রিবিকা সহসা এক অজ্ঞাত ভয়ে আপনমনে সিটিয়ে উঠল। সে তার অতীত জীবনের ছায়াকে মনের তলায় দেখতে পেয়ে জীবন সম্পর্কে এক অপূর্ব তৃষ্ণা অনুভব করছিল। এ তৃষ্ণা যে কিসের তা সে জানে না। সে আর সাদইদকে বলতে পারল না লোটার কাছে যাও। বরং তার মনে হল, সাদইদ তাকে এই মুহূর্তে যেন ছেড়ে না যায়। হঠাৎ তার মনের এই পরিবর্তন দেখে রিবিকা নিজেই কেমন হয়ে গেল।
বলল–এই দুপুরে আর কোথাও গিয়ে কাজ নেই তোমার। যা হবার তা হয়েই গেছে। আমাদের বাচ্চাটা একা রয়েছে, ঘুম থেকে জেগে উঠলে ভয় পাবে!
সাদইদ রিবিকার কথা শুনে আশ্চর্য হল। মনে হল, এই মেয়েটির মনেও একটা সংসারের ছবি বিরাজ করছে, যে কিনা যুদ্ধকে ভয় পায়–আর লোটা যেন যুদ্ধেরই বিভীষিকা! রুহার মৃত্যুকে যেন রিবিকা গোপন করতে চাইছে!
সাদইদ বলল–লোটা গৃহনির্মাণ, চাষবাস, পাথরকাটার কাজ কিছু নিশ্চয়ই পারবে না। কিন্তু দেশরক্ষার কাজে তার কোন জবাব নেই। অথচ দেখো লোটার নিজেরই কোন দেশ নেই।
রিবিকা এ প্রসঙ্গ আর শুনতে চাইছিল না। বলল–তোমার পাহাড়টা কি ভাল সারগন। আকাশের তলায় এ যেন আশ্চর্য স্বপ্ন!
–তোমার পছন্দ হয়েছে?
–খুউব! তবে আমার পছন্দের কীই-বা দাম!
–কেন?
–কালই তুমি আমায় তাড়িয়ে দেবে! দেবে না?
–কী করে বলব!
সাইদের এই জবাবে বক্তা এবং শ্রোতা দুজনই অবাক হয়। রিবিকা প্রথম থেকেই শুনছে সাদইদের প্রচুর সুন্দরী রয়েছে, অথচ নিজের বলতে তারা তার কেউ নয়-বাই মন্দিরের মাল। যুদ্ধের পড়ে-পাওয়া মজুত দ্রব্য। সাদইদ প্রকৃতপক্ষে লোটারই মত একা। কিন্তু লোটার মত বিচ্ছিন্ন নয়, বঞ্চিতও নয়। কাকে তবে সে ভালবাসে? একজন দেবদাসীর কী হবে–সেকথার জবাব তার জানা নেই–একথা বিশ্বাস করতে হবে! পরম আশ্চর্য হয়ে ঘাড় ফেরাল রিবিকা! সাদইদের চোখের দিকে তবু সে চাইতে পারল না।
সাদই অবাক হয়ে রিবিকাকেই অপলক দেখছিল। কী এমন ঘটল যে,এমন কথা তার মুখ থেকে বার হল! দেবদাসীর কী হবে কাল–এ যে বাতুল অতি নগণ্য প্রশ্ন! একজন দেবদাসী সূর্যমন্দিরের রক্ষিতা যুদ্ধের জ্বালানি–সৈনিকের দ্রাক্ষারস!
দিগন্ত থেকে এক ঝলক বাতাস এসে অশ্বের গায়ে লাগে। রিবিকার গাত্রাবরণ খসে পড়ে, সোনার মত শরীর, মায়াপুষ্পময় বক্ষস্থল, যা বর্ণবহুল। প্রজাপতির পুষ্পভ্রম ঘটায়, মরুর বুকে এক আশ্চর্য শীতলতা, কোন দামেই এ ঠিক খরিদ হবার নয়, এ যেন সৌন্দর্যের সকল আধারকে উপচে ফেলে!
আকাশে দীপ্যমান দেবতা সামাশ। দূরবর্তী মরুপ্রাঙ্গণে আর্ত তৃষ্ণার্ত লোটার। নিরাকুল চিৎকার চকিত হয় মাঝে মাঝে! দিগন্তে মানুষের সারিবদ্ধ ছায়া, সামনে শববাহক উট, জীবন চারিদিকে ধু-ধু করছে। ঘোট পাহাড় থেকে খোমশের (বালদেব) পূজার ঘণ্টা বিষয় বাতাসে অস্পষ্ট ভেসে আসে। এমন আবহের ভিতর জীবনের এক অবধিহারা বিস্ময় প্রজাপতির পাখার তরঙ্গের মত কাঁপতে থাকে–রিবিকার চোখ দুটি যেন ছায়াচ্ছন্ন রঙিন সবুজ হ্রদ–দুটি চোখ কাঁপে–পাতা কাঁপে, জল ভরে ওঠে।
ধরা গলায় রিবিকা সহসা বলে–পিরামিডের আকাশে চাঁদটা উঠত সারগন। মনে হত, ওই আকাশ আর চুড়ো ছেড়ে কোথাও সে যেতে পারবে না।
–তারপর?
–এখানে এসে দেখলাম, পাহাড়ের মাথায় চাঁদটা এসে পৌঁছেছে। এবার ফের মনে হল, চাঁদটা আর কোথাও যেতে পারবে না। পাহাড় ছেড়ে পালাবার সাধ্যই তার নেই। নীল নদীর আকাশে এই চাঁদটা অস্ত গিয়েছিল সারগন!
বলতে বলতে উচ্চকিত স্বরে কেঁপে উঠল রিবিকা। অষের পিঠের একপাশে রিবিকার পা দুখানি ঝুলছিল–তার পিছনে সূর্য সামনে পাহাড়।
–তারপর?
–কে জানত! চীদ আবার ওঠে! আকাশ কত দূর। তার শেষ নেই। এখানে রাত্রি এল! চাঁদ উঠল! আমি তাঁবুর তলে শুয়ে চাঁদ দেখেছি সারগন! কাল আমার কী হবে বলে দাও!
–সে তো গণকের কাজ রিবিকা!
–দেবদাসীর ভাগ্য তুমি জানো না? আমায় তুমি কুড়িয়ে পেয়েছ! কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস ফের হারিয়ে গেলে হৃদয় তবু খারাপ করে! করে না? যার কোনই দাম নেই, তা হারালে মন (হৃদয়) খারাপ হওয়া কী যে বাজে ব্যাপার!
–তারপর?
–তবু তুমি আমায় কিনবে কবি? নোহের সন্তান তুমি!
এই হৃদয়বিদারক আকুলতা যেন শেষহীন এক তরঙ্গ–যা লোটার আর্তনাদকে ছাপিয়ে উঠতে চায়। দুটি স্বরই নিরাকুল, নিরাশ্রয়-দুটি বিপরীত আঘাতে বুক ভাঙে। সাদইদের হৃদয় একটি দ্বীপের মত সমুদ্রে একা জলের তরঙ্গায়িত দোলায় বিধৌত হয়–সেই সমুদ্র, যার বাতাস কিনারে এসে সমুদ্রেরই গর্ভে ফিরে যায়–সে তেমনি এক রুদ্ধ সমুদ্রের মত তোলপাড় করতে থাকে।
–নোহের সন্তানের কাছে বেদামী মানুষও দাম চাইতে পারে সারগন। তুমি কবি। তুমি ছাড়া আমায় তো কেউ কিনবে না। মহাত্মা ইহুদ আমার বাবা। তাঁকে একটি ভাল কাজ দাও। অপমান করো না।
–অ!
–কী হল?
–না। কিছু নয়। আমি কবি নই রিবিকা! আমি ভাড়াটে সৈনিক।
–তুমি রাগ করলে? ইহুদকে মহাত্মা বলেছি বলে?
সহসা কড়া গলায় সাদইদ বলল–একজন দেবদাসী খুবই চালাক হয় রিবিকা! বাইরে সে সুন্দর হলেও অন্তরে অনেক ফাঁদ পেতে বসে থাকে। জানি নে তুমি আমার কাছে কী চাইছ? প্রজাপতি দুটি আমার মত ব্যর্থ কবির ভ্রান্তি মাত্র । দ্যাখ, দেবদাসী কী করে একই সঙ্গে এক পুরুষকে লেহন করে, অন্য পুরুষকে দেহ দেয়। যাকে পিতা বলে ডাকে, সে হয়ত তার প্রেমিক!
