–আমি কী করব মা গো!
বলে উধ্বাকাশে মুখ তুলে রুহা আর্তনাদ করে উঠল।
আকাশে চন্দ্রকিরণ ঘনীভূত হচ্ছে, সূর্যালোক আর নেই। রুহা চাঁদের আলোর দিকে চেয়ে কেঁদে উঠল–আমার এই কাটা হাতটাকে কে আর ভালবাসবে! কেউ তো রইল না!
এবার অনড় মূর্তিটা কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল। রিবিকা ইহুদকে ধীরে ধীরে চিনতে পারে! একজন মসীহের এই পরিণাম অভাবিত। বোঝা যায় সাদইদ তাঁকে জীবনের একেবারে তলায় ঠেলে দিয়েছে। তাঁর এই-ধারা ঘাড় নিচু করে থাকা অবিচল মূর্তি প্রকৃতই এক সুতীব্র অপমানের দীনতম দশা–যার পর আর কিছু নেই।
সমুদ্র রয়েছে এখানে, কিন্তু সমুদ্র কিছুই দেয় না–বায়ু অথবা মেঘ। এ এক আশ্চর্য জমি। তেমনি জীবন এখানে রুদ্ধ হয়নি, কিন্তু তার কোন রূপ বা আকার নেই, একটা পিণ্ডবৎ পড়ে আছে, গর্ভনাশের ফলে মানবী যেমন পিণ্ড প্রসব। করে। এ উপমা রিবিকার মনে আসে কেন সে বুঝতে পারে না। সে আমারনায় থাকার সময় ওইধারা পিণ্ড প্রসব করেছিল। আবীরুদ তখন তার কাছে আসতে শুরু করেছে। সেই সময় তার তলপেট নড়ছে, নমরুর বাচ্চা ধরেছে সে। সে এক মর্মান্তিক অনুভূতি। গা সিরসির করে। পায়ের তালু সিরসির করে। মাথা ঘুরে ওঠে রিবিকার। সে শিশুসহ বালির উপর খসে পড়ে যায়।
তারপর সে যখন চেতনা ফিরে পায় দেখে অদ্ভুত একটি জায়গায় সে শুয়ে আছে। চোখ মেলেছে সে। প্রজ্বলন্ত চাঁদ টইটই করছে আকাশে। দু’একটি তারকা ভাসছে। বাতাস আসছে হু-হুঁ করে। অথচ চারপাশ পাষাণে মোড়া। ছাদবিহীন এ এক আশ্চর্য ঘর। জ্যোৎস্না আর হাওয়ায় যেন আকাশে ভাসমান। পাশে শায়িত শিশু। কেউ কোথাও নেই। এ তবে রক্ষঃপুরীর মত কোন স্থান।
মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার সময় সে কি ‘বাবা’ বলে কোন আর্তনাদ করেছিল? তার গলায় কি কোন স্বর ফুটে ওঠেনি? জীবনই যেন তার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করে দিয়েছে। কান্না তার গলায় দলা হয়ে জমে উঠেছিল। সে মহাত্মা ইহুদকে ডেকে উঠতে পারেনি। তার মনে হয়েছিল ডাক শুনে মহাত্মা ইহুদ লজ্জা পাবেন। সমস্ত অপমানের শেষ দশায় পৌঁছেও কেন এই লজ্জা অবশিষ্ট থাকে–ভাবলে চরম অবাক হতে হয়। ভাবতে ভাবতে রিবিকা ঘুমে তলিয়ে যায়।
খুব ভোরে তিনতলা সুউচ্চ একটি সাঁজোয়া গাড়ি এসে দাঁড়ায় পাহাড়টির কাছে। তিনতলা পরিপূর্ণ হয়ে রয়েছে লাশ। চারটি অশ্ব টেনে এনেছে। অশ্বের গায়ে ঘাম, চোখগুলি তীব্রভাবে হলুদ–সবই কালো ঘোড়া। চারটি ঘোড়াই বুঝি মৃত্যুর ফেরেস্তা–আজরাইল।
সাঁজোয়ার পিছু পিছু ছুটে আসছে উন্মত্ত রোরুদ্যমান প্রবল জনস্রোত–জুমপাহাড়ী স্ত্রী-পুরুষ। মহাশক্তিমান লোটা এই সাঁজোয়া ভর্তি করে এনেছে সৈনিকের লাশ–এর মধ্যে কারা যে সাদইদের সেনা,স্থির করতে পারেনি। সে মনে করেছে, এরই ভিতর থেকে দেবদাসীরা তার আপন পুরুষটিকে চিনে নিতে পারবে। তাছাড়া শিশুরা তার জনককে চিনবে । এই ভয়াবহ দৃশ্যটি কেন রচনা করল লোটা,সাদইদ বুঝতে পারে না। অস্থির কান্নায় আকাশ উতলা হয়ে উঠল।
সেই আর্তরব কানে পৌঁছতেই রিবিকা ভয়ে শিশুকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে। গবাক্ষপথে সে চেয়ে দেখে দৃশ্য। কান্না যেন সমুদ্রের মত বিহ্বল। দেবদাসী আর। শিশুর আর্তনাদ। যাদের আত্মীয়-বিয়োগ হয়েছে সেই পুরুষাও কেঁদে ওঠে। সবাই তো আর এখানে নিঃসঙ্গ ছিল না। কারো ভাই কারো পিতা বিনষ্ট হয়েছে–তারা কাঁদছে। দেবদাসী, যারা কিনা রুহার মত ভালবাসা করেছে, তাদের কান্নাই সবচেয়ে উচ্চকিত। মথিত এ কান্না যেন মরু লু-এর মত দিগন্তপ্লাবী প্রহার।
সমস্ত বেগ এসে সাদইদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। পাষাণবিধৌত জলরাশি যেভাবে সমুদ্র পাঠাতে থাকে এবং টেনে নেয়–ফের পাঠায় কান্নার তরঙ্গ সেইরূপ। জলপাহাড়ের মত ডুবে যেতে থাকে সাদইদ। সে যেন সমুদ্রের তলা থেকে কথা বলতে থাকে।–এমন কেন করলে লোটা?
সাঁজোয়া থেকে লোটা লাশ নামায় কাঁধে করে, একাকী। কেউ কিন্তু হাত লাগাচ্ছে না বলে তার কোন বিকার নেই। সে সাঁজোয়ার পিছু পিছু লাগামের দড়ি সাঁজোয়ায় বেঁধে টেনে এনেছে চারটি উট। সে সকলকে বলছে–দেখে নাও। কার কোনটা পুরুষ। কে বাপ, কে সন্তান, কেইবা পুত্র! যারা বিচ্ছেদ চাওনি, তারা দেখে নাও। আমি কিন্তু উটের পিঠে তুলে দেব!
নোটার ভাষা এখানে কেউ বোঝে না। বোঝে একমাত্র রিবিকা। কিন্তু রিবিকা সেকথা বুঝতে পারে না। লোটার ভাষা খুব পুরনো যে-ভাষায় একমাত্র আক্কাদের মা, সেবার মা কথা বলত। এ ভাষা শুনে রিবিকা কতকাল পর অসম্ভব চমকে উঠল। শিশুর লকেটটা ধরেছিল সে হাতের মুঠোয়। ঘর থেকে বেরিয়ে সে সাদইদের কাঁধের নিচে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিল কখন,তার নিজেরই। অজান্তে।
সাদইদ মন্দ্রস্বরে বলে উঠল–তোমার মুখের ভাষা আমরা কেউ জানিনে লোটা! তোমার ব্যাকুলতা আমরা বুঝব না। কেবল তোমার ইঙ্গিত আমরা বুঝতে পারি!
লোটার আর্তনাদে, মন্ত্রজব্দ সমুদ্র যেভাবে স্তব্ধ হয়, তরঙ্গ হয় জমাট, এ ঠিক তাই, সেভাবে কান্না থেমেছে। সেই নিস্তব্ধতার ভিতর একটি কণ্ঠস্বর ক্রমাগত চিৎকার করে চলেছে, সে লোটার দিগন্তবিদীর্ণ স্বর। সাদইদ আপন মনে বলে উঠল–তোমার ভাষা ঈশ্বরের মত। আমরা তো বুঝতে পারি না।
–আমি বুঝতে পেরেছি সারগন! বুঝতে পেরেছি!
বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠল রিবিকা। আশ্চর্য হয়ে চমকে সাদইদ পাশে দাঁড়ানো রিবিকার মুখের দিকে চাইল। বিস্ময়-পীড়িত অভিভূত স্বরে বলল–তুমি জানো! তবে বলে দাও এদের!
