লোটা জানত এখন তাকে কী করতে হবে। ধীরে ধীরে সে উঠে দাঁড়াল। একটা উট টেনে আনল মৃতদেহের কাছে। সবাই সরে দাঁড়াল একটু তফাতে। মৃতদেহ স্পর্শ করা মাত্র লোটার তাবৎ দেহ থরথর করে কেঁপে উঠল।
লোটা অদ্ভুত একটা আর্তনাদ করে উঠল। তার ভাষা তো কেউ বোঝে না। বারবার সে সাদইদের দিকে চোখ তুলে কী যেন প্রশ্ন করছিল। সাদইদ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত করল রিবিকাকে আনা দরকার। ঘোড়া ছুটিয়ে গিয়ে সাদইদ রিবিকাকে পাহাড় থেকে তুলে আনল।
লোটা তখনও আর্তনাদ করে চলেছে। রিবিকা দুই চোখ বিস্ফারিত করে শুনতে পেল–ছায়া। ছায়া থাকবে তো! রুহার ছায়া কি থাকবে না কোথাও?
কথা বলতে গিয়ে রিবিকার গলা কান্নায় বুজে এল। সকলে তার মুখের দিকে প্রশ্নাতুর চোখে চেয়ে আছে। রিবিকা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল–ছায়া। ও বেচারি রুহার ছায়ার কথা বলছে!
এখানকার কিছু মানুষ রিবিকার কথা বুঝতে পারল। রিবিকা বিচিত্র ভাষা জানে। কখনও সে আমারনার ভাষা, কখনও হিদ্দেকলের ভাষা, কখনও কনানী ভাষায় বলল-ছায়া কি থাকে না কোথাও!
পুরোহিত রুহার শেষ স্নান করিয়ে দিল। তারপর বলল–ছায়া তো থাকেই । থাকবে না কেন? কিন্তু কোথায় থাকে সে কি আর দেখা যায়। জ্ঞানী মানুষ দেখতে পান মাত্র। তুমি তো পাপ করেছ লোটা। সরে দাঁড়াও!
পুরোহিত আর লোটাকে রুহার দেহ স্পর্শ করতে দিল না। সাদইদ লোটাকেই মৃতদেহ উটের পিঠে তোলার জন্য নির্দেশ দিয়েছিল। পুরোহিত সেই নির্দেশ বাতিল করে দিয়ে বলল–মানুষ মৃতাকেও গমন করে জানবেন। লোটা শবানুগমন করতে পাবে না।
রুহাকে পিঠে করে উট চলতে শুরু করল দিগন্তের দিকে। পুরোহিত প্রবল ঘৃণায় লোকটাকে বলল–ভাষা তো শিখলে না! আমি কতদিন তোমায় যুদ্ধের জরুরি ভাষা, তাঁবুর ভাষা শেখাতে চাইলাম। গা করলে না। নিজ ধর্মে তুমি একটা পাষণ্ড! সালেহর মত তোমারও কোথাও ঠাঁই নেই বাপু! চলো হে, শব এখন যাত্রা করুক, রোদ চড়া হয়ে যাচ্ছে! একটা উটই তোমার নিয়তি, ওই বিকট পশুটাই একদিন তোমাকে দিগন্তে পৌঁছে দেবে–ভাবনা কিসের!
যাত্রা যখন সবে শুরু হয়েছে, সকলে নড়েচড়ে চলতে শুরু করেছে, মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য, এ যে যুদ্ধে বিনাশ হওয়া নয়, তাই এর শবানুগমন আছে, উট একলা দিগন্তে নিয়ে যাবে না, মানুষও শবের পিছনে পিছনে যাবে মৃত্যুর খাদ অবধি–মানুষ সবে চলতে শুরু করেছে, সবার শেষে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ইহুদ। তিনি লোটার কাছে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে নিঃশব্দে কাঁধে হাত রাখলেন।
লোটা আশ্চর্য হল। মানুষটি তার চরম উন্মত্ত অবস্থায় কাঁধে হাত রেখেছিলেন, চরম দুর্দশার মুহূর্তে এবং এখন শোক আর ব্যর্থতার, অপমানের। শেষহীন সংকটকালেএগিয়ে এসে দ্বিতীয়বার হাত রাখলেন। এ কেমন মানুষ!
চাপা সুরে এই প্রথম ইহুদ কথা বললেন–তোমার ভাষায় যে কথা বলে সেই তোমার আপনজন লোটা। দুঃখ করো না। যবহ তোমায় বিচ্ছিন্ন করেছেন।
লোটা ইহুদের কথা বুঝতে পারল না বটে, কিন্তু মনে মনে কী যেন এক আশ্বাস অনুভব করল।
উট তখন বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে।
লোটাকে ইহুদও ছেড়ে গেলেন। শবানুগামী দলটি ক্রমশ দূরবর্তী দৃশ্যে মিলিয়ে যেতে থাকে। লোটার কালো ঘোড়াটি কাছে এসে পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রবল শক্তিমান নিবার্ক প্রাণীটিই তার একান্ত আশ্রয়। লোটার চোখ যবহের চোখের মত জ্বলতে থাকে। ইহুদের ভাষা সে বোঝেনি, কিন্তু কেমন এক ধারা আশ্বাস পেয়েছে, অবশ্য একজন গামছাবালার আশ্বাসেরই বা কী দাম! বেচারি এরপর অন্য দেবদাসীর তাঁবেদারি করবে। ইহুদের কোলে রুহার কালো বাচ্চাটা খেলা করছিল। একজন কোন দেবদাসীর কাছে বাচ্চাটা জমা হবে। যারা বৃদ্ধা, তারাই অবৈধ পিতৃমাতৃহীন শিশুদের আগলায়।
লোটা সাদইদকেও চলে যেতে দেখল পাহাড়ের দিকে–সুন্দরী ওই মেয়েটিকে ঘোড়ার উপর কোলের কাছে বসিয়ে নিয়ে রাজার হালে সাদইদ হেলেদুলে যাচ্ছে–এই দৃশ্য অসহ্য! নোটার কাঁধে তামাম যুদ্ধের ভার। অথচ সকলের জন্য রয়েছে নারী আর শিশু। লোটার কেউ নেই। আছে কেবল অপমান। রুহা আত্মহত্যা করেছে ঘৃণায়। পূর্বদেশে চাষীদের সঙ্গে উটবালাদের দাঙ্গা দীর্ঘকালের ঘটনা। চাষীরা উট উপাসকদের সহ্য করে না। যাযাবর বেদে বলে উপহাস করে। যারা থিতু জীবন পেয়েছে, তারা ভেসে বেড়ানোদের কেনই বা সইবে! হানাদার বলে প্রবল ঘৃণায় চোখ কোঁচকায়। সবই লোটা জানে।
অথচ সবই ভগবানের ইচ্ছে। বাবিলের জিগুরাত ঈশ্বর ধ্বংস করে দিলেন। মানুষের স্পর্ধা আকাশের দেবতাদের ভাল লাগল না। মানুষ স্বর্গের সিঁড়ি বানিয়ে দেবতাদের আক্রমণ করতে চেয়েছিল। দেবতাদের অন্তত তাই ধারণা। স্বর্গ ধ্বংস হল–এই শাস্তিই যথেষ্ট ছিল। ক্রুদ্ধ দেবতারা কিন্তু আক্রোশবশত মানুষকেই বিচ্ছিন্ন করে দিলেন! ভাষা আলাদা হয়ে গেল।
লোটা ভাবল, তার নিজের ভাষাটি ঈশ্বরের দান। ঈশ্বরই লোটার বিচ্ছিন্নতা চেয়েছেন। না চাইলে এই ভাষা তিনি যোগাচ্ছেন কোথা থেকে! ভাষা ত্যাগ করলে মানুষের আর রইল কী? সাদইদ তার ভাষাই কেড়ে নিতে চাইছে। ভাষা চলে গেলে ধর্মও আর আস্ত থাকবে না। সাদইদ তাকে কিছুই দেয়নি। বরং কেড়ে নিতে চাইছে। অথচ বারংবার আশ্বাস দিয়ে চলেছে, নিনিভে ধ্বংস হলে যুদ্ধের যা পাওনা লুঠ করে নিতে পারা যাবে, তাই হবে জীবনের পক্ষে যথেষ্ট। অতঃপর তারা কানের দিকে ঢুকে যাবে। সেইসব লুঠ করা পশু, খাদ্য, বস্ত্র, অলংকারাদি নিয়ে কনানে ঢুকতে পারলে জীবনটা অন্যরকম হতে পারে। আসলে কী হতে পারে কেউ জানে না। রাজা হিতেন সমস্তই কেড়ে নিতে পারে।
