সাদইদ আর স্থির থাকতে না পেরে বলল–মানুষকে প্রাণে বাঁচানো যদি পাপ হয় তাহলে সে পাপ আমি করেছি! আপনি রিবিকাকে হায়নার মুখে ফেলে রেখে গেছিলেন।
ইহুদ বললেন-তোমার সৈন্য আমাদের আক্রমণ করে। হায়নার চেয়ে তোমার লোভ অনেক কদর্য। আমার হাতে লাঠি দেখেও তোমার সেপাই আমাকে রেয়াত করেনি। তুমি তোমার চোখের সামনে আমাকে দেখেছ কখনও মনে করনি এ অন্যায়!
–আমায় ক্ষমা করুন!
সাদইদের গলা কেঁপে উঠল।
–ইয়াহোর কাছে ক্ষমা চাও সাদইদ! রুহার মৃত্যুর কৈফিয়ত তোমায় দিতে হবে। বন্ধু লোটা তোমার নারী-সৌভাগ্যে পীড়িত হয়ে ঘরের বশে রুহাকে বলাৎকারের চেষ্টা করে। অথচ লোটাকেই তুমি মৃত্যুদণ্ড দিলে! ইয়াহোর বিচার অনেক সূক্ষ্ম সাদইদ! তুমি শাস্তি পাবে!
মাথা নিচু করে ইহুদের কথা শুনতে শুনতে সাদইদ বলল–আজ পর্যন্ত রাজা হিতেনের সঙ্গে আমার কোন সন্ধিপত্রই ছিল না মহাত্মা ইহুদ! একজন সামান্য সৈনিক, ভাড়াটে সৈনিকের সঙ্গে কোন রাজা কখনওই সন্ধিপত্রের চুক্তি করেন না। অতি সম্প্রতি সেই সন্ধিপত্র হয়েছে! কালই আমি সেটা হাতে পেয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, লোটা সম্পর্কে আমার কখনও কোন অভিসন্ধি ছিল না। এই সন্ধিপত্রও রাজার কাছে আমি প্রার্থনা করিনি।
ইহুদ বললেন–তুমি কী করেছ না করেছ সে সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। এখানকার কারুরই নেই, সেকথা তোমার জানা দরকার। সমস্ত রাত্রি আমরা আলোচনা করেছি। তোমার সন্ধিপত্রের নকল মাটির ফলক আমরা উপড়ে ফেলেছি। তুমি জেনে রাখো, তুমি হিতেনের দাসত্ব করতে পারো, আমরা নই। আমরা নেই তোমার সঙ্গে!
–আমি জানি। হঠাৎ এই সন্ধিপত্র করে রাজা আমাকে দুর্বল করতেই চেয়েছেন।
–সে বুদ্ধি তোমার আছে?
–আমায় এভাবে বলবেন না মহাত্মা ইহুদ!
–আমি মহাত্মা নই সাদইদ। তাই যদি হতাম, তাহলে এত হীন পেশায় নিয়োগ করে তুমি আমায় অপমান করতে না। তবে এই লাঠির কোন ক্ষমতা
আছে কি নেই তুমি এবার প্রমাণ পাবে। লোটাকে মারবার জন্যই চালবাজ রাজা এই সন্ধিফলক সোনায় মুড়িয়ে তোমার হাতে তুলে দিয়েছে! যাতে সারা জীবন তুমি এই মরুভূমিতে ঘুরে মরো! তবে তুমি যা খুশি করতে পারো–আমার কিছু এসে যায় না। মধুদুগ্ধের দেশে আমার পোঁছনো দরকার।
–আপনার স্বপ্ন সফল হোক মহাত্মা ইহুদ!
–তুমি আমাকে ব্যঙ্গ করছ?
ইহুদের এই আকস্মিক আঘাতে সাদইদ বিমূঢ় হয়ে যায় এক মুহূর্ত! সে অতিকষ্টে চোখ তুলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিবিকার মুখের দিকে চায়। এই সেই নারী, যাকে সে নগ্নাবস্থায় বস্ত্র দান করেছিল, ক্ষুধা তৃষ্ণা কাতর মুমূর্ষ দেবদাসী, যাকে সে মধু রুটি আর তৃষ্ণার জল দিয়েছিল–যাকে সে মন্দিরে ঠেলে দিতে পারেনি, যার সীমাহীন রূপ তাকে মুগ্ধ করেছে, লোভী করে তুলেছে, সেই নারী ভেবেছিল সাদইদ বুঝি রাক্রান্ত পুরুষ, তার কাছে সে জানতে চেয়েছিল তার ভবিষ্যৎ! কী পরিহাস জীবনের ওই শিশু অবধি আজ বুঝে ফেলেছে সাদইদ তার নিজেরই ভবিষ্যৎ জানে না।
সাদইদ বলল–একটা সামান্য শিশুকে ব্যঙ্গ করার সাহসও আমার নেই!
বলেই সাদইদ রিবিকার ম্লান চোখ থেকে চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করল।
ইহুদ বললেন–তোমার সাহস যথেষ্টই আছে। লোকে তোমায় সারগন বলে ডাকে। আমি স্বপ্নদ্রষ্টা, আমার হাতে মসীহের ‘আঁসা’–এই জাদুদণ্ড! এই মহাবিদ্যার নামে শপথ করে বলছি, তুমি ব্যর্থ হবে! আমি স্বপ্ন দেখেছি, নিনিভের পতন হয়েছে! মারী আর মড়কে ফতুর হয়ে গেছে নগরী! ক্রমাগত এই স্বপ্ন! ক্রমাগত!
বলতে বলতে ইহুদের দুই চোখ কেমন ঘোর হয়ে আসে! যেন তিনি মুহূর্তে স্বপ্নবিষ্ট হয়ে পড়লেন। অনেকক্ষণ নিঃশব্দে স্থির রইল জুম পাহাড়।
হঠাৎ মন্দ্রস্বর ভেসে উঠল–তুমি ঈশ্বরের ভাষার উপর খোদকারী করেছ সাদ। এই এক পাপ। ক্ষমা নেই।
–নতুবা মানুষ কীভাবে কথা বলত! একটা ভাষা তো লাগে! এইভাবে মানুষ মিলিত হয়!
–এই চেষ্টা হাস্যকর কোমলমতি সাদ। পৃথিবীতে ধর্ম ছাড়া ঐক্য হয় না। তোমার সাহসকে বলিহারি যে, তুমি নিজের মূর্খতা বুঝতে পারো না। ঈশ্বর ভাষার সাহায্যে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করেন। ধর্মের সাহায্যে একত্রিত করেন। মসীহের ধর্মে একথার বারংবার উল্লেখ আছে। তুমি ভাষার চর্চা করলে অথচ লোটার মুখে ভাষা যোগাতে পারলে না। কবিতা গেয়ে ধর্মের শক্তিকে খর্ব করা যায় না। ইয়াহহ! ইয়াহো! তাঁর ইচ্ছেয় সব হয়।
মাদইদ নরম সুরে বলল–ক্ষমা করবেন মহাত্মা ইহুদ! আপনার আদর্শের জয় হোক। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা আলাদা। অত্যন্ত অল্প সময়ের জন্য হলেও মানুষ যে একটি ভাষার তলে মিলিত হয়েছিল সেই ইতিহাস ধর্ম এসে মুছে দেবে কিন্তু এই সত্য।
–এ সত্য নয় সাদইদ! লোটাই তার প্রমাণ!
–সে তো ধর্মও ছাড়েনি।
–ছাড়বে। আমি যা পারি তুমি তা পারো না। তোমার ভিতর ঈশ্বরের কোন প্রত্যাদেশ নেই। তুমি অভিজ্ঞতাবাদী। আমি প্রত্যাদেশবাদী, ধার্মিক! আমি জড়ো করি, তুমি জড়ো করার মন্ত্র কখনও পাবে না। চলো মা রিবিকা–আমরা উঠি!
–কোথায় যাব বাবা!
–ইয়াহো যেখানে নিয়ে যেতে চাইছেন! যে লোক লুঠ করে, সে কখনও গুছিয়ে তুলতে পারে না। এখানে থেকো না! সাদইদ এবার একা নিনিভে লুঠ করতে যাবে। একা। একদম একা।…
বলেই ইহুদ হা হা করে হেসে উঠলেন। রিবিকা অত্যন্ত করুণ চোখে সাদইদের দিকে চাইল। শিশুকে গভীরভাবে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরল।
