বলতে বলতে স্বর যেন গলার ভিতর নিবে আসে সাদইদের।
–তোমার কেউ নেই?
–আমার জন্মের কথা আগেই বলেছি!
–মহাত্মা ইহুদকে এভাবে হীন কাজে নিয়োগ করলে কেন? উনি আমার পিতা।
–কে তিনি?
–যাঁর হাতে লাঠি রয়েছে!
যুদ্ধই তাঁকে নিয়োগ করেছে বিবিকা!
–এ তোমার চালাকি! তোমার সৈন্য ওঁকে বেঁধে এনেছে। আমাদের তামাম দলটাকে হত্যা করেছে।
–যুদ্ধ যে তাই করে আমনের বউ!
–তোমার শিশুবিলাসকে আমি ঘৃণা করি সারগন! শিশুকে স্পর্শ করার অধিকার তোমার নেই।
রিবিকা সাদইদের কাছ থেকে সরে চলে এসে হেরার পুত্রকে কোলে তুলে নিয়ে দুই চোখ মুদে নিঃশব্দে অশ্রুপাত করতে থাকে।
সাদইদ সেই দৃশ্য দেখে ভাবে–এই ছবি একটি স্বর্গের ছায়া। তখনই একটি উট এসে গবাক্ষপথে গলা বাড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। গায়ে ওর শব বহনের ঘ্রাণ।
রিবিকা সুতীব্র ভয়ে শিশুকে বুকে সজোরে চেপে ধরে চিৎকার করে ওঠে। সাদইদ দ্রুত আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠে গবাক্ষের কাছে সরে আসে। তারপর ত্বরিতে গবাক্ষের ঝাঁপ ফেলে দেয়।
বাইরে চলে আসে একাকী সাদইদ। তার মনে হয়, একটি প্রস্তাব উত্থাপন। করতে গিয়ে সে থেমে গেল কেন? লোটার ভাষা বোঝে রিবিকা। এই যুক্তিই যথেষ্ট। লোটাকে নিঃসঙ্গতার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে রিবিকাই।
কিন্তু কেবলই তার চোখের উপর ভাসছে প্রজাপতি–অধিকৃত এক কোমল সৌন্দর্য। কী অপার সেই রূপ! পতঙ্গ যার সুরক্ষার দাবি করে তার জন্য কী করতে পারে একজন ভাড়াটে সৈনিক? কিছুই কি পারে না? মধু আর বিষ–ভাস্কর হেরা জগৎকে প্রশ্ন করেছে কী দেবে মানুষ শিশুর মুখে!
উটটা চলে যাচ্ছে জ্যোৎস্নার প্লাবনে ক্রমশ। কালো অষের পিঠে চড়ে একলা মরুর উপর অকারণ ছুটে বেড়াচ্ছে লোটা। এ যেন তার একলার উৎসব। লোটা মুখে স্ফূর্তির তীব্র চাপা এক-ধারা শব্দ করছে। এ তার কান্নাও হতে পারে!
হঠাৎ কখন পাশে এসে চুপটি করে দাঁড়িয়েছে রিবিকা। সাদইদ ঘাড় ঘুরিয়ে মায়াবতী রূপসী দেবদাসীকে দেখল। রিবিকার মাথার কাপড় বাতাসের ধাক্কায় কাঁধে খসে পড়ল। চাঁদের পানে মুখ তুলল রিবিকা। তার চোখের কোণে গড়ানো অশ্রু নিচের পাতার তলে বিন্দুবৎ জমেছে। চাঁদের আলো ঠিকরে এসে পড়ছে সেই বিন্দুর উপর।
জ্যোৎস্নায় এত মোহ, এত তীব্র ভাললাগা থাকে সাদইদ জানত না। সে ভাবল, এই নারী কেন চিরকাল থাকে না এই চন্দ্রকলাকৃতির দেশে! সে কেন ফুরিয়ে যায়?
ভাষা থাকে, ধর্ম থাকে, দেবতারা আকাশে থেকে যান, এমনকি পিরামিড ধ্বংস হয় না। এই নারী কেন এমন থাকে না চিরকাল? রিবিকা তুমি থাকবে–বলে হাত বাড়াতে গিয়ে থেমে গেল সাদইদ। দেখল, উটটা দিগন্তে হারিয়ে যাচ্ছে, কালো ঘোড়া লাফাচ্ছে!
০৫-৬. লোটার কেবলই মনে হচ্ছিল
লোটার কেবলই মনে হচ্ছিল তার সমস্ত গা পচে যাবে। শব বহনের সময় মানুষের মৃতদেহ থেকে গলিত রক্ত সারা দেহে লিপ্ত হয়েছে, দেহ থেকে একটা বীভৎস গন্ধ কিছুতেই নড়তে চাইছে না। একথা সে কাকে বলবে? কালো ঘোড়া ছুটিয়ে সমস্ত রাত সে জ্যোৎস্নায় মরুভূমি তোলপাড় করেছে। কিন্তু এভাবে তো বাঁচা যায় না।
সকালবেলায় রুহার মৃত্যু-সংবাদ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। রুহার মৃত মুখে গাঁজলা উঠছে। রুহা ভোররাতের কোন এক সময় বিষ গিলেছে। মরবার সময় সে অন্য দেবদাসীদের বলে গেছে–সে ছিল চাষীর মেয়ে। দেবী ইস্তার যেমন দুঃখী, সেও তাই। মরে যেতে তার বাধে না। আবার সে পৃথিবীতে আসবে। সঙ্গে থাকবে তামুজদেব। তামুজকে যুদ্ধের গহ্বর থেকে সে উদ্ধার করে ফিরে আসবে। সে আর দেবদাসীর জীবন নয়, চাষীকন্যার মত দুঃখে তাপে বেঁচে থাকবে। হাজার একটা লোক তাকে ছিঁড়ে খাবে দেবী ইস্তার তা চান না, তাই সে চলে যাচ্ছে।
খোড়ো মন্দিরের সিঁড়ির তলায় তক্তার উপর শোয়ানো হয়েছে তাকে। তার চোখ তুলে তাকানোর সাধ্য নেই। গা খিঁচুনি দিচ্ছে প্রবল ধাক্কায়। তার পা দু’টি তক্তার উপর স্থির রাখা যাচ্ছে না–মাথা পড়ে যাচ্ছে তক্তা ছাড়িয়ে। মাথা একজন, অন্যজন পা দু’খানি ধরে আছে চেপে। এই দৃশ্য চেয়ে চেয়ে দেখছে লোটা। রুহার মুখে যাতে বাতাস লাগে, সেজন্য লোকজনের ভিড় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। লোটা স্পষ্ট সব দেখতে পাচ্ছে। তার গায়ে গরম জল ঢালছে। এক কানা বুড়ি। এই বুড়ি ছাড়া কেউ লোটাকে স্পর্শ করে না। বুড়ি বোবা বলে তার ভাষার বালাই নেই। তাছাড়া বুড়ি তার নিজের ধর্ম কী বলতে পারে না। তার কাপড়ের আঁচলে বাঁধা থাকে গুটিকতক কুমীরের প্রতীক। তাই হয়ত তার দেবতা।
বুড়ি গরম জল ঢেলে ঢেলে পাথরের খোয়া দিয়ে নোটার গায়ের রক্ত ঘষে তুলতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। কানা বুড়ি এক চোখে ঝাঁপসা দেখতে পায়। লোটা কড়াইতে করে মৃতদের পরিত্যক্ত কাপড়-চোপড় সেদ্ধ করে চলেছে। জ্বালানি ঠেলে দিচ্ছে আর লাঠি দিয়ে কড়াইয়ের সেদ্ধ হতে থাকা বাষ্পময় বস্ত্রগুলি গুতোচ্ছে। মাঝে মাঝে গরম জল গায়ে পড়ার সময় লোটা সামান্য চেঁচিয়ে উঠছে। সে দেখছে চোখের সামনে রুহার মৃত্যু।
খিঁচুনি দিতে দিতে এক সময় রুহার দেহ স্থির হয়ে গেল। লোটা তখন হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সাদইদ লোটার সামনে এসে দাঁড়াল চুপচাপ। অনেকক্ষণ কোন কথাই বলল না । লোটা রক্তাক্ত চোখ তুলে সাদইদকে একবার। দেখল। তার বুকে কান্না জমাট বেঁধে গেল–সে আর কাঁদতে পারল না।
