কোন ক্লাসে পড়ো?
এবার ম্যাট্রিক দিব।
তোমার সঙ্গে মাসুদের পরিচয় কোথায় হয়েছে? ময়মনসিংহে?
জি না। আমাদের বাড়িতে। উনি বাবার কাছে গান শুনতে আসতেন।
তুমি গান জানো?
জি না।
লীলা বলল, তুমি কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকো। রান্না হয়ে গেলেই আমি তোমাকে নিয়ে খেতে বসব।
পরী কিছু বলল না। তবে লীলার কথামতো কুণ্ডলি পাকিয়ে খাটে শুয়ে পড়ল। দেখতে দেখতে নতুন বউ ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্নে দেখল তার দাদিকে। দাদি খাট ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখ হাসি-হাসি। তিনি বললেন, তোর শ্বশুরবাড়ি দেখতে আসছি। খুশি হয়েছি। এদের বিরাট শান-শওকত। তবে মানুষজন নাই। ঘরবাড়ি জিনিসপত্র দিয়া শান-শওকত হয় না। শান-শওকত হয় মানুষজন দিয়া। তুই একলা শুয়ে আছিস। তোর জামাই কই?
পরী হাসতে হাসতে বলল, তারে তালাবদ্ধ করে রেখেছে।
কী জন্যে?
জানি না।
তালাবদ্ধ কে করছে?
আমার শ্বশুর সাহেব করেছেন।
এই লোকের দেখি স্বভাব ভালো না! সবেরে তালাবদ্ধ করে রাখে। নিজের স্ত্রীকেও শুনেছি তালাবন্ধ করে রেখেছে।
বেশিক্ষণ দাঁড়ায়ে থাকবা না দাদি। শেষে তোমারেও তালাবন্ধ করবে।
আমারে তালাবন্ধ করে করুক, তোর জামাইরে কেন করবে? যা তারে ছুটিয়ে নিয়ে আয়।
কীভাবে ছুটায়ে আনব? আমার কাছে চাবি নাই।
চাবি আমি নিয়া আসছি। এই নে।
বৃদ্ধ বড় একটা পিতলের চাবি পরীর হাতে দিলেন। পরী সেই চাবি সঙ্গে সঙ্গে শাড়ির আঁচলে বেঁধে ফেলল। তখনি তার ঘুম ভাঙল। স্বপ্নটা এত বাস্তব ছিল যে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে পরী শাড়ির আঁচল ঘুরেফিরে দেখল। রাত কত হয়েছে পরা বুঝতে পারছে না। কোনোরকম সাড়াশব্দ নেই। মনে হচ্ছে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে সঙ্গে এই বাড়িটাও বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের নিজেদের বাড়ির অবস্থা অন্যরকম। সন্ধ্যার পর থেকে লোকজন আসতে থাকে। রাত একটু বাড়ার পর ঢোলের বাড়ি পড়তে শুরু করে। মাঝরাতে শুরু হয়। গানের আসার। বন্দনা দিয়ে শুরু হয়–
পশ্চিমে বন্দনা করি সোনার মদিনা
ঝলমল ঝলমল ঝলমল ঝলমল
সোনার মদিনা…
লীলা নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে পরীকে চমকে গিয়ে বলল, ঘুম ভেঙেছে?
পরী বলল, জি।
রান্না হয়ে গেছে। তুমি ঘুমাচ্ছিলে বলে ঘুম ভাঙাই নি। এসো খেতে বসি। মাথা ধরা এখনো আছে?
না।
বাবা-মা, ভাই-বোনদের জন্য মনখারাপ লাগছে?
না।
মনখারাপ লাগছে না কেন?
জানি না।
খাওয়ার আয়োজন ভেতরের বারান্দায়। পোলাও-কোরমা, মাছভাজি–অনেক আয়োজন। পরী কিছুই খেতে পারছে না। হাত দিয়ে শুধু নাড়াচাড়া করছে। লীলা বলল, খেতে পারছ না?
পরী বলল, না। আপনি খান। আমি বসে থাকি।
লীলা কিছুক্ষণ পরীর দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, পরী, তোমার কি সন্তান হবে?
পরী বলল, হ্যাঁ।
বিয়েটা কি এইজন্যই তাড়াহুড়া করে গোপনে করে ফেলেছ?
পরী হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
লীলা বলল, কয় মাস কী, এইসব হিসাব কি তোমার আছে?
পরী বলল, হিসাব আছে। তিন মাস।
লীলা বলল, তোমরা দু’জন যে বিরাট একটা অন্যায় করেছ, এটা কি জানো?
আমি কোনো অন্যায় করি নাই। আপনি কাউকে বলেন, শুকনা মরিচের ভর্তা বানিয়ে আমাকে দিতে। মরিচভর্তা ছাড়া অন্যকিছু দিয়ে আমি ভাত খেতে পারি না।
লীলা পরীর দিকে তাকিয়ে আছে। পরী বসে আছে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। তাকিয়ে আছে লীলার দিকে। সেই দৃষ্টিতে কোনো অস্বস্তি নেই।
রাতের খাবারের পরপরই সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল। লোকমান হুক্কার নল তার হাতে ধরিয়ে দিল। তিনি ঘুমের ঘোরে। দুটা টান দিলেন। তার মনে হলো নল-হাতেই তিনি ঘুমিয়ে পড়বেন। এই লক্ষণ ভালো না। এই লক্ষণ বার্ধক্য এবং স্থবিরতার লক্ষণ। স্থবির মানুষরাই মুখভর্তি পান নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। হুঙ্কার নল হাতে ঘুমিয়ে পড়ে।
সিদ্দিকুর রহমান ঘুম তাড়াবার চেষ্টা করলেন। ঘুমটা যাচ্ছে না। আবারো যেন চেপে আসছে। জটিল কোনোকিছু নিয়ে চিন্তা করলে কিংবা কারো সঙ্গে জটিল আলোচনা করলে ঘুমটা হয়তো কাটবে। তিনি চাপা গলায় ডাকলেন, লোকমান!
লোকমান তার ইজিচেয়ারের পেছনে বসেছিল। সেখান থেকে জবাব দিল— জি চাচাজি?
মাস্টারের খবর কী?
উনি ভালো আছেন। আজ সারাদিনে জ্বর আসে নাই।
উনারে ডেকে নিয়ে আসো।
জি আচ্ছা। সিদ্দিকুর রহমান ঘুমিয়ে পড়তে চান না। এখন ঘুমিয়ে পড়া মানে রাত দুইটা-আড়াইটার দিকে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা। খাটে বসে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকা। সাপে-কাটা রোগীকে কিছুতেই ঘুমাতে দেয়া হয় না। তিনি কল্পনা করছেন চার-পাঁচ হাত লম্বা কালো একটা চন্দ্ৰবোড়া সাপ তার পায়ে ছোবল দিয়েছে। ওঝা এসে বিষ ঝাড়বে। বিষ না নামানো পর্যন্ত তাকে জেগে থাকতে হবে।
আমাকে ডেকেছেন?
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, মাস্টার, জলচৌকিটার উপর বসো।
আনিস বসল। সিদ্দিকুর রহমান হঠাৎ লক্ষ করলেন, তার ঘুম পুরোপুরি চলে গেছে। তিনি সামান্যতম আলস্যও বোধ করছেন না। তার শরীর ঝনঝন করছে।
মাস্টার, কেমন আছ?
জি ভালো।
তুমি তো আমাদের মোটামুটি ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে। ভালো কথা, তুমি গায়ে সেন্ট মেখেছ না-কি? সেন্টের গন্ধ পাচ্ছি।
আনিস লজ্জিত গলায় বলল, পাঞ্জাবির পকেটে কয়েকটা আমের মুকুল রেখেছি। আমের মুকুলের গন্ধ।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, তুমি কি একটা জিনিস লক্ষ করেছ? ফুল যতক্ষণ গাছে থাকে তখন তার একরকম গন্ধ, যেই তুমি ফুল ছিড়ে হাতে নিবে তখনি তার অন্যরকম গন্ধ।
