অতঃপর সীমাহীন মরুর বুকে আর এক যুদ্ধ শুরু হল! মরুবাঘের মত লোটা পাগলিনী রুহার বেদনাকাতর দেহে ঝাঁপ দিল। মৃতদেহ পিঠে করে দাঁড়িয়ে রয়েছে উট। রুহা কঁকিয়ে উঠল–আমায় ছেড়ে দাও।
একটি পাহাড়গুহার ভিতর টেনে আনার চেষ্টা করছে একটি পুরুষ একটি নারীকে। দুজন দুজনের ভাষা বোঝে না। লোটার বিদ্বেষ আরো ভয়াবহ। পাহাড় নারীকণ্ঠে তীব্র আর্তনাদ করে ওঠে। অশ্বারোহী সাদইদ সেই কান্না শুনতে পায়–কিন্তু কোথায় রুহা বুঝতে পারে না। ইহুদ তখনও পৌঁছতে পারেননি।
অত্যন্ত ছোট পাহাড় এটি। সাদইদ অশ্বকে দ্রুত পাহাড়ের চারপাশ প্রদক্ষিণ করে আনে। দেখতে পায় ওদের। লাফিয়ে নামে। ছুটে এসে ক্ষুধার্ত বাঘের মুখ থেকে শিকার কেড়ে নেয়। ইহুদ ততক্ষণে পৌঁছে গেছেন।
সাদইদ প্রবল বলপ্রয়োগ করে লোটার গালে চপেটাঘাত করে। এই সময় উটটা খাদের কাছে গিয়ে গা ঝাড়া দিতেই আংটা ছিঁড়ে মৃতদেহ খাদে পড়ে যায়। পাহাড়ের নিচে খাদটা ভরে এসেছে। শবের গন্ধে চারিদিক ভারী হয়ে রয়েছে। দেরি না করে সাদইদ রুহাকে অশ্বের পিঠে তুলে নেয়। অশ্ব ছুটে আসে জুম পাহাড়ের মন্দিরের দিকে। অপমানিত লোটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ইহুদ এসে লোটার কাঁধে হাত রাখেন…
.
রাত্রি গম্ভীর হয়েছে। লোটা আর রুহার ঘটনা কী ঘটল রিবিকা জানে না। সে সাদইদকে জিজ্ঞাসা করতেও সাহস পাচ্ছে না। উটের শব বহনের দৃশ্য তার মনে এক নিরাশ্রয় ভয় সৃষ্টি করেছে। সাদইদ এখন রিবিকার চোখের সামনে চুপচাপ থুতনিতে হাত রেখে একটি বেদীর মত উচ্চ পাথরের আসনে বসে আছে। চাঁদের আলো সারা ঘরকে ভরিয়ে দিয়েছে সাদা পুষ্পের মত। শিশু ঘুমন্ত। সাদইদ একবারও রিবিকার মুখের দিকে মুখ তুলে চাইছে না। সামনে। বসে আছে অন্যমনস্ক–কী এক গভীর চিন্তায় মগ্ন বলে মনে হচ্ছে!
হঠাৎ বাইরে ঘোড়ার একটা চিৎকার শোনা যায়। একটু পরেই লোটা এসে ঢোকে। সাইদের সামনে পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে বলে আমায় ক্ষমা করুন সারগন! আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।… বলেই লোটা শিশুর মত উচ্চ গলায় কাঁদতে লাগল। পিঠে হাত রাখল সাদইদ। সস্নেহে বলল–আমি তোমার দুঃখ বুঝি না লোটা! তুমি চুপ করো, শিশু জেগে যাবে। জানি, বলপ্রয়োগে কখনও কারো হৃদয় পাওয়া যায় না। রুহা যাকে ভালবাসত সে তো। শেষ হয়ে গেল। তুমি তার চরম দুঃখের মুহূর্তে কেন ওরকম করলে! এ। তোমার ঠিক হয়নি। তুমি ব্রাত্য–তোমার ভাষা, ধর্ম আলাদা। তোমার জন্য কোন দেবদাসীর ব্যবস্থা আমি করে উঠতে পারিনি। তাই বলে তুমি রুহার উপর। বলপ্রয়োগ করবে? আমাকে দেখে তুমি শিখতে পারো না? আমার সব আছে মনে করো! অথচ কী আছে আমার? কোন দেবদাসীর প্রতি আমার কোনই। আগ্রহ নেই। আমিও তোমারই মত নিঃসঙ্গ। যদি তুমি বুঝতে!
কথাগুলি সে অনুভবে সমস্তই বুঝতে পেরেছিল বটে, তাই তার কান্না থেমে গেল। কী মনে করে উঠে দাঁড়িয়ে রিবিকাকে দেখিয়ে ভয়ানক লোভার্ত চোখে লোটা বলল–ওই তো তোমার সব আছে। শিশু আর নারী! তোমার কপাল তো রাজচক্রবর্তীর কপাল! বন্ধু, আমি লোভ করছিনে। তবে আমি কোথাও চলে যেতে চাই। যুদ্ধ আছে, অথচ নারী নেই, এই অবাস্তব জীবন কত আর বইব! রুহার কাছে তবু আমি ক্ষমা চাইব! আমার ভাগ্যে একটা হাতকাটা মেয়েও জুটল না। আমি খুব ছোট জাত, আমার ভাষা বেদেজনের ভাষা–ঠিক আছে!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে চলে যায় লোটা। যাবার সময় চোখে বিদ্যুৎ ঝলসে তালে–তীব্র কামাগ্নি! মনে হল, রিবিকা পুড়ে যাবে।
রিবিকা সমস্তই বুঝে ফেলেছিল। সাদইদ রিবিকার দিকে দৃষ্টি ফেরালো না। বলল–আমার ভয় হচ্ছে রিবিকা! লোটা যদি আত্মহত্যা করে! ভেবে দ্যাখ লোটা কি সাহসী! ওর জন্যই আমরা বেঁচে আছি। আচ্ছা! তুমি একটা কথা শুনবে! না থাক!
বলে আবার চুপচাপ বসে থাকল সাদইদ। সাদইদের উপর সহসা রিবিকার কেমন মায়া হচ্ছিল! কাছে এগিয়ে যায় রিবিকা।
–আপনি আমাকে সব কথা বলতে পারেন! আমি শুনব!
রিবিকা সাদইদের ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে প্রায় নিজেরই অজ্ঞাতে বলে ফেলে।
–যদি ধরো লোটা আত্মহত্যা করে! আমার তো কেউ নেই। লোটাই একমাত্র বন্ধু! অথচ ও আমার তৈরি ভাষা নিল না । ও আমাকে ছেড়ে যেতে চাইছে। ও বলে, একদিন সে উটের পিঠে চড়ে বৃষ্টির ভিতর দিয়ে ঝাঁপসা হয়ে দিগন্তে মিলিয়ে যাবে। ভাবতে পারিনে রুহার মত একটা সাধারণ মেয়ের ওপর।
সে পাহাড়ের ওদিকে…কী বলব…খুব খারাপ সেই দৃশ্য!
বলতে বলতে আবার থেমে পড়ে সাদইদ। আবার বিষণ্ণ হয়ে পড়ে।
–আচ্ছা! লোটা এতক্ষণ তোমায় দেখিয়ে কী বলছিল, কোন মন্দ কথা বুঝি! তুমি কিছু মনে করো না!
ফের চুপ করে থাকে সাদইদ।
–আপনার কষ্ট কিসের! যুদ্ধই তো আপনার সর্বস্ব! নারীকে জোর করলে অন্যায় তো হয় না। দেবদাসীদের ঠাঁই দিয়েছেন তাই অনেক।
বলল রিবিকা।
সাদইদ বলল–কারো জন্য দয়া নয় রিবিকা। আমি ভাড়াটে সেনা! আগেই বলেছি, তোমার চেয়ে ভাগ্য আমার উর্বর নয়। শুধু অস্তিত্বের জন্যই সব, শুধু বাঁচা–আর কিছু নয়–কে আমায় চালিয়ে নিয়ে ফিরছে জানিনে। আজ সমস্ত দিন মনটা বিষণ্ণ হয়ে থেকেছে–কেন আমি মেষ-শিশুকে হত্যা করেছি! প্রতিনিয়ত যুদ্ধ দেখে দেখে হৃদয় নষ্ট হয়ে গেছে। আমি তো শৈরীর মানুষ। জন্মের আগে থেকে যুদ্ধ আমাকে নিয়তির মত অনুসরণ করেছে। অথচ আমার শিক্ষা সম্পূর্ণ হল না! একটি পতঙ্গ যা জানে আমি তা জানি না। একটি কুকুর কখনও বিশ্বাস ভঙ্গ করে না। প্রভুর জন্য প্রাণ অবধি ত্যাগ করে! সূর্যদেবতা সামাশের চেয়ে একটি শিশু অধিক পবিত্র। আমি তোমার বুকে ইন্দ্রধনুর রঙ। আর আলো দেখেছি রিবিকা!
