আলোচনাটা থাক না বাবা।
থাকবে না। আমি শুনতে চাচ্ছি। তোর কাছে ছাগলাটা কীভাবে মহামানব হয়ে গেল।
বাবা। তুমি প্রচণ্ড রেগে গেছ। আমি তোমার রাগ আর বাড়াব না। খাওয়া শেষ কর। মটরশুটি দিয়ে কৈ মাছের ঝোল ক্লাসিক পর্যায়ের ভাল হয়েছে!
তোর ক্লাসিক কৈ মাছের আমি গুষ্ঠি কিলাই। হারুন খাওয়া ছেড়ে উঠে দাড়ালেন।
রূপা হতাশ গলায় বলল, বাবা তুমি ছেলেমানুষ না। দুই মাস আগে আমরা তোমার ষাট বছর পূর্তির উৎসব করেছি। এই বয়সে তুমি যদি রাগ করে ভাত না খাও সেটা হবে খুবই হাস্যকর।
হারুন বললেন, গোদের উপর বিষফোঁড়ার কথা আমরা বলি। তুই হচ্ছিস গোদের উপর ক্যানসার কিংবা এরচেয়েও খারাপ কিছু গোদের উপর এইডস। তুই কাল ভোরে চলে যাবি। তোর মা এবং তার মহামানব স্বামীর সঙ্গে বাস করবি। আমার মতো প্রেডিকটেবল মানুষের সঙ্গে থাকার তোর কোনো দরকার নেই। কাল ভোরে তুই অবশ্যই আমার সংসার থেকে অফ হয়ে যাবি। অবশ্যই, অবশ্যই।
রূপা বলল, তুমি যে খুব প্রেডিকটেবল মানুষ তার উদাহরণ আমি এখন দেব। কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি আমাকে বলবে, আমি খেতে বসছি, রূপা তুই আমার সামনে বোস। কেউ সামনে না বসলে আমি খেতে পারি না।
হারুন বললেন, এমন কথা আমি যদি বলি তাহলে আমি মানুষ জাতির কেউ না। আমি কুকুর প্রজাতির। ভাল জাতের কুকুরও না। দেশী নেড়ি কুত্তা।
হারুন টেবিল থেকে কফি মগ তুলে দেয়ালে ছুড়ে মারলেন। কফি মগটা রূপার ছোটবেলার এবং খুবই পছন্দের। স্কুলে ড্রেস এস ইউ লাইক টোকাই মেয়ে সেজে পেয়েছিল। টোকাই রূপার বড় বাঁধানো ছবি তাদের বাসায় ছিল। রূপার মা বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় ছবিটা সঙ্গে নিয়ে গেছেন।
হারুন মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, এখন শিক্ষা হয়েছে?
রূপা বলল, হয়েছে। আজকের ডিনার আমার জন্যে বিশেষ শিক্ষা সফর।
হারুন বললেন, এত কিছুর পরেও তুই হাসিমুখে খাওয়া-দাওয়া করতে। পারছিস?
রূপা বলল, পারছি। তোমার মেজাজ খারাপ হয়েছে। আমার তো হয় নি। ক্লাসিক কৈ মাছের ঝোলের পুরো বাটি আমি শেষ করব। তুমি রাতে কোনো সময় না কোনো সময় খেতে আসবে। তখন দেখবে কৈ মাছের বাটি খালি।
ভারভ্যারানি বন্ধ কর। ফাজিল মেয়ে।
রূপা বাবার দিকে তাকিয়ে হাসল।
হারুন দোতলায় উঠে গেলেন। মলিনা কফি মগের ভাঙা টুকরা তুলতে তুলতে বলল, খালুজান আইজ বেজায় রাগছে। অবশ্য পুরুষ মানুষের রাগ ভাল জিনিস। মেনা বিলাইয়ের মত পুরুষ কোনো কামের না। নারী চিনি লাজে, পুরুষ চিনি রাগে।
রূপা বলল, কথা কম বল মলিনা, তোমার কথার যন্ত্রণায় আমি অস্থির।
মলিনা বলল, আপনি আমার কথার যন্ত্রণায় অস্থির আর আমি অস্থির মদিনার কথার যন্ত্রণায়। এই মেয়ে রাইতে ঘুমায় না। খালি কথা কয়।
কার সাথে কথা বলে?
আমি বললে তো বিশ্বাস যাবেন না, সে কথা কয় ভূতের সাথে। এই বাড়িতে না-কি একটা ভূত আছে। ভূতটার সাথে মদিনা গফ করে। আমি তারে বলেছি, আমার লগে রাইতে থাকবা না। আফার সাথে গিয়া থাক। আফাও শুনুক তোমার ভূতের গফ। আমি একলা শুনব কোন দুঃখে।
রূপা বলল, মদিনাকে থাকতে বল আমার সঙ্গে। আমার অসুবিধা নাই।
মলিনা বলল, বুঝছেন আফা, হে ভূতের সাথে গফ করে। ভূত তো দুই একটা কথা বলবে। আমি ভূতের কথা কিছু শুনি না। মদিনা একলাই কথা কয়। মাইয়াটা পাগল। তার মাথা কামাইয়া তালুতে পাগলের তেল দিলে ভাল হয়। আমাদের অঞ্চলের বশির কবিরাজ পাগলের তেল বেচে। পঞ্চাশ টাকা বেতিল। দুই বোতল একত্রে কিনলে পঁচাশি টেকা। পনরো টাকা কমিশন।
রূপা নিজের ঘরের দিকে রওনা হল। মলিনার কথার হাত থেকে বাঁচার একটাই উপীয় সামনে থেকে সরে যাওয়া।
মদিনা বিছানা বালিশ নিয়ে রূপার সঙ্গে ঘুমুতে এসেছে। মেঝেতে বিছানা করে শুয়েছে। রূপার একবার মনে হল মেয়েটাকে বলে, মদিনা মেঝেতে শোবার দরকার নেই। এসো খাটে উঠে এসে আমার সঙ্গে শোও। আমরা দুজনই মহাশক্তিধর মানব প্রজাতির অংশ। টাকা-পয়সা নামক একটি বিষয়ের কারণে আমরা আলাদা হয়ে গেছি। টাকা-পয়সার বিষয়টা অন্য কোনো প্রজাতির মধ্যে নেই বলে তারা আলাদা হয় নি।
রূপা বলল, তোমার ভূতটার কি অবস্থা? ভূত এখনো দেখ?
দেখি। আপনের ঘরে খাড়ায়া ছিল। আমারে দেইখা চইলা গেছে।
তোমাকে ভয় পায়?
জী না, তয় হে আমার উপরে নারাজ।
নারাজ কেন?
আমি তারে দেখতে পারি এই জন্যে হে নারাজ। হে চায় না কেউ তারে দেখুক।
রূপা গায়ে চাদর টানতে টানতে বলল, তোমার মাথায় সমস্যা আছে। তোমাকে আমি একজন ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। ডাক্তার তোমার
দরজায় টোকা পড়ছে। রূপা বলল, কে?
হারুন বললেন, রূপা মা, ভাত খেতে যাচ্ছি। তুই এসে বোস। তুই না বসলে খেতে পারব না।
ক্ষুধায় অস্থির হয়েছ বাবা?
হুঁ।
রূপা বলল, তুমি টেবিলে যাও আমি আসছি।
মদিনা চাপা গলায় বলল, আফা আপনার পিতা খুবই ভালোমানুষ। আমি এমন ভালোমানুষ দেখি নাই।
হারুন আগ্রহ করে খাচ্ছেন। তার বাঁ পাশে রূপা বসেছে। সে বাবার খাওয়া দেখছে। তার মুখ হাসি হাসি। হারুন বললেন, আমি ডিসিসান নিয়েছি এখন থেকে আনপ্রেডিকটেবল সব কর্মকাণ্ড করব।
রূপা বলল, ভাল তো! এই বয়সে আমার বিয়ে করাটা হবে সবচে আনপ্রেডিকটেবল ঘটনা। বিয়ে করবে ঠিক করেছ?
হ্যাঁ। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে পাত্রী খুঁজব। তারপর ধুমধাম করে বিয়ে। আমি ঠাট্টা করছি না। আমি সিরিয়াস।
