লোটা কি প্রাচীন আমালেক জাতির লোক? প্যালেস্টাইনের মরু অঞ্চলে এর পূর্বপুরুষরা বাস করত? বারো গোষ্ঠীর কোন এক গোষ্ঠীই কি তার গোষ্ঠী? কী যে তার অতীত ইতিহাস, জানা যায় না। এমন হতে পারে, তার গোত্রের নাম। হয়ত ‘আসের’ । সে যে চাষবাস মোটেও জানে না, তা বোঝা যায়।
তবে লোটা যে ইউসুফ’ গোত্র নয়,তা ঠিক। কারণ বারো গোষ্ঠীরা আব্রাহামী আমোরাইট। মোসি ছিলেন ইউসুফ গোষ্ঠীর লোক হয়ত। কী ছিলেন বোঝা ভার। বারো গোষ্ঠীর নামগুলি চমৎকার। রুবেন, সিমিওন, লেবি, যিহুদা, দান, নপ্তালি, গাদ, আসের, ইষাখর, সবুলুন, ইউসুফ। হতে পারে মোসি ছিলেন যিহুদা গোত্রের মানুষ। কী হতে পারে কেউ জানে না।
লোটার আমালেকরা হয়ত বারো গোষ্ঠীরই কোন গোত্র-উদ্ভূত। কী বিচিত্র। গোত্রধর্মগুলি! কেন যে লোটাকে বোঝানো গেল না, এ ভাষা যেমন চাষীর ভাষা, তেমনি তাঁরুর মাংসখেকোদের ভাষাও বটে। যাযাবরী সংস্কৃতি কী উচাটন!
না পারে গৃহনির্মাণ, না পারে ধাতু বা পাথরের কাজ কিংবা চাষবাস। পুরো এক যাযাবর! এ লোক যুদ্ধ ছাড়া কিছুই পারবে না। পারবে হানা দিতে, লুঠ করতে, ঘর জ্বালাতে, উট দিয়ে শস্যক্ষেত্র তছনছ করে দিতে! এ মেষ প্রকৃতি নয়। উটের মত শূন্যে ভাসমান জীব। খুব অদ্ভুত যে,এখানকার অন্য সৈনিক আর দেবদাসীরা নিজেদের চাষী মনে করে–দুঃখী, কিন্তু তাদের জমিজায়দাদ ছিল একদা–ঐশ্বর্য ছিল! এই গর্ব তাদের সম্বল। ক্রীতদাসত্বেও অনেকে তার চাষীত্বের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে পারেনি। অথচ যখন একজন সৈনিক তার বেদনার্ত গলায় সুর করে বলে :
‘আমার থাকবে এক আঙুর বাগিচা–
এ আমার নিজের কুঞ্জখানি প্রিয়,
বসিতে দিও ঠাঁই বিছায়ে আঁচলখানি তব;
ডুমুর বৃক্ষের তলে, আমার সে নিজস্ব ডুমুর,
কেউ মোরে হানিবে না তীর, বর্শা বা কুড়ল,
নির্ভয় সে জীবন মম, সেই মোর অমরাবতী তীরে
স্বপ্নের কুটীর ॥ [মীখা ৪ : ৪ ]
বোঝা যায় না, এই সৈনিকটি কে? যাযাবর,নাকি চাষী! এ তার কিংবদন্তীর সত্যযুগে নিবিষ্ট দু চোখ মেলে চেয়ে থাকা। সাদইদ জানে, যাযাবর আর চাষী আলাদা থাকেনি চন্দ্রকলার বাঁকা মৃত্তিকায়–অথচ লোটাকে তারা সহ্য করল না।
অথচ নিশিমার মত সামান্য দেবদাসী তাকে কুকুরের মত ধাক্কা দিয়ে দুয়ারের বাইরে ঠেলে ফেলে দিলে। এই দেবদাসীরা আমনের বউ। দেবতা সামাশকে সহ্য করে তারা, গ্রহণ করেছে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের তুলাদণ্ডে মেপে। বালদেব আর আমন বা সামাশ অনেক শক্তিশালী–কিন্তু উট কী কাঙাল একটি জীব! অচ্ছুত ওই জীবটা, মৃতদেহ বহা ছাড়া কোনওই কাজ হয় না। চাষী বৃষভক্ত, তার শস্য বইবার গাড়ি কী উন্নত! দেবী ইস্তার কী লাবণ্যময়ী। হিত্তীয়রা রথ চালায়, আমনভক্তরানী ইবেলসূর্যের ধর্ম সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে গেছেন! রথের যুগ এখন শ্লথগতি ভাসমান উট কী বোকা! গা ঘৃণায় কুঁচকে যায়।
নিশিমারা সম্রাট ফেরাউনের ধাতুবলয় নির্মিত রথের চাকা বালুরাশির ঘর্ষণে আগুন-স্ফুলিঙ্গ ছড়াতে ছড়াতে ধাবিত হতে দেখেছে। কী শৌর্য! এই রথ নিয়ে ফেরাউন মোসিকে লাল দরিয়া অবধি তাড়া করে গেছিল! রাজা হিতেন যখন সুন্দরীদের দেখতে আসে এই জুমপাহাড়ীতে, তখনও আগুন ঝলসায় চাকার আবর্তে। রাজার পায়ে লুটিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। সাধ হয় তেনার হারেমে গিয়ে থাকতে। রাজা হিতেনের দেহে রতি আর কামের সমান অবস্থা। কেমন সেই হারেম। নিশিমা বলেছে–আমি যাব! কিন্তু কে তাকে নিচ্ছে? ত রূপ তো নিশিমার নেই!
সাদইদ ভাবতে ভাবতে রিবিকার সুন্দর মুখোনির দিকে সকরুণ চোখে দেখল। রিবিকা বলল-লোটার কাছে একবার যাও। ও যে পাগল হয়ে গিয়েছে! রুহার অন্তরে এত ঘৃণা ছিল সারগন!
সাদইদ বলল–হ্যাঁ, রিবিকা! এখানকার দেবদাসীরা কোহিন আর বল-এর গল্প করতে ভালবাসে! আদম আর হবার দুই পুত্র! কোহিন চাষী। এবল মেশপালক, পশু চরায়। ওরা দুজনে ঈশ্বরকে খুশি করার জন্য পাথর দিয়ে দু’টি বেদী তোয়ের করে। কোহিন তার শস্যসবজির উপচার বেদীতে রাখল। এবল রাখল তার সবচেয়ে বলিষ্ঠ পশুর মাংস। তারপর দুজনই আগুন লাগিয়ে দিল। উদ্দেশ্য ছিল তাদের নৈবেদ্যের আগুনে পোড়া সুগন্ধ দেবতা গ্রহণ করবেন।
রিবিকা বলল-ইহুদের মুখে এ গল্প শুনেছি। এবলের ধোঁয়া আকাশে যবহের দিকে উঠে গেল। কোহিনের ধোঁয়া নিচে নেমে গেল। এই পাল্লাতে মেষপালক জিতেছে।
সাদইদ বলল–না রিবিকা! নিশিমারা কোহিনকেই জেতায়। বুঝতে পারি এই দ্বন্দ্ব যাবার নয়। অনেক দেবদাসী নিরামিষ আহার করে। অথচ মরুভূমির শীতে গা উষ্ণ রাখতে হলে মাংস-রুটিই খেতে হয়। ডুমুর-রুটি সৈন্যরা পছন্দ করে না। দেবদাসীরা কেউ কেউ ঘুচিবায় দেখায়। তবু শেষমেশ সেনাদের ঘরে নিতে আপত্তি দেখি নে! কিন্তু লোটা যে উট-উপাসক। খুব দুভাগ্য! আমরা যাযাবর, কে আর কে নয়-কারো বলার সাধ্য নেই। যুদ্ধ আমাদের এখানে গুতিয়ে এনে জড়ো করেছে। লোটা উটে করে মড়া বইবে–এ যেন একটা পেশা! এভাবে তাকে ঘৃণা করে ঠেলে দেওয়া হল! রুহার মৃত্যুর জন্য এই দুভাগ্য দায়ী। নবী সালেহও তো একটা শস্যসবুজ উপত্যকার স্বপ্ন দেখেছিলেন!
শুনতে শুনতে রিবিকা চমকে উঠল! সহসা তার চোখের সামনে আক্কাদের ভয়ংকর কঠোর মুখ ভেসে উঠল। উটের পিঠে দোলায়িত রমণের ক্ষুব্ধ বিষয় শোকাবহ স্মৃতি হৃদয়ে গুমরে উঠল।
