–না। এ হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না!
বিপন্ন আর্তস্বর রিবিকার কণ্ঠে দলিত হয়ে ওঠে। তার কেবলই মনে হতে লাগল, এই ভোর কেন এল? এই জীবন কেন সে পেয়েছিল! গত রাত্রির মত একটি বিপুল বিস্ময়কর অপার সুখের রাত কেন তার মত হতভাগ্য দেবদাসীর জীবনে আসে! কেন তার হৃদয়কে দুটি নির্মল প্রজাপতি অধিকার করেছিল। শববাহক লোটা কেন এই মরুমর্তে জন্মলাভ করে! রাজাই যদি দেবতা, রাজাই যদি ঈশ্বর, তবে মহাত্মা ইহুদ কেন তাদের মুক্তির কথা বলেছিলেন?–হায় যবহ, হায় ইয়াহো!
–অসম্ভব! এ হতে পারে না। কিছুতেই নয়। আমি যাব না সারগন! ছেড়ে দাও। তুমি যুদ্ধ ছেড়ে দাও! এতটুকু জায়গা কি কোথাও নেই?
কামনাদীর্ণ স্বর উচ্চকিত নিনাদে ফেটে পড়ে পাহাড়ের অভ্যন্তর-সীমায়। যখন দিনের প্রথম সূর্যালোক মরুভূমির বালুকা স্পর্শ করল, লোটার কালো ঘোড়া লাফিয়ে উঠল, লোটা তার পিঠে চড়েছে–একা ভোরে অশ্বারোহণ লোটার এক ধরনের নিঃসঙ্গ খেলা। অশ্ব মাঝে মাঝেই তাকে পিঠ থেকে ফেলে দেয়। ইচ্ছে করেই হুমড়ি খেয়ে বালুতে আচমকা লুটায়। অশ্ব জানে না, এইই লোটার শেষ ঘোড়ায় চড়া। ঘোড়াটি থাকবে। লোটা থাকবে না। একথা অশ্ব যেমন জানে না, নোটাও জানে না।
মরুস্থলীর সকলে জেনেছে যেকথা–ভাষার অভাবে লোটা তা জানতে পারেনি। সে আহ্লাদে নিশ্চিন্তে আপন মনে খেলা করে চলেছে। তার বিশ্বাস। অগাধ। সাদইদ থাকতে তার কোনওই ভয় নেই। মৃত্যুও তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। সাদইদ লোটার চাউনি, চলাফেরা, যুদ্ধযাত্রার প্রতি মুহূর্তে একথা অনুভব করেছে।
লোটার আহ্লাদিত অশ্বক্রীড়া দেখতে দেখতে সাদইদের বুক অসম্ভব বিষাদে। পূর্ণ হয়ে যেতে লাগল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিস্তব্ধ রিবিকার চোখ ছলছল করে উঠল। মনে পড়ল, কালই বেচারি তার কাছে অদ্ভুত প্রস্তাব করেছিল। একবার অন্তত সারগন বলে ডাকার জন্য আকুল প্রার্থনা জানিয়েছিল। ডাকলে কী ক্ষতি ছিল!
মহাত্মা ইহুদ পাহাড়ের দিকে এই ভোরবেলা পায়ে পায়ে হেঁটে আসছেন। অদ্ভুত দৃপ্ত তাঁর ছুটে আসার ভঙ্গি। মসীহরা যেমন লম্বা পা ফেলে হাঁটেন। তাঁকে দেখে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে সহসা স্খলিত লোটা কপালে হাত ঠেকিয়ে সহাস্য অভিবাদন জানাল। সলজ্জ ভঙ্গিতে গা ঝাড়তে লাগল। ইহুদ ইশারায় লোটার অভিবাদন গ্রহণ করলেন। তারপর একদণ্ড সময় নষ্ট না করে সাদইদের সামনে এসে বিনা ভূমিকায় বললেন–লোটা জানে না আজ তার মৃত্যুর দিন। তাকে এ কথা শোনানোর দায়িত্ব কে নেবে? তুমি তার মৃত্যু-সংবাদ বহে এনেছ।
–হ্যাঁ এনেছি।
-সেকথা বলার জন্য কাউকে নির্দেশ দাওনি? তোমার সন্ধিপত্র মাটির ফলকে উৎকীর্ণ করে দেবমন্দিরের সামনে স্থাপন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না হিতেনের পোলা!
এরকম দৃপ্ত বাঁকা কথায় কী আশ্চর্য আজ সাদইদের মেরুদণ্ড কেঁপে উঠল। হঠাৎই ইহুদ নামের সামান্য সেবক লোকটি, দেবদাসীর অনুগত অত্যন্ত নিম্ন পেশার মানুষটি যেন রাতারাতি বদলে গিয়েছেন। সাদইদ ইহুদকে চিনতে পারছিল না।
–রাজার আইন আমি মানতে বাধ্য ইহুদ!
–কিন্তু আমি ঈশ্বরের আইন ছাড়া কোন আইন মানতে বাধ্য নই সাদইদ! একথাটা তোমাকে বলার আজ বিশেষ প্রয়োজন। রাজার রথকেও আমি ডরাই না। জানি রথ আসবে। কিন্তু লোটার মৃত্যুই কি অনিবার্য। তুমি তাকে ভাষা দিতে পারোনি, ধর্ম দিতে পারোনি–এমনকি একটি নারীও তোমার ছিল না! অথচ সে তোমার জন্য প্রাণ বিপন্ন করেছে কতবার! সেই প্রাণটাই আজ তুমি। কেড়ে নিতে চলেছ! এই যদি তোমার আইন–তবে সেই আইন আমি মানি না। কেউ মানে না।
–এ আমার আইন নয় ইহুদ। রাজার আইন!
–তুমি তার পুত্র!
–না। আমার পিতা একজন ভিস্তি। আমার জন্মের ইতিহাস নেই।
–তবে তুমি এই আইনকে অস্বীকার কর।
আপনি করুন। আমি বাধা দেব না। আপনি আমাকে কেন এভাবে আঘাত করছেন!
সাইদের চোখ ছলছল করে উঠল। ইহুদ কিঞ্চিৎ নরম হয়ে সাদইদের সামনে মেঝেয় বসে পড়লেন।
সসম্ভ্রমে ব্যস্ত হয়ে সাদইদ বলল–ওভাবে মাটিতে বসছেন কেন আপনি! আহা! আপনি ওই শিলাসনে বসুন!
–না থাক!… যেন বিরক্ত হয়ে ঈষৎ ধমকেই উঠলেন ইহুদ! তাঁর চোখ সহসা কেমন এক অনির্বচনীয় দিব্যালোকে যেন ভরে যেতে লাগল। সেই আলো ছড়িয়ে পড়ল রিবিকার মুখে। রিবিকার দ্বাঙ্গ ভাষাতীত এক মহাভাবে মুহূর্তে শিহরিত হয়ে উঠল।
ইহুদের গলা ভারী হয়ে উঠল–আমার এই হাতের লাঠিখানা চিনতে পারিস মা!
ইহুদের কণ্ঠস্বরে অপার্থিব এক জাদু মিশেছিল, রিবিকার সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে গেল। তার পা দুখানি যেন গেঁথে গেল পায়ের তলার পাষাণের সঙ্গে। কোলের শিশুকে সে বুকের সঙ্গে সপাটে আঁকড়ে ধরেছিল। হঠাৎ তার মনে হল সমস্তই যেন ইহুদ ছিনিয়ে নিতে এসেছেন।
অর্ধস্ফুট স্বরে রিবিকা বলল–পারি বাবা!
–আমাকে তুমি ভুলে গেছ!
–আপনাকেই আমি মরুভূমির বুকে খুঁজেছি বাবা!
ইহুদ এবার ফের ঈষৎ গর্জে উঠলেন–মিথ্যে কথা!… সেই গর্জনে হেরাপুত্র মায়ের বুক থেকে মাথা তুলে শূন্যে চোখ মেলে কী যেন খুঁজে দেখল, পেল না। আবার মায়ের বুকে মাথা রাখল। লজ্জায় রিবিকা চোখ নত করল।
ইহুদ বললেন–তাই যদি না হবে তাহলে আমার অপমান তোমার বুকে বাজল না কেন? তুমি কী করে এই পাহাড়দুর্গে রাত কাটালে! তোমার পাপের বিচার কে করবে! রাজার আইন আছে, সে আইন রাজাকে স্পর্শ করে না।
