হারুন বললেন, আমার মেয়ে ঠিকই বলে তুমি বিরক্তিকর মানুষ। প্রতিটা কথা দুবার তিনবার বল।
তোমার কথায় বিভ্রান্ত হয়ে বিরাট ভুল করেছি। বিরাট ভুল করেছি। দেখো আমার পায়ের অবস্থা হাঁটতে হাঁটতে পা ফুলে গেছে। পা ফুলে গেছে।
চুপ একটা কথা বলবে না। একটাও কথা বলবে না।
সুলতান অবাক হয়ে বললেন, এখন তো তুমিও দুবার করে বলছ।
হারুন চিৎকার করে উঠলেন, আমার সঙ্গে আসতে চাইলে আস। না আসতে চাইলে স্টেশনে ফিরে যাও।
একা একা কীভাবে ফিরব? আমি তো পথ চিনব না। পথ চিনব না।
দুজন যখন তলহীন কুয়ার পাশে উপস্থিত হলেন তখন রাত দশটা। গ্রামের সবাই খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেক ডাকাডাকির পর তলহীন কুয়ার মালিক বের হয়ে এলেন। মধ্যম বয়সের মানুষ। গালভর্তি শাদা দাড়ি। দাড়িতে মেহেদি দিয়েছেন। এখন মুখভর্তি লাল-শাদার সমারোহ।
হারুন বললেন, জনাব আপনার নাম কি?
আমি মেরাজ ফকির।
তলহীন কুয়া আপনার?
জী, এই কুয়ার আরেক নাম জিন্দা কুয়া।
সুলতান বললেন, কুয়া আবার জিন্দা মুর্দা হবে কীভাবে?
মেরাজ ফকির বললেন, সবাই জিন্দা কুয়া বলে। কেন বলে জানি না।
কুয়াটা দেখতে এসেছি।
দেখতে এসেছেন দেখেন। একশ টাকা করে হাদিয়া। কুয়ার রক্ষণাবেক্ষণ আছে।
হারুন বললেন, আমরা আপনার কুয়ার ছবি তুলব। একটা পাথর ফেলব। পাথর ফেললে শব্দ হয় না এটা যদি নিশ্চিত হই তাহলে আপনাকে দুশ টাকা দিব।
মেরাজ ফকির বললেন, কুয়া হাত দিয়া ছোঁয়া নিষেধ, ছবি ভোলা নিষেধ। কিছু ফেলাও নিষেধ। জিন্দা কুয়া, তারে ইজ্জত করতে হয়।
সুলতান বললেন, আমরা দুজন অত্যন্ত ক্ষুধার্ত। কিছু খাওয়াতে পারবেন। টাকা দিব।
আমি হোটেল খুলি নাই। নিশি রাইতে অনেক ত্যাক্ত করেছেন, এখন ফিরত যান।
ফেরার পথে হারুনের সঙ্গে সুলতানের বন্ধু-বিচ্ছেদ হয়ে গেল।
আমি যে কজন গাধা মানুষকে চিনি
আমি যে কজন গাধা মানুষকে চিনি তোর সুলতান চাচা তাদের মধ্যে এক নম্বর। গাধা শ্রেষ্ঠ।
সুলতান চাচা মোটেই গাধা মানুষ না। ভাল মানুষ, বুদ্ধিমান মানুষ। কথা রিপিট করলেই মানুষ গাধা হয় না।
চুপ করে ভাত খা। তোর জ্ঞানী কথা ভাল লাগছে না।
চুপ করেই তো খাচ্ছি। কথা তুমি শুরু করেছ। তুমি একতরফা কথা বলবে আমি চুপ করে থাকব এটা তো ফেয়ার না।
তোর সুলতান চাচাকে গাধা মানব প্রমাণ করে দেব। প্রমাণ করাব?
কর।
থাক। তোর সঙ্গে কোন কথা নেই। আমি নিঃশব্দে খাব।
নিঃশব্দে তুমি খাচ্ছ না বাবা। কড়মড় করে শসা কামড়াচ্ছ। আমার উপরের রাগ শসার উপরে ঢালছ।
হারুন মেয়েকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে বসেছেন। খাবার সময় হালকা গল্প-গুজব করতে তিনি পছন্দ করেন। রূপা বেশির ভাগ সময় আলোচনা হালকা পর্যায়ে রাখে না। কঠিন পর্যায়ে নিয়ে যায়। হারুনকে মেজাজ খারাপ করে আলোচনা শেষ করতে হয়।
রূপা বলল, বাবা। তোমার ইতিহাস কাব্য কেমন চলছে?
হারুন বললেন, তোর কথার মধ্যে ফাজলামী ভাব লক্ষ করছি। এটা আমার পছন্দ না।
রূপা বলল, তাহলে ঐ প্রসঙ্গ থাক। অন্য প্রসঙ্গ। তলাবিহীন কুয়া সম্পর্কে তো কিছুই বললে না। কুয়া পেয়েছিলে?
হুঁ।
সত্যি তলা নেই?
মস্ত বড় একটা পাথর ছুড়ে মেরেছিলাম। সেই পাথর পানিতে হিট করেছে এমন শব্দ পাই নি।
রূপা বলল, মনে হয় কুয়ায় পানি নেই।
হারুন বললেন, পানি না থাকলে মাটি তো থাকবে। মাটিতে পড়ার শব্দ হবে না?
হয়ত নিচে মাটি নেই। নরম কাদামাটি। পাথর কাদামাটিতে শব্দ না করেই দেবে গেছে।
হতে পারে।
বাবা! তুমি মেজাজ খারাপ করে খচ্ছি। বদ হজম হবে। মেজাজ ঠিক কর। আমি একটা থিওরি বের করেছি। শুনবে?
বল শুনি।
আমার ধারণা এই পৃথিবীর প্রতিটি মানব সন্তানকে কোনো না কোনো Special gift দিয়ে পাঠানো হয়। বেশির ভাগ মানুষই তাদের এই গিফট সম্পর্কে জানে না। তোমার ঘড়ি বালিকা, ঘড়ি না দেখে সময় বলতে পারে। তার মতো আমিও হয়ত কিছু পারি। তুমিও পার। যদিও এখন কোনো কারণে পারছো না।
হারুন কিছু বললেন না। রূপা বলল, বাবা তুমি কি গিফট নিয়ে এসেছ বলে তোমার ধারণা?
আমি কোন গিফট নিয়ে আসিনি।
অবশ্যই এসেছ। চিন্তা করে বল।
হারুন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, কোনো কারণ ছাড়া মানুষকে বৈরী করার ক্ষমতা নিয়ে আমি পৃথিবীতে এসেছি। এটাই আমার Special Gift. উদাহরণ হল তোর মা। আমি এমন কি করেছি যে সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল? তুই একটা কারণ দেখা সে কেন গেছে।
রূপা বলল, মানুষ হিসেবে তুমি খুবই Predictable. কোন কাজের পর তুমি কোন কাজ করবে তা আগে থেকে বলে দেয়া যায়। প্রেডিকটেবল মানুষ হল যন্ত্রের মতো। মেয়েরা যন্ত্র মানব পছন্দ করে না। মা এই জন্যেই তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে এবং ভাল করেছে।
হারুন বললেন, যার কাছে গেছে সে খুব আনপ্রেডিকটেবল? সে তো চশমা চোখে ছাগল ছাড়া কিছু না। ছাগলের সঙ্গে তার একটাই তফাৎছাগল ব্যা ব্যা করে আর সে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলে। যখন কথা বলে তখন মনে হয় জাবর কাটছে। ছাগলার ছাগলা।
রূপা বলল, বাবা তুমি উনার উপর শুধু শুধু রাগ করছ। উনি মাকে তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে যান নি। মা স্বেচ্ছায় গেছেন। রাগ করলে তুমি মার উপর রাগ করতে পার।
ঐ ছাগলাটা তোর কাছে রসগোল্লা?
রূপা বলল, খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে মানুষের তুলনা করা ঠিক না, তবে উনি মানুষ ভাল। যথেষ্টই ভাল।
ছাগলাটার ভাল কি আছে যা আমার নেই?
