রিবিকার দুই চোখ দপ করে জ্বলে উঠল মুহূর্তে। তার মনে পড়ে গেল আক্কাদ তাকে কন্যারূপে খরিদ করে দাসীরূপে ব্যবহার করেছিল। যুদ্ধের সময় পুরুষের হৃদয়ে কোন সত্য থাকে না।
রিবিকা অত্যন্ত দৃঢ়স্বরে বলল কার কাছে কী চাইছি সারগন! কিছুই চাই না।! তুমি যা খুশি করতে পারো। তোমার কাছে দয়া চাওয়া যায়। ভদ্রতা আশা করা যায় না। ভাড়াটে সৈন্য বর্বর–সেকথা সবাই জানে! যুদ্ধই যার নেশা–তার কাছে চাইবার কী আছে! আমায় ঘোড়া থেকে নামতে দাও! তুমি হেরার পুত্রকে মধু দিতে চেয়েছ, তাই যথেষ্ট!
বলে রিবিকা গায়ের কাপড় সামলে তুলে নিচে লাফিয়ে পড়ল। তারপর দ্রুত পাহাড়ের দিকে ছুটল। পাহাড়ে ঢুকে এসে দেখল শিশু তখনও ঘুমিয়ে রয়েছে। ঘুমন্ত শিশুকে বারবার চুমু খাচ্ছিল আপন মনে রিবিকা–একসময় তার পিছনে এসে দাঁড়াল সাদইদ। তার আসা টের পেয়ে পিছন ফিরে স্পষ্ট চোখে দেখল সাদইদকে।
সাদইদ হঠাৎ বলে উঠল–যুদ্ধই আমার নিয়তি রিবিকা। তুমি তোমার কাল কী হবে জানতে চেয়েছিলে। রুহার মন্দিরটা খালি হয়ে গেল! সেখানে তুমি কালই
–সারগন!
দুচোখে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল রিবিকা।
–বাইরে ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে হিতেনের দৃত। হয়ত এখনই আমায় চলে যেতে হবে! তোমায় খরিদ করার সামর্থ্য আমার নেই বলেই সারগন বাইরে বেরিয়ে চলে গেল! রিবিকা তার পিছু পিছু ছুটে এসে দেখল একটি সোনালী অষের চালক সারা গায়ে কালো পোশাক মোড়ানো, সাদইদের সঙ্গে কথা বলছে। গোল কাগজে পাকানো পত্র পাঠ করল সাদইদ। তারপর তড়াক করে অশ্বে লাফিয়ে উঠে পিছন ফিরে রিবিকাকে দেখে ভয়ানক আশ্চর্য হয়ে গেল! অস্বাভাবিক ক্রোধে মুহূর্তে তার মুখ কঠোর হয়ে গেল। সহসাই নেমে এল ঘোড়া থেকে। রিবিকার সামনে এগিয়ে এসে গালে একটা চড় কষিয়ে দিয়ে বলল–কেন ছুটে এলে?…যাও!
এই সময় কালো পোশাক হা-হা করে অট্টহাস্য করে উঠল। তার কালো মুখ সাদা দাঁতে সবুজ একটা ছোপ লাগানো চামড়ায় হাসির চোটে কুঁচকে গেল।
এত জোরে চড়টা মেরেছিল সাদইদ যে,রিবিকার মাথা ঘুরে গেল! সে পড়ে গেল নিচে। আশ দুটি ছুটে গেল দিগন্তের দিকে। ঝাঁপসা চোখে কান্না-প্লাবিত রিবিকা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল পাহাড়ের পায়ের কাছে ছায়ায়, এই অংশে পাহাড়টি বেঁকে সূর্যকে আড়াল করেছে।
দিগন্ত থেকে শবানুগামীরা ফিরে আসছে। ফিরে আসছে শববাহক উট। নিঃসঙ্গ উট, যার দোলানো গলা শূন্যে ভাসে নিরবলম্ব। আর্তনাদ করছে লোটা। তার অশ্ব চিৎকার করে আকাশ মথিত করছে।
রিবিকার গালে সাদইদের পাঁচটি আঙুলের ছাপ স্পষ্ট বসে গেছে। গালে হাত বুলাতে বুলাতে কান্নায় ফোঁপানো রিবিকা চোখ মুদে ফেলে আশ্চর্য হল–সারগন কি তবে তাকে সত্যিই ভালবেসেছে! নাকি অন্য কিছু? সারগন হঠাৎ অত খেপে গেল কেন? কালো দূতটির সামনে তার বেরিয়ে আসায় কী অপরাধ হয়েছে? ওহো! মা গো! ও যে হিতেনের তাঁবেদার! এ যেন আর এক ফেরাউনের সেপাই।
হঠাৎ রিবিকার শিশু কেঁদে ওঠে। রিবিকা সেই কান্না ক্ষীণ সুরে ভেসে আসতে শোনে। দ্রুত ছুটে যায় পাহাড়ের ভিতর।
শিশু রিবিকার গালে স্পষ্ট ছাপ দেখে হাত বাড়ায়। একটু-আধটু অবোধ গলায় কথা বলার চেষ্টা করে। শিশুর কোমল আঙুলের ছোঁয়ায় রিবিকা শিহরিত হয়। সাদইদ শিশুর জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করেছে। পর্যাপ্ত দুধ। মধু,আঙুর। এমনকি নানারকম খেলনা। তার মধ্যে মিশরের কাগজে আপন হাতে বানিয়েছে নৌকা। যার মধ্যভাগ পিরামিডের মত খাড়া হয়ে উঠেছে একটু বেশি।
শিশুকে বলেছে–এই তোমার নৌকা বাবুসোনা! নোহের কিস্তি। এই তোমার ফেরাউনের পিরামিড। সবই তোমায় দিলাম। মানকরোনা! পিরামিড তোমার ঐশ্বর্যের নিশানা। নৌকা তোমার দুঃখের ভার বইবে। জীব আর বীজের প্রতিপালক হবে তুমি। তোমার হাতে যেন মানুষ কখনও দুঃখ না পায়! তুমি কখনও আমার মত শিশুমেষকে হত্যা করবে না। তুমি পিঁপড়ে পাখি পতঙ্গের ভাষা বুঝবে। তুমি হবে নতুন স্বর্গের ভাস্কর।
রিবিকা ককিয়ে উঠল–সারগন যে আমায় কিনতে চাইলে না খোকা! তোর জন্য যে লোকটা ব্যবস্থা করেছে, সে যে কালই আমায় মন্দিরে ঢোকাবে! এই পাহাড়টার মতই মানুষটা কী রহস্যময়! আমি কী বোকা রে!
শিশুকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে অঝোরে অশ্রুপাত করছিল নিঃশব্দে রিবিকা। এমন সময় গবাক্ষপথে একটি রক্তমাখা অদ্ভুত মুখ ভেসে উঠল। কে ওটা? ও কি মানুষ? আঁতকে উঠল রিবিকা।
লোটা হা-হা করে হেসে উঠে বলল–শোন বোন! আমার ভাষা তুমি ছাড়া কেউ বোঝে না! তুমি কুমারী আনাথ। আমি তোমার ভাই বালদেব! ভয় কি? তুমি ছদ্মবেশী বকনাবাছুর! এখন চারিদিক নির্জন। কেউ জানবে না। দুয়ার খুলে দাও । আমি ক্ষুধার্ত! রুটি মাংস চাইনে। তোমাকে চাই। তোমার আমার মিলনে সমুদ্র মেঘ পাঠাবে! এ জীবন অমর নয় রিবিকা! আমি শববাহক। ঘেন্না হয় বুঝি! এসো আমরা দু’জন উঠের পিঠে মিলিত হই!
কনানী পৌরাণিক গল্পের কুৎসিত প্রসঙ্গ বারবার উত্থাপন করছিল লোটা । অপমানে ভয়ে রিবিকার মুখ কালো হয়ে উঠেছিল। স্বয়ং যুদ্ধের বিভীষিকা গবাক্ষ ধরে দাঁড়িয়েছে। ভয় হচ্ছিল সে যদি জোর করে পাহাড়ের ভিতর ঢুকে পড়ে!
লোটা ফের বলে উঠল–আমি পদাতিক নই। আমি সাদইদের অশ্বারোহী এক নম্বর সেনাপতি। আমার গোত্র ছোট হতে পারে, ধর্মে আমি কাঙাল হতে পারি কিন্তু আমার সম্মান আছে রিবিকা! আমি মন্দিরের সামনে যত্রতত্র লাইন দিয়ে দাঁড়াতে পারিনে। আমি নোংরা দেবদাসীর কাছে গিয়ে শরীরে রোগ বাধাতে পারিনে। আমার নবী সালেহ। তিনি পয়গম্বর। তিনি জীবন আর মৃত্যুর অধিপতি। জীবন আর মৃত্যুকে কেউ বহন করে না। তুমি দুয়ার খুলে দাও। যদি অনুমতি করো, আমি ভাল পোশাক পরে আসতে পারি। আমাকে একটিবার অন্তত সারগন বলে ডাকো তুমি। একবার ডাকো!
