এই যুদ্ধে জীবন তো কোথাও আস্ত নেই। সর্বত্র ধ্বংসলীলা চলেছে। চাষীর খেতখামার জ্বালিয়ে দিয়েছে সর্বত্র। পশু বধ করে চলে গেছে অসুররা। চাষীরা যেসব রাষ্ট্রে খাল কেটে চাষ করার নতুন প্রণালী আবিষ্কার করেছে, তারাও গৃহছাড়া–খালগুলি বুজিয়ে দিয়ে গেছে যে যেমন পেরেছে–শুধু অসুর নয়, সর্বাত্মক এই যুদ্ধে সকলেই যেন সকলের শত্রু হয়ে গেছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক, আঙুর কুঞ্জগুলি তছনছ করেছে এই যুদ্ধ। মানুষ মদ অবধি তৈরি করে খেতে পারছে না। মদ না পেলে সৈনিক লড়বে কী করে?
ভাবতে ভাবতে লোটার আকণ্ঠ তৃষ্ণা জেগে ওঠে। মদ আর শুঁটকির চাট তার রক্তের অধিকার, রক্তের উষ্ণতা এ ছাড়া হয় না। শীত আসার আগেই যদি নিনিভে ধ্বংস না হয়, তবে এই শিবির প্রাণীশূন্য হয়ে যাবে। সাদইদ কাপড়, মদ, খাদ্য কোনটাই পর্যাপ্ত জোগাড় করতে পারবে না। গ্রামগুলিতে দুর্ভিক্ষ, মহামারী–তন্দুর বিড়! একখানা রুমালটি আর চারখও ভেড়ার মাংস নিয়ে একটা পরিবারে হানাহানি অবধি হয়ে যাচ্ছে।
জীবনটা এখন অন্ধ কেঁচোর মত–কোনদিকে চলেছে বোঝা যায় না। যেদিকে অত্যধিক আঘাত পাবে মনে করে, সেদিক থেকে গা টেনে ভয়ে অন্যদিকে ছোটে। কিন্তু কোথায়, জানার উপায় নেই। চলেছে মাত্র। দিকহীন, অন্ধ এক যাত্রার নাম যুদ্ধ। ক্রীতদাস যারা, কেন ক্রীতদাস তা যেমন তারা জানে না, যুদ্ধ কেন, কিসের যুদ্ধ সে জানে না। ইহুদও কি জানেন এই যাত্রার অবধি? যাদের তিনি সঙ্গে করে এনেছিলেন মিশর থেকে, তারা কোথায়? সবই মরুভূমিতে হারিয়ে ফেলেছেন। লোকটা নিতান্তই বোকা! তাঁর অনুসরণকারী নেই। পশুদল নেই। অথচ লাঠিখানা হাতছাড়া করছেন না। সৈনিকরা তাঁকে বেঁধে এনে দেবদাসীর মন্দিরের সামনে টুল পেতে বসতে দিয়েছে। সাদইদ এই বেচারির সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। কেনই বা না হবে? লাঠিধারীদের এই যুদ্ধের সময় কত বেশেই না দেখা যায়। আসলে এসব লোক, আপনি বাঁচলে বাপের নাম করে, মোদ্দা হল বাঁচা-মাথাটা এখানে জড়ে দিয়েছে। তা, লোকটা বোকা, কিন্তু ভদ্র। কেঁচোবৎ নড়াচড়া করছে। কাঁধে হাত রাখলে মন্দ লাগে না। তবে গা কেমন সিরসির করে।
ভাবতে ভাবতে লোটার বুক হু-হুঁ করে উঠল। কোথায় চলেছি? কেন যুদ্ধ করছি! শীতে বাঁচব কিনা জানি না। সাঁজোয়া ভর্তি করে লাশ বহে এনে পোশাক ছিনতাই করছি–জীবনের এই তলানি এত উষর যে, সেখানে একটা নারী অবধি পাওয়া যায় না! কারুকে ছুঁয়ে ফেললে সে আত্মহত্যা করে! এই অন্ধ জীবন আর আমি চাই না, হা নবী!
লোটা আকাশে মুখ তুলে সুতীব্র চিৎকার করে উঠল। জেহাদী এই কণ্ঠস্বর যুদ্ধের আর্তনাদ। মানুষ যখন শত্রুপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন এভাবে চিৎকার করে। এই আর্তনাদ মনে হয়, তামাম চন্দ্রকলাকৃতি বাঁকা ভূখণ্ডকে মথিত করছে। আকাশ থেকে চোখ নামালো লোটা। দূরপথে চোখে পড়ল এক পুরোহিত একা ছুটছে রুহাকে বহে নিয়ে যাওয়া উটের শবযাত্রীর পশ্চাতে, সে পিছিয়ে পড়েছে। এই পুরুত টোলে বসে সাদইদের জুমপাহাড়ী অরমিক সমন্বয়ী ভাষা শেখানোর ওস্তাদি করে। শালা পা নাচায় আর উচ্চারণ করে ইয়াহো! ইয়াহো! হা খোদা! যখন লোটা টোলের বাইরে দেবদারুর তলায় বসে থাকে-ওই পুরুত বাঁকা তলচোখে যেন ব্যঙ্গ করে। একে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে হল লোটার।
লোটা ফের আর্তনাদ করে উঠল। এ গর্জন তার নাভিতে মোচড় দিয়ে আকাশে উঠে যাচ্ছিল। লোটা হাহাকার করে উঠল–এই মুহূর্তেও তার ভাষা কেউ বুঝতে পারছে না।
নোটার আর্তনাদে সাদইদের পাহাড় অবধি কেঁপে উঠল! গা কেঁপে উঠল। রিবিকা ব্যাকুল স্বরে বলে উঠল–লোটা কেন অমন করছে! ও কি মরে যাবে!
আবার আর্তনাদ ভেসে এল-সলেহও … …ও ও… পি. ই ই তা… আ… আ… আ…
রিবিকা আপাদমস্তক শিহরিত হয়। তার শরীর কণ্টকিত হয়ে ওঠে।
অগ্নিদগ্ধ গ্রাম। দুর্ভিক্ষ-কবলিত উৎসন্ন জনপদ। মারী-পীড়িত লোকশূন্য গৃহ। খুঁটায় ঝুলন্ত মৃতদেহ। শেয়াল-কুকুরে-শকুনে টানাটানি করা মৃত্যু। নগরীর একটি ধ্বস্ত দেওয়াল আগুনে পুড়ে কালো হয়েছে। মুহূর্তে চোখের উপর দিয়ে। ছবির মত ভেসে যায় সাদইদের। এ যেন সেই আর্তনাদ, যার নগর কিংবা গ্রাম বলে কিছু নেই–সর্বত্র এই প্রাণফাটা চিৎকার উঠছে! কিন্তু এ আর্তনাদ এখন লোটারই একান্ত হৃদয় থেকে নিংড়ে বার হচ্ছে। তার মুখ বন্ধ করার উপায় সাদইদ নির্ণয় করতে পারছে না।
সাদইদ অশ্বপৃষ্ঠ থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের দিকে চাইল। দিগন্তে ওরা পৌঁছে গেছে। ছোট পাহাড়টির মাথায় রয়েছে বালদেবের মন্দির। সেখান থেকে প্রকাণ্ড একটি ঘণ্টাধ্বনি কান পাতলে এই নির্জন দুপুরে শোনা যেতে পারে। সেখানে রয়েছে পবিত্র শিলা আর পবিত্র বৃক্ষ। পুংশক্তি আর স্ত্রীশক্তির প্রতীক। এ স্থান গ্রাম নয়, নগরও নয়। অথচ দেবতা ছোট পাহাড়টির শীর্ষস্থান কখন কীভাবে দখল করে বসেছেন সাদইদ জানতেই পারেনি। শুধু তাই নয়, সূর্য মন্দিরগুলির সামনে গাছের বদলে খুঁটি পুঁতে রেখেছে দেবদাসীরা। এর নাম ‘আসেরা’।
এরা দেবদাসী বটে, কিন্তু কেউই চাষী জীবনকে ভুলতে পারে না। দেবী ইস্তার অথবা বালদেবকে স্মরণ করে। আসেরা তারই প্রমাণ। এরা কেউ ছিল বাবিলে, আসিরিয়ায় অথবা মিশরেকীভাবে ভাসিয়ে এনেছে যুদ্ধ! নিনিভের অবরোধ। মিশরের দুর্ভিক্ষ। কিন্তু এদের বেশির ভাগ এরা অরমিক ভাষাটি মান্য করল, তাঁবুর ভাষা দ্রুত শিখল–কেবল উট-উপাসক বেদেটি মাথা নোয়াল না। তার কারণ, মিশরীয়, মোসোপটেমিয়া, হিটাইট আর কনানী হিব্রসদৃশ সমন্বয়ী ভাষাটি কীলকাকৃতি নকশার ভাষা নয়। অথচ এ ভাষা মরুভূমিরই ভাষা। এ কথা লোটা বুঝতেই চাইল না। সে ভয় পেয়ে গেল। নকশা থেকে লিপিতে এ ভাষার পরিণতি ঘটেছে, একথা লোটা সহ্য করল না। তার ভাষা কত পুরনো। ধর্মও পুরনো।
