সিদ্দিকুর রহমান বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলেন, তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তাদের ঘিরে অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সামনে কোনো রকম মানসিক দুর্বলতা প্রকাশ করা ঠিক না। তিনি অতি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে সহজ, গলায় বললেন, পরিশ্রম করে এসেছি। ভিতরের বাড়িতে যাও, হাত-মুখ ধোও।
সব জায়গার আলাদা গন্ধ আছে
সব জায়গার আলাদা গন্ধ আছে। এই জায়গার গান্ধটা বুনো। লতাপাতার কষটা কড়া গন্ধ। তার পরেও লীলার কাছে মনে হলো, কেমন যেন আপন—আপন গন্ধ। যেন অনেক দিন আগে গভীর কোনো জঙ্গলে সে পথ হারিয়ে খুব ছোটাছুটি করেছিল। পথ হারানোর দুশ্চিন্তায় সেই গভীর বনের কিছুই লীলার মনে নেই, কিন্তু লতাপাতার গন্ধটা নাকে লেগে আছে। অনেক দিন পর আবার সেই বুনো ঘাণ পাওয়া গেল। লীলা নিজের মনেই বলল— বাহ, ভালো তো! নিজের মনে কারণে অকারণে বাহ, ভালো তো বলা লীলার অনেক দিনের অভ্যাস।
গন্ধটা কিসের কাউকে জিজ্ঞেস করলে হতো। লীলা তেমন কাউকে দেখছে। না। টিন এবং কাঠের প্রকাণ্ড বাড়িটা প্ৰায় ফাঁকা। তবে এই ফাকাও অন্যরকম ফাকা। মনে হচ্ছে। এ-বাড়ির লোকজন কাছেই কোথাও বেড়াতে গেছে। সন্ধ্যায়সন্ধ্যায় ফিরে আসবে। তখন খুব হৈচৈ শুরু হবে। বাড়ির এত বড় উঠেন। এই উঠোনে ছসাতজন শিশু কাদা মেখে ছোটাছুটি না করলে কি মানায়? কেউ পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়ে কাঁদবে, কেউ হাসবে।
সবুজ গেঞ্জি পরা প্রচণ্ড বলশালী একজন লোককে দেখা গেল গভীর কৌতূহলে আড়চোখে লীলাকে দেখছে। চোখে চোখ পড়তেই লোকটা চট করে চোখ নামিয়ে ফেলল। মেঝের দিকে তাকিয়ে খাম্বার মতো হয়ে গোল। যেন সে ভয়ঙ্কর কোনো অপরাধ করেছে। এই অপরাধের শাস্তি হলো মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকা। লীলা বলল, আপনার নাম কী? লোকটা মেঝে থেকে চোখ না। তুলে বলল, সুলেমান!
এই বাড়ির আর লোকজন কোথায়?
চাচাজি ছাড়া এইখানে আর কেউ থাকে না।
বাকিরা কোথায় থাকে?
শহরবাড়িত থাকে।
শহরে থাকে?
জি না। এইখানেই থাকে–শহরবাড়িত থাকে।
আপনার কথা বুঝতে পারছি না। শহরবাড়িত জিনিসটা কী?
সুলেমান আঙুল তুলে দেখাল। যে-জায়গাটা দেখাল সেখানে ঘন বাঁশের জঙ্গল ছাড়া কিছু নেই। সুলেমান বলতে পারল না যে— শহরবাড়ি হলো শহরের মতো বাড়ি, সে-বাড়িতে সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের ছেলেমেয়েরা থাকে। বেশি কথা বলার অভ্যাস তার নেই। চাচাজির বড় মেয়েটির সামনে কী কারণে যেন তার খুব অসহায় লাগছে।
সুলেমানের সঙ্গে কথা বলে লীলা খুব মজা পাচ্ছে। লোকটা এখন পর্যন্ত একবারও চোখ তোলে নি। মেঝের দিকেই তাকিয়ে আছে। লোকটা আঙুল তুলে শহরবাড়ি কোনদিকে দেখিয়েছে। সেই আঙুল সঙ্গে সঙ্গে নামায় নি। অনেকক্ষণ তুলে রেখেছে। লীলা বলল, আপনি মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন কেন? আমার সঙ্গে যখন কথা বলবেন আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলবেন।
জি আচ্ছা।
আমার সঙ্গে যে-মানুষটা এসেছেন। উনি সম্পর্কে আমার মামা হয়। উনি কোথায়?
জানি না।
উনাকে খুঁজে বের করুন। উনার খুব ঘনঘন চা খাবার অভ্যাস। উনাকে চা বানিয়ে দেবার ব্যবস্থা করুন। চাপাতা, চিনি, দুধ সব উনার সঙ্গে আছে। ভালো চা ছাড়া উনি খেতে পারেন না বলে এই অবস্থা। উনাকে চা বানিয়ে খাওয়াতে পারবেন না?
জি পারব।
আপনি কিন্তু এখনো একবারও আমার দিকে তাকান নি। আমি কে–সেটা জানেন তো? আমি আপনার চাচাজির মেয়ে। যেহেতু আমার বাবাকে আপনি চাচা ডাকছেন— এখন আমি সম্পর্কে হচ্ছি। আপনার বোন। বোনের দিকে চোখ তুলে তাকানো যায়।
সুলেমান এই প্রথম একটু নড়ল। চোখ তুলে এক ঝলক লীলাকে দেখেই চোখ নামিয়ে ফেলল। লীলা মনে মনে হাসল। সুলেমান নামের খাম্বা টাইপ মানুষটা যে লীলার এই কথায় অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকাবে তা লীলা জানত। যেরকম ভাবা হয়। ঘটনা সেরকম ঘটলে বেশ মজা লাগে।
এই বাড়িতে শুধু চাচাজি থাকে আর কেউ থাকে না— কথাটা মিথ্যা। কিছুক্ষণের মধ্যেই লীলা তার প্রমাণ পেল। দুটা বেণি দুলানো মেয়েকে দেখা গেল। সারাক্ষণই আড়াল থেকে তাকে দেখছে। হাত ইশারা করে কাছে ডাকলেই তারা সরে যাচ্ছে। এই মেয়ে দুটি কে? বাড়ির শেষ মাথায় একটা ঘরে একজন মহিলাকে দেখা গেল। মহিলা লীলাকে দেখে ভয় পেলেন বলে মনে হলো। মাথায় কাপড় দিয়ে ঘরের এক কোনায় সরে গেলেন। মাথায় বড় করে ঘোমটা দেয়ায় তার কপাল ঢাকা পড়েছে। চোেখও খানিকটা ঢাকা পড়েছে। তবু বোঝা যাচ্ছে তিনি খুবই কৌতূহল নিয়ে লীলাকে দেখছেন। লীলা বলল, স্লামালিকুম। মহিলা জবাব দিলেন না। মহিলাকে ভালোভাবে দেখতে হলে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকতে হবে। লীলা দরজার কাছে গিয়ে খুবই অবাক হলো। দরজার কড়ায় ভারী একটা তালা ঝুলছে। মহিলাকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। লীলা আবারো জানালার কাছে ফিরে গেল। বিস্মিত গলায় বলল, এই যে শুনুন! আপনি কি একটু সামনে আসবেন? আপনার সঙ্গে কথা বলব।
মহিলা আড়াল থেকে বললেন, আমি সামনে আসব না গো মা। আমার লজ্জা লাগে।
আপনাকে তালাবন্ধ করে রেখেছে কেন?
আমার মাথার ঠিক নাই, এই জন্যে তালাবদ্ধ কইরা রাখে। পাগল-মানুষ, কখন কী করি তার কি ঠিক আছে?
লীলা বুঝতে পারছে এই মহিলা কে। তারপরেও সে বোকার মতো বলল, আপনি কে?
আমি মাসুদের মা।
মাসুদটা কে?
মহিলা জবাব দিলেন না। আড়াল থেকেই শব্দ করে হাসলেন। ভদ্রমহিলার অনেক বয়স। কিন্তু তিনি হাসলেন ঝনঝনে কিশোরীর মতো গলায়। লীলা বলল, আমার নাম লীলা।
