পরীবানু নামের ইতিহাস এই বৃদ্ধ যতদিন বেঁচেছিলেন ততদিনই বলে গেছেন। বাড়িতে ভিক্ষার জন্যে ভিনগায়ের ভিক্ষুক এলে তাকেও বলেছেন। পরীবানুকে তিনি যে আদর করেছেন তারও কোনো তুলনা নেই। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই মেয়েকে মারা তো দূরের কথা, কেউ কোনোদিন ধমকও দিতে পারবে না। যদি দেখেন কোনো কারণে এই মেয়ের চোখে পানি এসেছে, তাহলে তিনি বাড়িঘর ছেলে চলে যাবেন।
সত্যিকার ভালোবাসা দুদিকেই প্রবাহিত হয়। পরীবানুর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। তার জগৎ ছিল দাদিময়। ঘরে কোনো ভালো জিনিস রান্না হলে দাদি মুখে না দেয়া পর্যন্ত সে মুখে দেবে না। ঈদের সময় সবার আগে তার দাদির জন্যে নতুন শাড়ি কিনতে হবে।
দাদির মৃত্যুর সময় পরীবানুর বয়স ছয় বছর। সে তার দাদির মৃত্যু সহজভাবেই নিল। খুব সম্ভবত মৃত্যুবিষয়ক ধারণা তার দাদি আগেভাগে তাকে দিয়ে রেখেছিলেন। তবে তার পরিবর্তন যেটা হলো তা হচ্ছে–যখন-তখন দাদির কবরের কাছে চলে যাওয়া। কবরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে স্বাভাবিক মানুষের মতো কথা বলা—
আইজ কী ঘটনা ঘটেছে জানো দাদি? হাসির ঘটনা। ঘটনা শুনলে হাসতে হাসতে তোমার পেট-বেদনা হবে। হিহিহি…
পরীবানুর বয়স এখন পনেরো।
সে খুবই বুদ্ধিমতী একটা মেয়ে। শুধু দাদির বিষয়ে তার বুদ্ধি কাজ করে না। এখনো সে দাদির কবরের কাছে যায়। মাথা নিচু করে মৃত দাদির সঙ্গে একতরফা গল্প করে।
বউ হিসেবে বড় বাড়িতে রওনা হবার ঠিক আগে আগে সে গিয়েছে দাদির কবরের কাছে। বাঁধানো কবরের গায়ে হাত রেখে চাপা গলায় বলেছে–দাদি গো, খা বাড়িতে যাইতেছি। আর কোনোদিন এইখানে আসতে পারব বইল্যা মনে হয় না। এই পর্যন্ত বলেই সে প্রতিজ্ঞা ভুলে অনেকক্ষণ কাঁদল। দাদির সঙ্গে সে প্ৰতিজ্ঞা করেছিল যত দুঃখ-কষ্টই হোক সে কোনোদিন কান্দবে না। বেশির ভাগ প্রতিজ্ঞাই মানুষ রাখতে পারে না।
নতুন বউ স্বামীর বাড়িতে কাঁদতে কাঁদতে যায়। পরীবানু কান্দল না। পালকি থেকে নামল। যখন জলচৌকিতে উঠে দাড়াতে বলল, সে দাঁড়াল। একজন মহিলা তার পায়ে দুধ ঢেলে দিল। এই মহিলা তার শাশুড়ি। মহিলার মাথার ঠিক নেই। তাকে নাকি সবসময় ঘরে তালাবন্ধ করে রাখতে হয়। পরীবানু খুব আগ্রহ করে মহিলাকে দেখল। তাকে মোটেই অস্বাভাবিক বলে মনে হলো না। সে তার শ্বশুরকে কোথাও দেখল না। নতুন বউ শ্বশুরবাড়িতে এসে শ্বশুর-শ্বাশুড়িকে সালাম করবে। এটাই স্বাভাবিক। তবে শ্বশুরের সঙ্গে তার দেখা হবে না— এটা সে ধরেই নিয়েছিল। তার পরেও ক্ষীণ আশা ছিল— হয়তো এ– বাড়ির সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এখন মনে হচ্ছে কোনো সমস্যারই সমাধান হয় নি। সব সমস্যার সমাধান তাকে করতে হবে। কেউ কি তাকে সাহায্য করবে? লীলা নামের মেয়েটা হয়তো করবে। তবে মেয়েটা তার খুব কাছে আসছে না। দূরে দূরে থাকছে।
মাগরিবের নামাজের পর লীলার সঙ্গে তার প্রথম কথা হলো। সে বড় একটা ঘরের পালঙ্কের উপর একা বসেছিল। শ্বশুরবাড়িতে পা দেবার পর কোনো মেয়েই সন্ধ্যারাতে একা বসে থাকে না। তাকে রাজ্যের মানুষ ঘিরে থাকে। অথচ সে বসে আছে একা। একসময় যখন তার মনে হলো, তাকে এই পালঙ্কে একা বসে থাকতে হবে কেউ তার পাশে আসবে না, তখন লীলা হাতে শরবতের গ্লাস নিয়ে ঢুকল। তার পাশে বসতে বসতে বলল, এটা চিনির শরবত না, লবণের শরবত। লেবু, কাঁচামরিচ। আর লবণ দিয়ে বানানো শরবত। আমার ধারণা আজ সারাদিন তোমার উপর দিয়ে অনেক চাপ গিয়েছে। শরবতটা খাও, দেখবে ভালো লাগবে।
নতুন বউয়ের অনেক নিয়মকানুন আছে। শরবত খাও বললেই কোনো নতুন বউ হাত থেকে টান দিয়ে শরবতের গ্লাস নিয়ে ঢাকচক করে খেয়ে ফেলে না। নতুন বাউদের সাধ্যসাধনা করে খাওয়াতে হয়। পরী সহজভাবেই হাতে গ্লাস নিল। লেবুর শরবতটা খেতে তার ভালো লাগল।
লীলা বলল, তোমার কি মাথাব্যথা করছে?
পরীবানু বলল, না।
তোমাকে দেখে কিন্তু মনে হয় তোমার মাথাব্যথা।
পরীবানু বলল, হ্যাঁ, আমার মাথাব্যথা।
লীলা বলল, আমার কাছে কিছু গোপন করবে না। আমার কাছে কেউ কিছু গোপন করলে আমার ভালো লাগে না।
পরী ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল।
লীলা বলল, তোমার কি ক্ষুধা লেগেছে?
পরী সঙ্গে সঙ্গে বলল, জি।
লীলা বলল, রান্না হয়ে গেছে। আমরা দুজন একসঙ্গে খেয়ে নেব। ক্ষুধার কারণে অনেক সময় মাথা ধরে।
পরী বলল, আমি আপনার ভাইয়ের সঙ্গে দুটা কথা বলব।
মাসুদের সঙ্গে কথা বলতে চাও?
জি।
ওর সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। তুমি তো জানোই বাবা কেমন রাগী মানুষ, উনি মাসুদকে তালাবন্ধ করে রেখেছেন। বাবার রাগ কমার সময় দিতে হবে।
উনার রাগ কমবে?
নিজ থেকে কমবে না। কমাবার চেষ্টা করতে হবে। আমি চেষ্টা করব। তুমিও চেষ্টা করবে।
আমি কীভাবে চেষ্টা করব?
সেটা ভেবে ঠিক করা হবে।
লীলা পরীবানুর সঙ্গে কথা বলে অবাক হয়েছে। মেয়েটা গ্রামের মেয়েদের মতো কথা বলছে না। মোটামুটি শুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করছে। মেয়েটিকে লীলার বুদ্ধিমতী বলেও মনে হচ্ছে। মেয়েটা এই বাড়ির ব্যাপারগুলি বোঝার চেষ্টা করছে। যে-পরিস্থিতিতে মেয়েটা এসেছে সেই পরিস্থিতিতে পড়লে সব মেয়েই হাল ছেড়ে দেবে। স্রোতে গা ভাসিয়ে দেবে। কোনোকিছু বোঝার চেষ্টা করবে লীলা বলল, তুমি কি শহরে কিছুদিন ছিলে?
পরী বলল, জি। আমি ময়মনসিংহে থাকি। বিদ্যাময়ী স্কুলে পড়ি। ছুটিতে বাড়িতে আসি।
