সাদইদ বুঝে পায় না একটা সভ্য জাত কী নিষ্ঠুর হয়! বউ হারিয়ে, সন্তান হারিয়ে সেই কৃষক তবু বাঁচতে পারেনি। তার হাতে উল্কি আঁকা–চাষী বর্ণমালা বোঝে না। দাসমালিকের বাইশী ভাষা আয়ত্ত তিনি উল্কির নকশায় তাঁর নাম ঠিকানা লিখে ছেড়ে দিয়েছেন–মানুষ পালাবে কোথায়! সেই সব-হারানো কৃষক ধরা পড়ে গেছে অতঃপর–আত্মগোপন করেও থাকতে পারেনি। দাসমালিক আর ফেরাউনের চোখের আড়ালে। ফেরাউনের চোখ পিরামিডের মত আকাশ থেকে দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয়। ধরা পড়ার পর সেই কৃষক হয়েছে চিরস্থায়ী সৈনিক। তারপর শেষবারের মত পালিয়ে এসেছে হেথায় মরুমর্তে! সাদইদ কখনও জোর করে তাদের দেহের উল্কি মুছে ফেলার নির্দেশ দিতে পারেনি। অথচ ইহুদ নিজে হাতে সেই উন্নত ভাষার ছাপ মুছে দিচ্ছেন। চাষীর মনের উপর চলেছে অতীতের স্মৃতির প্রহার। তার বউকে, সন্তানকে মনে পড়ছে।
চাষী কেঁদে উঠছে আনন্দে। ভয় করছে, আনন্দ হচ্ছে। তার দীর্ণ কান্নায় আর উল্লাসে মথিত হচ্ছে অপরাহু। একদিকে বাঁটা মেহেদিপাত্র মুঠোয় চেপে ধরে বসে আছে সজ্জিত রিবিকা, চোখে সুর্মা, গলায় ঝুলছে বনকুসুমের মালা, বাহুতে জড়ানো পুষ্পবন্ধ, পরনে জড়ানো মেসোপটেমিয়ার রেশমী বসন, সূক্ষ্ম বস্ত্রের আড়ালে তার দেহাবয়ব স্পষ্ট রাঙা। বসনের তলায় কোন পরিধান নেই। তার হাতের উল্কি আগেই তোলা হয়েছে।
সাদইদ ঘোড়া নিয়ে এসে অনেকখানি তফাতে একটি ছায়ানিবিড় বৃক্ষের তলে দাঁড়াল। কেউ তাকে একবার ভাল করে চেয়েও দেখল না। এই প্রথম সাদইদ অদ্ভুতভাবে অনুভব করল, সে এই জনমণ্ডলীর সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন। এরা তার উপস্থিতির কোন পরোয়া করে না। যেন এরা তাকে কখনও দেখেওনি। সে বড়জোর একজন বহিরাগত পলাতক সৈনিক। তার দিকে কেউ কেউ পরম করুণার চোখে চাইল।
একজন সৈনিক সকৌতুকে বলে উঠল–এসো মুছে নাও! রাজার ছাপটা গা থেকে ছাড়িয়ে ফেলে স্বাধীন হও বাছা! রক্ত কিছুটা ঝরবে বটে, কিন্তু হৃদয়ে তাম পাবে। মরুভূমিতে কতকাল ঘুরে মরছ–একটু আহ্লাদ, একটু মুক্তির কথা ভাবো। কী হে, শুনতে খুব মন্দ লাগে বুঝি?
এক বুড়ি বলল–বাছার কী আর সাধ আহ্লাদ আছে! মহাত্মা পয়গম্বর যে কনের বাবা, তা জানলে কী আর লোটার দোস্ত নিবিকের সাথে ফস্টিনস্টি করে–সেই শরমে দেইড়েই আছে, ঘোড়াটি তেনার বিবশ হয়েছেন গো!
এই কথায় গায়ে টোনা মেরে গালের টোল নাচিয়ে হি হি করে হেসে উঠল দঙ্গলবাঁধা দেবদাসীরা। মরুমর্তে এ এক বিষম মর্মান্তিক দৃশ্য–আহ্বাদে দিশেহারা, দুঃস্বপ্নেভরা এ ছবি, তবু কান্নায় বিষণ্ণ, রক্তপাতে, রঙে উচ্চকিত মধুর। সেই মাধুর্যে কাঁপছে হৃদয়, রাঙা ঠোঁট, ফের মৃত্যুর গন্ধে বাতাস উতলা।
ইয়াহোর ধর্মের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে ইস্তারের জন্মদিনে। এই মরু তার ক্রোড়, তার গর্ভস্থান, ইহুদের দণ্ডখানি তার নির্ভরতা। দণ্ডখানি নেড়ে নেড়ে সকলের সঙ্গে কত কথা বলে চলেছেন ইহুদ। সাদইদের ইচ্ছে হল, সে ভয়ানক আর্তনাদ করে ওঠে।
কিন্তু কী বলে সে আর্তনাদ করবে? কী হবে তার মুখের ভাষা? এখানে যে তার কেউ নেই। কে শুনবে তার কথা! সাদইদ বিড় বিড় করে উঠল–এ ভারী অন্যায় মহাত্মা ইহুদ! বিয়ের নামে, মুক্তির নামে এ আপনি কী করছেন! এই মানুষেরা সকলে লোকটাকে ঘৃণা করত! কোন দেবদাসী ওকে আশ্রয় দেয়নি। তার মৃত্যুর দিনে কিসের আয়োজন করেছেন আপনি! রিবিকাকে এভাবে কাঁদিয়ে তার ভাগ্যকে পরিহাস করছেন কেন? ওগো, তোমরা থামো!
সাদইদের স্বর ফুটল না। চোখ বহে গণ্ডদেশ প্লাবিত করে সাদইদের অশু গড়াতে চাইছিল, সাদইদ জানে এই মরু-বাতাসে সেই অশ্রু গড়িয়ে পড়ে না, চোখের পাতার আড়ালে কেবল চিক চিক করে সূর্যবিম্বিত বালুকণার মত তীব্র।
অথচ ইয়াহোর ধর্ম এক অবিনাশী উদ্ভিদ! ইয়াহো বলেন–হোক! শুধু হউক’ বলাই যথেষ্ট, সৃষ্টি পুরাণে মরুমর্তে, জীবকুলে এক অমৃত মন্থন শুরু হয়।
মহাত্মা ইহুদ বললেন–আমার কন্যার হৃদয়ের বেদনা জয়ী হোক।
কথাটা শুনে সাদইদ কেঁপে উঠল। সে সহসাই চিৎকার করে উঠল–লোটা! এ হতে পারে না লোটা! তোমার কালো ঘোড়া কোথায়? নিনিভের পতন হয়েছে, এসো আমরা যাত্রা করি। থেকো না, ওভাবে পড়ে থেকো না দোস্ত!
এই মুহূর্তে সাদইদের সাদা অশ্ব এক বেগার্ধ স্বরে হেষাধ্বনি করে ওঠে আকাশে মুখ তুলে। সাদইদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যায়–এ মিথ্যা! এ অন্যায় লোটা! যুদ্ধ তোমার নিয়তি, তুমি উঠে এসো!
লোটার দুই চোখ তন্ময় ছিল। সে চেয়ে ছিল তার কনেটির দিকে। সাদইদের মুখে ‘লোটা’ নাম উচ্চারণ শুনে একবার চকিতে চোখ তুলে সাদইদকে দেখে স্মিত হাস্য করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। অশ্বের হেষাধ্বনিতে রিবিকার মুষ্টিবদ্ধ দু’ হাত শিথিল হয়ে খুলে গেল। তৃষ্ণাকুল দুটি চোখ তার, সুর্মার নদীতে ছল ছল করতে লাগল। সে সাদইদের দিকে নয়ন মেলে চাইতে পারল না। তার সাধ হচ্ছিল সে একবার শিশুকে দেখে।
মহাত্মা ইহুদ বললেন–আমার কন্যার হৃদয়ের বেদনা তোমার পাহাড়ের চেয়ে উচ্চ সাদ। পিরামিডের চেয়ে মহৎ। রাজার আইন টলে পড়ে, কিন্তু মেষশিশুর চেয়ে পবিত্র হৃদয় কর্তব্যে বিচলিত হয় না।
রিবিকার বিবাহ ইয়াহোর নির্দেশ মাত্র। বঞ্চিত লোটার জন্য ঈশ্বরের একমাত্র উপহার। সাদ, তুমি পাগল হয়ে গেছ!
