গম্ভীর সুরে ইহুদ বললেন–যার শিশু তাকে ফেরত দাও রিবিকা!
–এ শিশু যে আমার বাবা! একে ফেরত দিতে বলো না!
হাহাকার করে উঠল রিবিকা!
সাদই অত্যন্ত ধরা গলায় ঢোক গিলে বলল–আমি এই শিশু আর নারীকে লুঠ করিনি মহাত্মা ইহুদ! আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। আপনিই তাদের ছিনিয়ে নিচ্ছেন!
অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন ইহুদ। তাঁর শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। বললেন–আমার ধর্ম কখনও ছিনিয়ে নেয় না সাদ। সে-ধর্ম দেয়। রিবিকা আমার কন্যা! ওই শিশু তোমারই রইল। দাও মা, দিয়ে দাও! দেরি করো না। সকলে তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে! তুমি লোটার মৃত্যুর কথা ঘোষণা করবে। লোটা শুনবে।
ঘোড়ার পিঠে তখনও খেলা করে চলেছে লোটা। সেদিকে একবার চেয়ে দেখে আর্তনাদ করে উঠল রিবিকা-বাবা তুমি আমায় এমন নির্দেশ দিচ্ছ কেন! আমি কী অন্যায় করেছি!
–এ নির্দেশ আমার নয় রিবিকা। হিতেনের নির্দেশ। রাজার হুকুম!
–আমি পারব না! এ আমি পারব না কিছুতে।
–পারতেই হবে মা! ধৈর্য ধরো। মন শক্ত করো!
ছেলেকে বুকে করে কাঁপতে কাঁপতে রিবিকা মেঝেয় বসে পড়ে, সাদইদের ঠিক পায়ের তলায়। ভয়ে সাদইদ পা টেনে নেয়।
–আমার তো আর কোনওই আশ্রয় রইল না সাদইদ!–সরে যাওয়া সাদইদের পায়ের দিকে চেয়ে বলে উঠল রিবিকা। সাদইদ অনড় পাষাণের মত স্থির।
এই প্রথম সাদইদের নাম ধরে ডাকল রিবিকা। বুকের ভিতরটা সাদইদের কেঁপে উঠল।
–বাদশার বাদশা ইয়াহহ, তিনিই তোমার আশ্রয় রিবিকা। সমস্ত দেবদাসী, তামাম ক্রীতদাস, সকল সৈন্য তাঁরই বান্দা। ফেরাউনের আইন, হিতেনের আইন, অসুরদের আইনের চেয়ে বড় তাঁর আইন । তিনি যা জানেন, আমরা কেউ তা জানি না। নইলে লোটার ভাষা একমাত্র তুমিই কেন জানবে। এ ঘটনা তিনিই ঘটিয়েছেন। তাঁর অভিপ্রায় বোঝা আমার কর্তব্য! লোটার মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞার কথা তুমিই তাকে বলবে।
–পারব না! কিছুতেই পারব না! সাদইদ তুমি আমায় বিষ দাও সারগন! এই শিশুকে তুমি হত্যা কর!
–আজ তোমার বিবাহ রিবিকা!
মহাত্মা ইহুদ যেন আকাশ থেকে বলে উঠলেন। রিবিকার কান্না মুহূর্তে জমাটবদ্ধ পর্বততুষারে আবৃত হল। পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা একটি শীর্ণ দীর্ঘ গাছে এসে বসল একটি ভয়ানক কালো মরু-ঈগল। তার ভারে নুয়ে পড়ল বৃক্ষের একটি ডাল। ঈগলের পাখার ঝাঁপটে কেঁপে উঠল মরু-প্রান্তর!!
মহাত্মা ইহুদ বললেন–লোটার মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা ঘোষণা করা নিশ্চয়ই খুব কষ্টের রিবিকা। তার মত সৈনিক শত অশ্বের চেয়ে, শিক্ষিত ঘোড়ার চেয়ে দামী। অথচ ইয়াহো সেই নিষ্ঠুর কাজের জন্য তোমাকেই নির্বাচন করেছেন। কিন্তু সেই নিষ্ঠুরতা সহনীয় করার জন্য সেই লোটাকেই তোমাকে বিবাহ করতে হবে। বিয়ের পর তুমি লোটাকে মৃত্যুর কথা বলবে! সমস্ত শিবির দেখবে নগর নির্মাতা মানুষ, যুদ্ধবাজ রাজারা কীভাবে এই সংসারকে মারছেন। মৃত্যু তো ক্রীতদাসের মুক্তি রিবিকা–তুমি সেই মৃত্যুকে বরণ করো মা গো!
মহাত্মা ইহুদের কণ্ঠস্বর ভাবাবেগে বুজে এল। দাড়ি গোঁফে আচ্ছন্ন মুখে চোখ দুটি সিক্ত হয়ে উঠল।
সাদইদ বলল–তোমার চোখের জল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার রিবিকা! এই শিশু আমার সম্পদ। দাও আমাকে! কখনও ধর্ম বুঝিনি। যে ঈশ্বরকে কখনও দেখিনি, তার অস্তিত্ব কেমন তাও জানি না–তবে কুড়িয়ে পাওয়া আমার ভালবাসার আজ সম্মতি হবে এই আনন্দ একজন সৈনিকের পক্ষে যথেষ্ট রিবিকা। তুমি সম্মত হও। লোটা মৃত্যুর আগে যদি একথা বিশ্বাস করে মরে যে সে পেয়েছিল। সেই শক্তির জোরেই আমি বেঁচে থাকব।
–এই সৌভাগ্য ইয়াহোর দান। তোমার এবং লোটার! যে ঈশ্বরকে তুমি চেনো না, সব তাঁরই অভিপ্রায় মাত্র। চলো রিবিকা।
বলে উঠলেন ইহুদ! রিবিকা তার শিশুকে সাদইদের কোলে অর্পণ করে বলল–আজ আমি দেবতা সূর্যের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হচ্ছি, দেবদাসী হবে কনে! তুমি যাকে আমনের বউ বলে ডাকতে, তার আজ মৃত্যু হল সারগন! দেবদাসীর ভাগ্যকে নিশ্চয়ই তুমি ঈর্ষা করছ! কুড়িয়ে পেয়েছিলে তো তাই এত সহজে ফেলে দিতে পারলে! তোমার লুঠ করা হাত দু’খানি এত দুর্বল সাদইদ!
কালো ঈগল পাখা ঝাঁপটে উঠল। তার পাখায় মরুভূমির শুকনো বালি, পায়ের নখে ধরা ধ্বস্ত নগরী নিনিভের রক্তাক্ত ইঁদুর! রিবিকা দ্রুত পাহাড় ছেড়ে মরুভূমিতে নেমে গেল। মরুকণ্ঠ তৃষ্ণার্ত ঈগল চিৎকার করল।
মরুভূমিতে একা ঘুরে ফেরাই কি তবে নিয়তি। ভিস্তির কোলে যে মানুষ হয়েছে, যার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে যাকে মা ত্যাগ করে চলে গেছেন অমরাবতী–যে শিশু পিচ আঁটা ঝুড়িতে ভেসেছে কুফর দ্বীপের কোলে, যে দ্বীপ তলিয়ে গেছে সমুদ্রে, জিব্রিল ছাড়া যার জন্য কেউ অশ্রুপাত করেনি, তার নিয়তি কি আকাশের মত নিঃসঙ্গ? শুভ্র শ্বেত, উল্লসিত অগ্নিশিখার মত প্রখর অশ্বের দিকে চেয়ে ছিল সাদইদ।
আপন হাত দুখানির দিকে চেয়ে ছিল সে। দুমুঠো বালুর মত এ জীবন–যতই আঁকড়ে ধরা যাক, ঝরে পড়ে। এ তো কোন মৃত্তিকা নয়। দেশ নয়। তবু ভাল যে,মহাত্মা ইহুদের আশ্রয়েই চলে গেল রিবিকা। লোটার সঙ্গে তার বিবাহ–এ যে সত্যিই ঘটতে চলেছে ভাবলে চোখের পলক পড়তে চায় না। যাকে সাদইদ ছাড়তে পারছিল না, আপনিই সে চলে গেল ইয়াহোর ইশারায়। মরুমর্তের সেই ঈশ্বর কী মারাত্মক কুশলী! কখন দেয় আর কখন নেয়, সামান্য মানুষ বুঝতেই পারে না।
