গবাক্ষের নিচে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে আছে লোটা। যদি পড়ে যায়, দৈবাৎ হাত ফসকে গেলে মাথার খুলি পাষাণে পড়ে থেঁতলে যাবে নির্ঘাত।
মুখাকৃতি কেমন এক মায়াময় লোভে, রক্তের ছিটে দাগে করুণ আর ভয়ংকর দেখায়। ককানো আর্ত ভাষা পাগলের মত।
–ঠিক আছে, ছোট জাত বলে দুয়ার না হয় বন্ধ রাখো। আমি এই পাহাড়তলীর জনপদ রক্ষা করছি বিবিকা! মড়ার গন্ধে তিষ্ঠোতে পারতে না। এখন দুপুরে হালকা লু বইছে। কিন্তু সন্ধ্যার পর শীত পড়তে শুরু করবে। শীত আসন্ন। কত দেবদাসী আর শিশু মহা-শীতে নষ্ট হবে– বাঁচবে না। মড়ার গা থেকে পোশাক খুলে নিয়ে সেদ্ধ করার ছোট কাজটি কেউ করবে না। সালেহ। ছিলেন পবিত্র। তাঁর উম্মত বলে এ কাজ করি। তাই বলে জাত আমার ছোট নয়। তোমরা কেন উটের মত উপকারী প্রাণীকে শব বইবার দায়িত্ব দিয়েছ? শুঁটকি আর মদ বহে বেড়ায় এই জীবটা, কিন্তু প্রকাণ্ড পাথর টানা ছাড়াও সোনাদানাও তো বইতে পারে। পারে না? তোমরা চাষীবাসী, তোমরা মিশরের। দেবদাসী, দেবরাজ সামাশতোমাদেরভগবান। সব ঠিক। কিন্তু আমি তো শুধু পায়ে হাঁটা লাগাম ধরা চুটকিলা গাওয়া উটের চালক যাযাবর নই। আমি সেনাপতি, রিবিকা!
মানুষের দীনহীন এমন আকুলতা কখনও শোনেনি রিবিকা–যুগপৎ মর্যাদাবান অভিমানও দেখেনি কোনদিন। একই সঙ্গে তার আপন ধর্মের প্রতি, ভাষার প্রতি ভালবাসা আর সংকোচ লোটাকে দগ্ধাচ্ছে। লোটা যেন স্বয়ং যুদ্ধের অস্তিত্ব–যাযাবর জাতিগুলির সমষ্টি সত্তার রূপ, ক্রীতদাসের একান্ত-হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে ক্রমাগত। লোটা কাতরাচ্ছে পথ হারানো মরু যাযাবর পিতা আব্রাহামের মত। অধিকারহারা এমন মানুষটিকে একবার রিবিকার সারগন বলে ডেকে উঠতে মন চায়। পারে না।
ভয় করে। সংকোচ হয়। ঘৃণাও হয়। কেন এই ঘৃণা সে জানে না। সে নিজে দেবদাসী–যুদ্ধের পাপ মোছর রুমাল! জীবনের তলানি মদ, কটু কাদামাখা বালিভরা মরুকূপের জল। নানান পুরুষে লেহিত, এটো ঝুঠো পরিত্যক্ত মদপাত্র, কানাভাঙা, কুকুরে চেটে তোলা শীতার্ড বাটিখুরির ছবি। রক্তমাখা ওই মুখটা, ফাটা জামা ছিঁড়ে গা থেকে ঝুলছে, যুদ্ধের শোণিতে কালো ছোপঅলা শবগন্ধময় পোশাক দেখে, শক্ত চোয়াল, চোখের তলায় মরুভূমির বালি, খোঁচা-খোঁচা দাড়ির ভিতর লু ঝাঁপটানো উষরতা–চোখ করুণ আর রক্ত রাঙানো বদ গোপন ধূর্ততা জড়ানো–এ মূর্তি কী ভয়াল! এ দেখে বুক শুকিয়ে কাঠ হয়।
রিবিকার ঠোঁট থরথর করে কাঁপে। হেরার পুত্রকে বুকে আঁকড়ে ধরে সভয়ে বারবার। চোখ তুলে গবাক্ষে চাইতে গায়ে ঘাম দেয়। সারা মুখমণ্ডল ঘর্মাক্ত হয়ে ওঠে। মানুষের ক্ষুধার্ত কাতর চোখ এত তীব্র আর আকুল হয় করুণাঘন হয়? কী করবে রিবিকা?
–আমার ভাষা কেবল তুমিই বোঝে রিবিকা! এই মরুভূমিতে আর কেউ নেই। মানুষ কথা না বলে থাকতে পারে! বলল দেবী ইস্তার! কতকাল মুখ বুজে থাকব!
রিবিকা পারে না। মনে মনে বলে ওঠে–আমার সারগন যে একজনই লোটা!তাকে পাই না-পাই জীবনের শেষ বাসনা তারই পায়ে অঞ্জলি দিয়েছি। সারগন নিজেও জানে না আমার কী হয়েছে। মন্দিরে আমায় এভাবে ডেঝে না লোটা!
গবাক্ষ আঁকড়ে ধরায় পেশল কঠিন হাত দুখানি ফুলে উঠেছে শক্তির উল্লাসে। কিন্তু হাত ফসকে গেলে লোটা বাঁচবে না। একদিকে রিবিকার শেষ বাসনার সুতীব্র তৃষ্ণা, অন্যদিকে লোটার দুর্ভাগ্যের প্রতি ঘৃণা-মেশানো সহানুভূতি তাকে বিচলিত করে। সে ফুঁপিয়ে ওঠে।
লোটার মুখটা এই কান্নার স্পর্শে অসাধারণ কোমল হয়ে পড়ে। দগ্ধ রক্তাক্ত চোখ নিবে গিয়ে ঘষা নক্ষত্রের সুদূর আলোর মত ম্লান হয়ে ওঠে। ঠোঁটের ভাঁজে সিঞ্চিত হয় অপরাধের ভাষা। লোটা যেন অন্যায় করে ফেলেছে।
হঠাৎ তার মনে হয়, তারই কারণে রুহা আত্মহত্যা করেছে। এবার রিবিকার যদি কিছু হয়! লোটার আঁকড়ানো হাত মুহূর্তে শিথিল হয়ে পড়ে! হাত খসে যায়।
লোটা পাষাণের উপর পতিত হয়। রিবিকা প্রাণফাটা আর্তনাদ করে গবাক্ষর কাছে ছুটে আসে। নিচে চোখ মেলে বোবা হয়ে যায়। পাষাণেই পড়েছে বটে কানি-পরা আব্রাহাম। নড়ছে না। মৃদু ফোঁপানি চকিত হয় রিবিকার কণ্ঠে। কালো ঘোড়া মনিবকে এসে শোঁকে। ধীরে ধীরে নড়ে ওঠে দেহ। মরেনি। হৃদয় স্তব্ধ হয়ে পড়েনি। তবে পায়ে লেগেছে। লেংচে ওঠে লোটা।
ঘোড়ার পিঠে ওঠার আগে করুণ চোখে গবাক্ষর দিকে চায়। লোটা সেই যুদ্ধ, যার অবসান সহজ নয়। পা খোঁড়া হতে পারে, কিন্তু যে পড়ামাত্রই মরে না। কালো ঘোড়া লু-প্রবাহিত ঝাঁঝালো রৌদ্রে, কম্পমান রৌদ্র তরঙ্গে-তরঙ্গে কেঁপে ওঠে ছবির মত। অশ্ব আর অশ্বারোহী–দূরে ভেসে যায়। এবার একা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে রিবিকা।
আকাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মেষশিশুর মত মেঘ জমতে থাকে। হঠাৎ রিবিকা দেখে ভগবানের বন্ধু মোসি লাঠি হাতে মেযেদের চালিত করছেন–আকাশে মানুষের মত একটা মেঘ দেখা যায়।
রিবিকা মহাত্মা ইহুদের নাম ধরে কেঁদে ওঠে সশব্দে। হঠাৎ তার মনে হয়, এ পাহাড়টি যেন এলিফেনটাইন দুর্গের মত। সে বন্দী। এই শিশু বন্দী। সাদইদ এক নব্য ফেরাউন।
সাদইদ যখন ফিরে এল, রাত্রি তখন যথেষ্ট গম্ভীর হয়েছে। চাঁদ পাহাড়ের উচ্চতা ছাড়িয়ে অনেক উপরে দাঁড়িয়ে। সাদা অশ্ব পাহাড়ের গা চাটছে। তার ফোঁসানি শোনা যায়। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে একা সাদইদ। রিবিকা ঘুমাতে পারেনি।
