রিবিকা ফোঁসানি শুনতে পায়। বাইরে বেরিয়ে আসে। বুঝতে পারে সাদইদ ফিরেছে। ভয়ে ভয়ে সে সাদইদের কাছে এগিয়ে আসে। সাদইদ রিবিকাকে ফিরে দেখে না। চাঁদের আলোয় তার মুখ অসম্ভব গম্ভীর। এক-পা এক-পা করে একটি উচ্চ শিলার দিকে এগিয়ে যায় সাদইদ। বসে পড়ে। সামনে পা মেলে দেয়। চওড়া শিলা। পিছনে হাত মেলে দেয়। হাতের উপর ভর দিয়ে পিছনে চিতিয়ে থাকে। চাঁদ দেখে যায় আপন মনে। তার এই নীরবতায় ভয় পায় রিবিকা।
সাদইদ যখন চোখ মুদে বসে থাকে–তখন রিবিকা ভয়ে অপরাধে, দুপুরের দূত আসার সময়ের ঘটনার কথা মনে করে, হঠাৎ বোকার মত পাহাড়ের বাইরে চলে আসার অপরাধ করার কথা ভেবে সাদইদের পায়ের তলায় চুপ করে বসে পড়ে। রিবিকার ছোঁয়ায় চোখ মেলে সাদইদ।
সাদইদের মনে হয় তার পায়ের তলায় একটি মেষ, যাকে সে বশায় গেঁথে ফেলেছিল, সে পড়ে আছে। বুকে তার এক পরমাশ্চর্য মায়া ছলছল করে ওঠে। সে জানে, এই বুক বৃষবক্ষ, নির্মম। তবু কোথাও একটা নদী আছে বিস্তীর্ণ সাদা মরুর তলায়–দেখা যায় না। নদীতীরে অমরাবতী–এক নগরীর কেন্দ্রে গড়ে উঠেছে। স্বর্গের হৃদয়ে এক কক্ষ–যেখানে বিরাজ করছে চির বসন্তের স্ফটিক স্বচ্ছ আলো–সেই আলোয় ঘুমিয়ে রয়েছে এক নারী–দুটি প্রজাপতি তাকে খুঁজছে। এই মোহ কি দূর হবে না কখনও? খুবই ভাবাবেগে হৃদয় যেন বুজে আসে!
রিবিকা হঠাৎ বলে–আমাকে মুক্তি দাও সারগন!
মুহূর্তে সেই নদী যেন সাদইদের পায়ের তলা ছুঁয়েছে–চাঁদ সাক্ষী! সাদইদ সহসা রিবিকাকে দু’হাতে আকর্ষণ করে বুকে টেনে নিয়ে বলে–আমি কিছুতেই আর পারছিনে রিবিকা! তোমাকে আমি কারুর জন্য দিতে পারি না। তুমি আমার যুদ্ধের পড়ে-পাওয়া, কুড়োনো! চাঁদ জানে, আমি কী বলছি!…
.
০৬.
এক গভীর অবসাদ ছাড়া আর কিছুই নেই। রিবিকার শরীরকে শতবার আলিঙ্গন করেও সাদইদের তৃপ্তি হয়নি। এক অব্যক্ত অবসাদে মন ভরে আছে। তার কোমরে ঝুলছে রাজা হিতেনের দেওয়া সন্ধিপত্রের স্বর্ণফলক। এই সন্ধিপত্রে রাজা সাদইদের কল্যাণ কামনা করে লিখেছে–তুমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সীলমোহর অঙ্কিত স্বর্ণফলকে তোমার স্বাক্ষর চিহ্নিত করেছি, তোমার আমার যুক্ত স্বাক্ষর খোদিত হয়েছে। তোমার সৈন্যবাহিনী আমার অনুগত থাকবে। কেউ কোন সামাজিক অপরাধ করলে তার বিচার-ভার তোমার বটে, কিন্তু আমার পরামর্শ প্রার্থনীয়, তুমি অনুগৃহীত সেনাধিপতি, আমার দানছত্রের অধীন মরু অঞ্চল, পাহাড় ও দ্রাক্ষাকুঞ্জগুলি শোভিত রাখা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা তোমার কাজ। তোমার নিকট কর প্রার্থনা করি না। কেবল যখন আমার সাম্রাজ্যে সুন্দরীদের প্রতিযোগিতা হয় তখন তুমি উৎকৃষ্ট সুন্দরী সরবরাহ করবে। একটি উৎকৃষ্ট সুন্দরীর বিনিময়ে তোমাকে দেওয়া হবে কিছু ডুমুরবৃক্ষ, একটি দ্রাক্ষাবাগিচা এবং নতুন কোন অঞ্চলরেখা, তাতে থাকবে উদ্যান আর শান্ত জলাশয়। তোমার কল্যাণ এবং মঙ্গলসাধনা রাজা হিতেনের কর্তব্য। তুমি নিজে কোন আইন প্রণয়ন করতে পারো না। আমার প্রণীত আইনই তোমার পালনীয় আজ্ঞাস্বরূপ। কারো উপর মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা প্রয়োগ করার অধিকার তোমার নেই। যৌন-পীড়কের শাস্তি মৃত্যু। দেশদ্রোহিতা-হত্যা এবং যৌন অপরাধের জন্য আমার নির্দেশ আছে মৃত্যুদণ্ড। তাছাড়া বাকি অপরাধের দণ্ডগুলি মৃদু ও কোমল। ‘নারী-বিলাস’ পুরুষের সৌন্দর্যচর্চা। নারী তার প্রিয় পুরুষের কাম প্রশমন করে সূক্ষ্ম কলানৈপুণ্যে, ব্ৰীড়ায়, লাস্যে,সংগীতে ও নৃত্যে। নারীর ক্ষমতা স্বর্গীয়। তাকে পদাঘাত ও বলাকার করা পাপ। অত্যন্ত সুদক্ষ, প্রত্যয়বান সৈনিকও যদি কোন সামান্য দেবদাসীর উপর গর্হিত আচরণ করে এবং তা প্রমাণিত হয়, তবে মৃত্যুদণ্ডই হবে সৈনিকটির শাস্তি। মনে রাখবে আমার চর তোমাকে সর্বদা অনুসরণ করে। অথচ তুমি আমার সন্তান মাত্র।
নারীর ক্ষমতা স্বর্গীয় অথচ আমি হিতেনের সন্তান হয়েও চোখের সামনের এই নারীকে উপভোগ করতে পারছিনে। কেবলই এক বিষাদ আমাকে আচ্ছন্ন করছে। ভাবতে ভাবতে বেদনা-জড়ানো চোখের পাতা তুলে রিবিকাকে দেখল সাদইদ। ভোর হয়েছে পাহাড়ের শীর্ষে–শান্ত সাদা সীসার মত উজ্জ্বল।
পাহাড়ের মাথায় সেই এক শান্ত রহস্যময় স্নিগ্ধ প্রত্যুষ। সূর্য ওঠেনি। ঈশ্বরের নিঃশ্বাসে ভরে আছে মরুভূমি।
সাদইদ রিবিকার দিকে চেয়ে বলল-রুহার মৃত্যু এক অভিশাপ রিবিকা! রাজা হিতেন লোটার মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা দিয়েছে। রাজার রথ আসবে। তার সুন্দরী প্রতিযোগিতায় তোমার নাম তালিকাবদ্ধ হয়েছে। এই দণ্ডাজ্ঞা পালন করতে আমি বাধ্য। তোমাকে উপহার দিয়ে আমি যা পাব–দ্যাখো রিবিকা রাজাই তো ঈশ্বর! তার অলক্ষ্য কিছু নেই।
বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সাদইদ। সাদইদ ফের বলল–লোটা জানেই না, তার পরমায়ু শেষ হয়ে গিয়েছে। তুমিও জানতে না তোমার ভবিষ্যৎ। গত রাত্রি এক দুঃস্বপ্ন ছিল। কোন নারী বা কোন সৈন্য আমার নয় রিবিকা। এই পাহাড়ও আমার নয়। ইতিহাস সুদীর্ঘ মানুষ একদিন বিশ্বাস করতেই চাইবে না রাজা ঈশ্বরের মত ক্ষমতাবান ছিল। এই যুদ্ধ শেষ হবে। আমি কী তুচ্ছ দ্যাখো, তোমাকেও রক্ষা করতে পারি না! নারী আর শিশুর রূপ স্বর্গীয় নিশ্চয়ই–যুদ্ধই বারবার তাকে ধ্বংস করেছে। আমার যদি দেশ থাকত তোমাকে আর লোটাকে নিয়ে সেখানে চলে যেতাম। চোখের সামনে লোটার মৃত্যু আর তোমার বিসর্জন দেখে যেতে হবে।
