা কী? প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি কি এই পথে যাবে? আমি বেশ আগ্ৰহ নিয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি। যদি প্রধানমন্ত্রীকে এক ঝলক দেখা যায়। গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের দেখতে আমাদের ভাল লাগে। তারা কেমন হুস করে সামনে দিয়ে চলে যান। পুরোপুরি দেখা যায় না। রবার্ট ফ্রাষ্টের একটা কবিতা আছে – যে সব দৃশ্য আমরা খুব মন লাগিয়ে দেখতে চাই সে সব দৃশ্য কখনো ভালভাবে দেখতে পারি না। সেই সব দৃশ্য অতি দ্রুত চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়।
Heaven gives its glimses only to those
Not in position to look too close.
গাড়ির বহরের মাঝখানে হাসি হাসি মুখ করে বসে থাকা প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে আমার ভাল লাগে। পুরনো দিনের কথা মনে হয়। হাতীর পিঠে করে রাজা যাচ্ছেন; সামনে পেছনে পাইক-বীরকন্দাজ। রাজার মুখে কোমল হাসি। রাজার চোখ প্রজাদের জন্যে করুণায় আর্দ্র। বিয়ে করে বির তার স্ত্রীকে নিয়ে চলে যাচ্ছেএই দৃশ্য দেখতেও ভাল লাগে। খুব ইচ্ছা করে নতুন বিয়ে হওয়া মেয়েটির মুখ আমি ভাল করে দেখি। কখনো দেখা হয় না। নতুন বউ ঘোমটা দিয়ে থাকে। মাথা নিচু করে বসে থাকে। বরের মুখ সব সময় দেখা যায়, শুধু কনেরটাই দেখা যায়।
