একজন দীন দেবদাসীর সেবক রাতারাতি হয়ে ওঠেন দিব্যজ্ঞানী মহাত্মা মসীহ। মরুজন্ম কী বিচিত্র! দুখানি হাতে ধরবার মত আর কিছু নেই, শুধু লাগাম ছাড়া! ভাবতে ভাবতে স্বর্ণালী বৈকালিক মরুরৌদ্রে সাদা অশ্বের কাছে নেমে এসে দাঁড়ায় সাদইদ। কোলে তার শিশু। শিশুই হাত বাড়িয়ে লাগাম টেনে ধরে। কী অবাক! হা থোকা! তুমি যদি রিবিকাকে এমন করে আঁকড়ে ধরতে পারতে!
সাদইদ শিশুকে নিয়ে অশ্বে উঠে বসে। হঠাৎ আকাশে শিঙার তুরীয় তীব্র নিনাদ ভেসে ওঠে। মহারাজা হিতেনের রথ আসছে দিগন্তের পারে স্বর্ণবিস্ময় ছড়াতে ছড়াতে। ধাতু বলয়ের ঘর্ষণে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ মরুপথকে ফুলঝুরির মত বর্ণালী করেছে কল্পনা করা যায়। তার চোখের সামনে লোটার মরদেহ লটকানো হবে–বর্শাবিদ্ধ করার পর। তক্তার একটি যোগচিহ্নের কাঠামো খাড়া করা হয়েছে মরুভূমির উপর। লোটাকে গাঁথা হবে সেই দৃশ্যে। তার আগে তার বিবাহ সম্পন্ন হবে।
সাদইদ ঘোড়া নিয়ে এসে যোগচিহ্নবৎ তক্তার কাঠামোটির কাছে চুপচাপ দাঁড়ায়। সবচেয়ে নিঃস্ব বঞ্চিত ক্রীতদাসের জন্য, নারীকে পেতে চাওয়ার, ভাষা ও ধর্মের অধিকার চাওয়ার দণ্ড এখানে, বধ্যভূমির মরুচিহ্ন এটি, এখানে আমি কী করছি, ভাববার চেষ্টা করে সাদইদ। কাঠামোর দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে হাত থেমে যায়। বিবাহের পর মৃত্যুর উৎসব। ইয়াহোর ধর্ম কি জীবনের এই নিরাশ্রয় নিষ্ঠুরতার ভিতর উপ্ত হয় উদ্ভিদের মত?
মন্দির আর তাঁবুর এলাকায় এই মরুপ্রান্তরে এই প্রথম একটি বিবাহের মন্ত্র উচ্চারিত হবে। বিবাহ মাত্রই এখানে অতি কল্পনার একটি দৃশ্য। এ জিনিস কখনও হয় না। এখানে যেমন নদী নেই, তেমনি এখানে বিবাহ নেই। সমুদ্র যেমন এখানে বাতাসকে আড়াল করেছে, তেমনি আড়াল করেছে দাম্পত্য। এখানে প্রতিটি শুকনো বালুকণার মধ্যে যুদ্ধের দানা ছড়ানো, বিচ্ছেদ যেন লু। অশ্বের চমকিত দেহের কাঁপুনিতে রয়েছে যুদ্ধের আবেগ। আকাশের শূন্য হাওয়ার ভিতর ঝাঁপটা দিচ্ছে মরু-ঈগল।
তবে বিবাহ কিসের! ভাড়াটে সৈনিকের তাঁবুতে, নকল মন্দিরে, বিবাহ তো হাস্যকর! মন্দিরগুলি না হয়েছে মিশরের পাষাণ-ভাস্কর্যের সমতুল কোন বিপুল নির্মাণ, এখানে না আছে নিনিভে নগরীর ডানাঅলা বৃষের মানুষমুখো দুর্দমনীয় ঐশ্বর্যের মূর্তি কোন–এ যেন হিদ্দেকলের তীরের এঁটেল মাটির দৃঢ়তা নিয়েও দাঁড়াতে পারেনি। সবই আসলে ছায়ামাত্র–এ বসতি জীবনের নকলী প্রচ্ছায়া শুধু। সৈন্য বটে, কিন্তু সকলেই তো পলাতক দাসদাসী। কোন সম্রাট বা রাজা এদের বিশ্বাস করে না। এরা মিশরের পক্ষে ভাড়া খাটছে, যে কোন সময় অসুরদের পক্ষ অবলম্বন করতে পারে–রাজা হিতেন সাদইদকে তার বাহিনী নিয়ে যে কোন শক্তির তরফে যুদ্ধে যোগ দেবার স্বাধীনতা দিয়েছে–এ স্বাধীনতা হিতেনের খেয়ালিপনা মাত্র। আবার সন্ধিপত্র রচনাও সেই রাজারই পাগলামি। এই পাগলামি নিঃসন্দেহে ভয়ানক নিষ্ঠুর। সাদইদ যে অতি ক্ষুদ্র একজন রাজা নয়, দু পাঁচটি গ্রামের অধিকর্তা সামন্তও নয়, ভূস্বামী পুরোহিত নয়–হিতেন সে কথা সন্ধিপত্রে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
তক্তার কাঠামো ছেড়ে পাথর মেশানো মরুপথ ভাঙতে লাগল সাদইদ। আজ দেবী ইস্তারের জন্মদিন। প্রেমের দেবী ইস্তার। জমিজমার দেবী, বীজের গর্ভস্থানের দেবী, মৃত্তিকার দেবী। আজ বড় শুভদিন। মড়কের দেবী নয়, যুদ্ধের দেবতা নয়, জলের দেবতা কুমীরের জন্মদিন নয়–আজ চাষীদের উৎসবের দিনে রিবিকার বিবাহ, শুকনো মরুস্থলী আজ স্বপ্নবিষ্ট। কিন্তু আজ মৃত্যুরও দিন।
শিঙার আওয়াজ শোনা যায় বাতাসে। এ ধ্বনি-বিভ্রমও হতে পারে। সাদইদ হয়ত সবই ভুল শুনছে। সবই ভুল দেখছে। সামনে এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখা যায়। প্রতিটি দাস সৈন্য এবং দেবদাসীর হাত বা শরীর থেকে পাথর ঘষে ঘষে দাসমালিক এবং সম্রাটদের এঁকে দেওয়া উল্কি মুছে ফেলা হচ্ছে, শরীরে রক্তপাত হয়ে যাচ্ছে তবু এই দৃশ্য থামছে না। রক্তপাতের পর ভেষজ দাওয়াই লাগানো হচ্ছে। এই উল্কি মুছে ফেলার অপরাধের দণ্ড হল আঙুল কর্তন।
এক ধরনের অম্নরস উল্কিস্থানে লেপন করে তীক্ষ্ণ পাথর বা ছুরির সাহায্যে চামড়া চেঁছে তোলা হচ্ছে দাসমালিকের ছাপ, নাম-ঠিকানা। মানুষ চিৎকার করে উঠছে যন্ত্রণায় আর আনন্দে। কিশোর-কিশোরীর চোখে জল টুপিয়ে পড়ছে। এ কোন আশ্চর্য ছবি! সৈনিকদের অনেকেই ছিল কৃষক, দাসমালিক তাদের পায়ে দলেছে, বেগার খাঁটিয়েছে, বাধ্যতামূলক কাজে নিয়োগ করেছে–তার নিজের জমি ফেলে কৃষক তার মালিকের জল তোলার কপিকল চালিয়েছে ভোররাত্রি থেকে মধ্যরাত অবধি। তার দেহ ধনুকের মত বেঁকে গেছে। তার জমির গম পুড়ে গেছে মরু লু-তে, গমের শিষ বালির স্তরে ছোপ ধরে শুকিয়ে গেছে, তার সেচের নালা বুজে গেছে ধূলায়, তার কুটিরখানি উড়ে গেছে ঝড়ে, নলখাগড়ার চালা উধাও। একদিন সে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে এসেছে গৃহে, রাজার আমলারা তার বউ আর বাচ্চাদের ফিনিসীয় জাহাজে তুলে দিয়েছে, ফিনিসীয় ধূর্ত বণিকদের দাসব্যবসা কখনও বন্ধ হয়নি–জাহাজ ভেসে গেছে কোথায় কেউ জানে না। যে ফিনিসীয়রা বাইশটি বর্ণ আবিষ্কার করে বর্ণমালা প্রস্তুত করেছে, ভাষাকে করেছে উন্নত, তাদের মূল ব্যবসাই ছিল দাসদাসী কেনাবেচা।
