আমি জানি, তুমি লীলাবতী।
কীভাবে জানেন?
আমি তোমারে খোয়াবে দেখেছি। খোয়াবে তোমারে যত সুন্দর দেখেছি তুমি তার চেয়েও সুন্দর। তয় গায়ের রঙ সামান্য ময়লা। মা গো, গায়ের রঙ নিয়ে মনে কষ্ট রাখবা না।
লীলা বলল, আমার কোনো কষ্ট নাই।
মহিলা বললেন, গায়ের রঙ নিয়া কষ্ট সব মেয়ের আছে, তোমারও আছে। গায়ের রঙ ঠিক করনের উপায় আছে। তুমি জানতে চাইলে বলব।
লীলা বলল, আচ্ছা কী উপায়?
মহিলা হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতে বললেন— গায়ের রঙ নিয়া তোমার যদি কষ্ট না থাকত, রঙ ঠিক করনের উপায় জানতে চাইত না।
আপনার বুদ্ধি ভালো।
পাগলের বুদ্ধি মা। পাগলের বুদ্ধির কোনো ভালো-মন্দ নাই। গায়ের রঙ ঠিক করনের উপায়টা বলব?
বলুন।
জ্যৈষ্ঠমাসে কালো জামের রস সারা শইল্যে মাখবা। সেই রস শুকাইয়া যখন শইল্যে টান দিব তখন কুসুম কুসুম গরম পানিতে গোসল করবা।
একবার করলেই হবে?
না। যতদিন কালোজাম পাওয়া যায় ততদিন করবা। ইনশাল্লাহ রঙ ফুটব।
আপনি সামনে আসুন, আড়াল থেকে কথা বলছেন আমার ভালো লাগছে না। সামনে এসে মুখের ঘোমটা সরান।
সামনে আসব না মা।
কেন আসবেন না?
আমার লজ্জা করে।
আমি আপনার মেয়ে। মেয়ের সঙ্গে কিসের লজা!
আমি পাগল-মানুষ। পাগল-মানুষ সবেরে লজ্জা করে। নিজের মেয়েরেও লজ্জা করে। তুমি তো আমার নিজের মেয়ে না।
আপনার সঙ্গে কি সবসময় আড়াল থেকে কথা বলতে হবে?
জানি না। মা গো, তুমি এই বাড়িতে কয়দিন থাকবা?
আমি বাবাকে দেখতে এসেছিলাম। দেখা হয়েছে, কাজেই কালপরশু চলে যাব।
আইচ্ছা। তোমারে আমার খুবই মনে ধরেছে। পাগল হওনের পর থাইক্যা কাউরে মনে ধরত না। এই প্ৰথম মনে ধরল। এখন যাও, নিজের মনে বেড়াও। বাড়ির পেছনে বাগান আছে, বাগান দেইখ্যা আসো।
বাগান আপনি করেছিলেন?
না। তোমার পিতার বাগান।
গ্রামের বাড়ির বাগান ঝোপেঝাড়ে ভরতি থাকে। লীলা অবাক হয়ে দেখল বাগানটা বাকবীক করছে। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগে কেউ এসে বাট দিয়ে শুকনো পাতা সরিয়েছে। সবই দেশী ফুলের গাছ। নানান জাতের জবা ফুলের গাছ। কামিনী গাছ, কাঠগোলাপের গাছ, বেলি ফুলের গাছ। বাঁশের বেড়া দেয়া অনেকখানি জায়গায় গোলাপের চাষ করা হয়েছে। গ্রামের মানুষজন শখ করে গোলাপবাগান করে না। এখানে করা হয়েছে। প্রচুর গোলাপ ফুটেছে। লীলা মুগ্ধ হয়ে গেল।
মাঝামাঝি জায়গায় বাঁধানো কুয়া। কুয়া শহর এবং শহরতলির জিনিস। গ্রামে পুকুর কাটা হয়, কুয়া কাটা হয় না। কুয়ার পাড় বাঁধানো। লীলা তার অভ্যাসমতো বলল, বাহ ভালো তো! বাগানের শেষপ্রান্তে বেদির মতো বানানো। হয়তো বসে বিশ্রাম করার জায়গা। এই জায়গাটা ঝোপঝাড়ে ভরতি। বাগান দেখাশোনার দায়িত্বে যে আছে সে নিশ্চয়ই এখানে আসে না। লীলা বেদিতে বসল। সঙ্গে এক কাপ চা থাকলে ভালো হতো। বেদিতে বসে নিরিবিলি চা খাওয়া যেত। তার সামান্য মাথা ধরেছে। যেভাবেই হোক মাথা ধরাটা দূর করতে হবে। দূর করতে না পারলে মাথার এই যন্ত্রণা একসময় খুব বাড়বে। তার নিজের জগতটা এলোমেলো করে ফেলবে। বাগানের খোলা হওয়ায় হয়তো উপকার হবে। লীলা বেদিতে পা তুলে বসল। তার শুয়ে পড়তে ইচ্ছা করছে। শুয়ে পড়লে ক্ষতি নেই, কেউ হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে না। বাড়ির পেছনের এই জায়গাটার তিন দিকেই জঙ্গল। একদিকে বাঁশঝাড়, বাকি দুদিকে আমকাঁঠালের বন। এত ঘন করে কেউ আম-কাঠালের গাছ লাগায় না। মনে হচ্ছে ইচ্ছা করেই বন তৈরি করা হয়েছে, যেন বাগানের দিকে কারো চোখ না যায়। লীলা শাড়ির আঁচল বিছিয়ে শুয়ে পড়ল।
মাথার উপরের আকাশ এখনো কালো হয়ে আছে। বড় কেটে গেছে, আকাশের মেঘ এখনো কাটে নি। শুয়ে শুয়ে মেঘলা আকাশ দেখতে ভালো লাগছে। গত রাতটা নানান ঝামেলায় কেটেছে। একফোঁটা ঘুম হয় নি। এখনো যে ঘুম পাচ্ছে তা না, ঝিমঝিম লাগছে। বেলা কত হয়েছে তাও বোঝা যাচ্ছে না। তার হাতে ঘড়ি নেই। তবে বেলা বেশি হয় নি। এ বাড়িতে সে এসে পৌছেছে। ফজরের আজানের পরপর। খুব বেশি হলে ঘণ্টাখানিক সময় পার হয়েছে। এই একঘণ্টায় অনেক কিছু ঘটে গেল। বাবার সঙ্গে প্রথম দেখা হলো। প্রথম দেখাটা কেমন হবে এ নিয়ে সে অনেককিছু ভেবেছিল। বাস্তবের সঙ্গে ভাবনা কিছুই মেলে নি। তার বাবা বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়েছিলেন। সে বাবার কাছে ঝুঁকে এসে বলেছিল, বাবা আমি লীলা, লীলাবতী। আপনার কি শরীর খারাপ? তিনি তার দিকে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টিতে বিস্ময় ছিল কি না লীলা বুঝতে পারল না। আধো-অন্ধকারে চোখের বিস্ময় ধরা পড়ে না। তবে তাঁর চোখ দিয়ে যে পানি পড়ছিল সেটা দেখা গেছে। চোখের জল অন্ধকারেও চিকচিক করে। হঠাৎ কোনোরকম কারণ ছাড়া সে বাবার জন্যে তীব্র মমতা বোধ করল। কোনোরকম কারণ ছাড়া— কথাটা ঠিক হলো না। বাবার চোখের জল একটা কারণ হতে পারে। মানুষের চোখের জল তীব্র অ্যাসিডের মতো ক্ষমতাধর। কঠিন লোহার মতো হৃদয়ও এই অ্যাসিড গলিয়ে ফেলে। লীলা অসঙ্কোচে তার বাবার বুকের উপর হাত রাখল। মানুষটা একটু কেঁপে উঠেই স্থির হয়ে গেলেন। মেয়ের উপর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বাবা-মানুষটা যেরকম হবেন বলে লীলা ভেবেছিল মানুষটা মোটেই সেরকম না। রোগা ছোটখাটো একজন মানুষ। মুখের চামড়া শক্ত। আবেগশূন্য মানুষ— যারা হাসেও না, কাদেও না— তাদের মুখের চামড়া শক্ত হয়ে যায়। তবে মানুষটার চোখ বড় বড়। আল্লাহ যেসব মানুষকে বিস্মিত হবার জন্যে পৃথিবীতে পাঠান তাদের চোখ বড় বড় করে দেন। কে জানে লীলার বাবাকে তিনি হয়তো বিস্মিত হবার জন্যে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। লীলা তার বাবার একটি ব্যাপারে খুবই অবাক হয়েছে। আবেগকে অতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। যার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে তিনি মুহুর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে সহজ গলায় লীলাকে বললেন, পরিশ্রম করে এসেছ— ভেতরের বাড়িতে যাও। হাতমুখ ধোও। যেন লীলা এ-বাড়িতে প্রায়ই আসে। তার এই আসা নতুন কিছু না।
