রিবিকা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, যেতে লাগল আমার দেবতা একমাত্র দেবতা, যিনি জীবন এবং মৃত্যুকে বহন করেন। আমার ভাষা একমাত্র ভাৰা, যা। নবী সালেহ বলতেন। আমার উটগুলি সেই দেবভাষা ছাড়া কিছুই জানে না। আমি আজ প্রমাণ করতে চলেছি, আমার ভাষা আর ধর্ম অনশ্বর। চিরন্তন। এর ক্ষয় নেই। প্রতিটি মৃতদেহ আমার উট বহন করে নিয়ে যাবে দূর দিগন্তের দিকে ফেলে রেখে আসবে দেহ। আসলে নবী সালেহ যেখানে রয়েছেন, সেখানে লুকিয়ে ফেলবে উট,এই মৃতদেহগুলি। তোমরা আমার ভাষা বোঝে না। আমিও বুঝি না তোমাদের। যদি জানতে মৃত্যুকে বহন করার দেবতা একমাত্র উট! জীবনকে বইবার ক্ষমতা একমাত্র তারই। আমার ব্যাকুলতা যদি
বুক চাপড়ে চাপড়ে আর্তনাদ করতে থাকে লোটা। মৃতদেহ কাঁধে করে নামাতে থাকে, উটের পিঠে তুলে দিতে থাকে।
জুমপাহাড়ী ভাষায় অনুবাদ করে দিতে গিয়ে থেমে পড়ে সাদইদ। উট শব নিয়ে দিগন্তের দিকে রওনা হয়। রুহা তার প্রিয়তম মৃত্যুকে চিনতে পেরে আগলে বসে পড়ে। মৃতদেহ ছাড়তে চায় না। তার কোলের বাচ্চাটা মৃত পুরুষের বুকে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে পড়তে চায়। সৈনিকপুরুষটি শিশুকে আদর দিয়েছে অনন্ত, সেকথা শিশু ভোলেনি। কেন তবে চোখ মেলছে না লোকটা? হাত বাড়াচ্ছে না কেঁদোটার দিকে?
রিবিকা আর সহ্য করতে পারল না। তার কণ্ঠস্বর বুজে এল। সাদইদ অসহিষ্ণুর মত বলল–থাক আর বলতে হবে না। লোটার উন্মাদনা প্রশমিত হবে না। ও কপাল চাপড়াবে। আপন বুকে কিল-ঘুষি ছুঁড়বে–এই ওর রোগ!
রিবিকা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। গুহায়িত ছাদবিহীন গৃহে শিশুকে বুকে করে ফিরে এসে লকেটটার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আকাশে মুখ তুলে সজোরে বিলাপ করে উঠল–হায় দেবী! মা গো!
লকেটটাকে এখন স্পর্শ করতেও তার ভয় করছিল। শিশুর মুখে ঈশ্বরের মত হাসি নিঃশব্দে ঝরছে। যেন দেবতা আমন শিশুর মুখমণ্ডলকে উদ্ভাসিত করে রেখেছেন। রিবিকা সেদিকে চেয়ে দেখতে দেখতে ডুকরে ডুকরে উঠতে থাকল।
বাইরে মৃতদেহকে চেনার উপায় সহজ ছিল না। কারো দেহ স্বাভাবিক নেই। কারো চোখ দুটি ঝলসে দিয়ে মুখকে বিকৃত করে দেওয়া হয়েছে। কারো মুখেরই আধখানা কেটে নামিয়ে দেওয়া। কারো দেহ আছে, মুণ্ডু সাঁজোয়ায় তোলা। হয়নি। কারো মুখ সহজ নয়। তথাপি কিছু কিছু আশ্চর্য ঘটনা ঘটছিল। বহুকাল বাদে একজন তার স্বামীকে মৃতদেহের ভিতর আবিষ্কার করতে পেরে সহসা ভয়ানক আর্তনাদ করে উঠল।
উটের পিঠে তোলার আগে মৃতকে নগ্ন করা হচ্ছিল। কাপড় খুলে নিয়ে একদিকে জড়ো করে রাখছিল লোটা। ওগুলি জলে সেদ্ধ করে রোদে শুকিয়ে শিবিরে বিলি করা হবে। এই সাঁজোয়ায় একেবারেই অচেনা পুরুষ কম নেই। কিছু নারীও মরেছে, অল্প শিশুও। সকলকে নগ্ন করে অন্তিম প্রস্থানে পাঠানো হচ্ছে। হঠাৎ একজন, নাম সুব্বা, ভয়ানক খেপে গিয়ে লোটাকে আক্রমণ করল! ঝাঁপিয়ে পড়ল লোটার উপর। কী হয়েছে? না, সুব্বা তার হারিয়ে যাওয়া কিশোর ভাইকে মৃতদেহের ভূপে আবিষ্কার করতে পেরেছে। আক্রান্ত লোটা আক্রমণ মুহূর্তে প্রতিহত করে হো-হো করে পাগলের মত উচ্চহাস্য করে উঠল।
সাদইদ ভাবল, কেন সে নোটাকে পাঠালো সৈনিকদের না-ফেরার খোঁজ নিতে? লোটা বহুদিন নিঃসঙ্গতা রোগে ভয়ানক হয়ে উঠেছিল। কীভাবে সে সাঁজোয়া ভর্তি করেছে, কেউ জানে না।
গবাক্ষে চোখ রাখে রিবিকা। শব বোঝাই উট চলেছে দূর দিগন্তের দিকে। লোটার নির্দেশই যথেষ্ট। মৃতদেহ নিয়ে ছুটে যাচ্ছে ঊর্ধ্বশ্বাসে। শক্ত আংটা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে শব।
একে একে সমস্ত দেহ বহে নিয়ে গেল উটেরা। কোথায় ফেলে দিয়ে এল কেউ জানে না। এইভাবে নবী সালেহর মৃতদেহ উট বহে নিয়ে গিয়ে শূন্য পিঠে ফিরে এসেছিল। খালি পিঠে, প্রকাণ্ড গলা ভয়ানক দোলাতে দোলাতে ফিরছে। দিগন্ত থেকে উটেরা। কুঁজগুলি কবর। পায়ের আঘাতে বালিও উড়ছে। সমস্ত শরীর মৃত্যুর পর উটের ভিতর আশ্রয় পায়। একথা জোরে জোরে চিৎকার করে বলছে লোটা।
লোটা বলছে–হা নবী! সমস্ত যুদ্ধ ওই কুঁজে থেমে যায়। যুদ্ধের অবশেষকে তুমিই বহন করো পিতা!
সূর্য মাথার উপর দীপ্যমান। কখন সে মধ্য আকাশে উঠে গেছে কারো খেয়াল নেই। কান্নার মন্থন পারাবার-প্রমাণ উত্তাল। মরুর বুক ঝড়ের মত হু-হুঁ করছে।
সূর্য চলে গেল দিগন্তে। শেষ দেহটি রুহার পুরুষটির উত্তোলিত হল। উট ক্লান্ত পায়ে অগ্রসর হল। রুহার হাত থেকে মৃতদেহ ছিনিয়ে নিয়ে লোটা উটের পিঠে বেঁধে দিল।
দিগন্তের কাছাকাছি চলে যেতেই রুহা বুকফাটা আর্তনাদ করে উটের দিকে ছুটে চলল। তার কেঁদোকে সে বালির উপর ফেলে রেখে ছুটল। কী আশ্চর্য! কেউ তাকে ধরবার চেষ্টাও করল না। হঠাৎ দেখা গেল ইহুদ দিগন্তের দিকে ছুটতে শুরু করলেন। উটকে আর দেখা যাচ্ছে না।
সহসা লোটা কী যেন চিৎকার করে বলল। কেউ বুঝল না। রিবিকা শুনতে পেল–আপনি যাবেন না মশায়! উট কোথায় যায় কেউ জানে না। মরুভূমির পাহাড়ের ওদিকে কোথায় যে যায়…ও মশায় যাবেন না।
তারপর স্বয়ং লোটা তীব্র বেগে দৌড়তে লাগল দিগন্তের দিকে। দেখতে দেখতে লোটা ইহুদকে অতিক্রম করে গেল। উট কোনদিকে ছুটেছে কেউ জানে না। সাদইদ শুভ্র অশ্বের পৃষ্ঠে লাফিয়ে উঠে অশ্ব ছুটিয়ে দিল, যখন একজন বলে উঠল–রুহা বাঁচবে না। ওকে আমনদেব ডেকেছেন!
