গামছাবালা ঘাড় থেকে গামছা নামিয়ে হাতের মুঠোয় ধরে কপাল অবধি তুলে নাচিয়ে অভিবাদন জানালো সাদইদকে। সাদইদ সহসা ঘাড় নিচু করে ঘোড়ার লাগাম ধরে সামনে এগিয়ে চলল।
সেই যে সাদইদ ঘাড় নামালো, পথের উপর থেকে আর চোখ তুলল না। পাহাড়টা মনে হচ্ছিল খুব কাছে, কিন্তু মোটেই তত নিকটে নয়। সুদীর্ঘ সময় সাদইদ পথ হেঁটে এল। সন্ধ্যা ঘনাল। রিবিকা একটি কচি মেয়ের ভিতর তার অতীতকে এক ঝলকে প্রত্যক্ষ করল। হুবহু একই জীবন। তিনটি ভেড়া অবধি সঠিক। কচিটা যে নিজেই বণিকটিকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল না-বুঝে পথ থেকে, এই বেদনা তার কিছুতেই শেষ হতে চাইছে না।
কেউ আসার পথে প্রশ্ন তোলেনি বটে, তেমন খুব আশ্চর্যও হয়নি রিবিকাকে দেখে। কারণ তারা নিজেদের কাহিনীতেই অশেষ বিস্ময় সংগ্রহ করেছে। হঠাৎ এই অশ্ব যেন একটি উটের অবয়ব লাভ করে। কিছুতেই রিবিকা ভাবতে পারে না, এ উট নয়, ঘোড়া। দীর্ঘদেহী, সুউচ্চ ঘোড়াটা অতঃপর উট হয়ে যায়। লাগাম ধরা মানুষটিকে মনে হয় ফরাতের উটচালক। হঠাৎ চোখে পড়ে আর এক আশ্চর্য ছবি। বালির ঢিবির উপর বসে রয়েছে একটি একহাত কাটা ভয়ানক। রূপসী মহিলা, ফুলের মত বুক খুলে সে একটি কালো কেঁদো বাচ্চাকে স্তন্যদান করছে। দু’হাত তফাতে ঘাড় নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি লোক। ঘাড়ে গামছা, কিন্তু হাতে একখানা লাঠি। কে ওরকম দাঁড়িয়ে রয়েছে? ও যে চেনা চেনা কেউ।
মহিলার কাটা হাতটা স্তন্যদান করায় ক্রমাগত লাফাচ্ছে এক অনির্বচনীয় পুলকে আর বিষাদে। স্বর্ণালী সূর্য টলটল করছে। রূপালি চাঁদ অন্য গগনে ফটফটিয়ে হাহাকার করছে। কাটা হাতের প্রত্যেকটি কম্পন যেন কিছু একটা ধরতে চায়। চামড়ার ক্রমপ্রসারণ ও সংকোচন যেন কাটা নগ্ন হাতটির হৃদয়। অথবা ফুসফুস। যা কিনা বাতাস পাচ্ছে না। দম আটকে আসতে থাকে রিবিকার।
মন্দির ছেড়ে এখানে কী করছে মা, শিশু আর গামছাবালা চেনা চেনা লোকটি? বোধহয় এদিকে কোথাও এসেছিল, সন্ধ্যায় ফিরে যাওয়ার কথা, ফিরতে পারেনি।
ফর্সা কাটা হাত, কিন্তু কাঁধের পাশে ঝুলন্ত, কনুই-হীন, কনুইয়ের উপর অবধি কিছুদূর যুদ্ধের কোপে উধাও, কাটা অংশটি কালো আর অদ্ভুত দলা দলা কদর্য কোষযুক্ত, যেন-বা ফুসফুস। কালো ফুসফুস। বারবারই মনে হয় রিবিকার। সে ভয়ে শিউরে উঠে মুখে আর্ত শব্দ করে ফেলে। দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলে। সেই শব্দে সচকিত হয় রুহা। স্তন ঢেকে ফেলে কাপড়ে। সন্তানকে স্তনচ্যুত করে কাঁধে ফেলে উঠে দাঁড়ায়। লাঠিধারী গামছাবালা কিন্তু নড়ে না। যেন মূর্তি।
পশ্চিম আকাশে রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ডের আলো ক্রমশ ম্লান। অন্য দিগন্ত ক্রমে ব্যাপ্ত করে সাদা রূপার গলিত বিভা। তাই মহাঘোর এই বালুকাবিস্তীর্ণ পটভূমি-সম্মুখে খাড়া ভীষণ পাহাড়। পাহাড়ের পায়ের তলায় মসীহ ইহুদ মূর্তিবৎ স্থির। কাঁধে গামছা, হাতে জাদুকীর্ণ লাঠি একাভিমুখিতার প্রতীক এই দণ্ড। গামছাখানি তার আত্মার অপমান। অবধারিতা একারণে যে, অপমান চন্দ্রকলাকৃতি বঙ্কিমা প্রসারিত ভূখণ্ডের সমান। কোথাও লুকোবার ঠাঁই নেই। যবহ দেখছেন, তাঁর বান্দা কী অসীম বেদনায় অপমানে নির্বাক।
রুহা অশ্ব দেখে ছুটে আসে। সাদইদের প্রতীক্ষায় সে অস্থির হয়েছে। একদণ্ড থামে না। ককিয়ে ওঠে–আমার সেপাইকে দেখলেন হুজুর! খোঁজ পেয়েছেন! কোথায় আছে? কবে আসবে?
সাদইদ থেমে পড়েছে। মনে হচ্ছে এ দৃশ্য নতুন নয়। এই প্রতীক্ষা পুরনো হয়ে গিয়েছে। এই প্রশ্ন ধারহীন। এই বিড়ম্বনা সোয়াস্তিশূন্য। সাদইদ খাদে নামানো ঈষৎ ভেজা গলায় যতদূর সংক্ষিপ্ত সম্ভব জবাব করে–আসবে!
–কবে?
এতক্ষণে মুখ তোলে সাদইদ। হঠাৎ কড়া উত্তর–তোমাদের সমস্ত জবাব সামান্য ভাড়াটে সৈনিক দিতে পারে না রুহা!
–তুমি দেবে না তো কে দেবে তবে? ভিস্তির পোলা হয়ে আমার নাগরকে তুমিই কেড়ে খেয়েছ বদমাশ! নতুবা লুকিয়ে রেখেছ। দাও। ফিরিয়ে দাও। সাদইদ ফের মুখ অবনত করেছিল। ফের তুলল। বলল–আসবে রুহা!
–কবে!
–আমি স্বপ্নদর্শী নই। মসীহ নই। আমি নক্ষত্রবিজ্ঞান জানি না।
–তুমি পিঁপড়ের ভাষা বুঝতে পারো। পিঁপড়ের গতিবিধি দেখে কখন বৃষ্টি হবে বলতে পারো। তবে কেন বলতে পারবে না আমার সেপাইয়ের খবর? তুমি ওকে নিনিভের দিকে পাঠিয়েছ। একদল সেনা তো ফিরল না! কেন ফিরল না? কী হল ওর? লোটাই বা কবে ফিরবে?
–ফিরে আসবে নিশ্চয়।
–দেখা হয়েছে বল তাহলে?
–যা হয়েছে! এবার পথ ছাড়ো!
–কখন আসবে!
–কাল।
–রোজই তো বল কাল। আসে না কেন? আমার শিশু যে কাঁদে!
–মধু খেতে দাও।
–আমার বুকে কি গরল আছে বলছ?
–আমি সেকথা বলিনি রুহা। সামনে মরুভূমিতে শীত আসছে–আমি সেপাইদের বলেছি মৃতদেহ থেকে কাপড় সংগ্রহ করতে। এখানে নদী নেই! শস্যক্ষেত্র নেই। এমনকি সমুদ্রের গর্জন শোনা যায় মাত্র, সমুদ্র উত্তাল হয়–কিন্তু বাতাস লাট খেয়ে কিনারা ছুঁয়ে সমুদ্রের ভিতর ঘুরে চলে যায়–কেবল একটা নির্দিষ্ট সময়ে সামান্য মেঘ উড়ে আসে। তখন সমুদ্র বাতাস খুলে দেয়। এই ঊষর জীবন কেবল যুদ্ধে খরচ হয় রুহা। মৃতদের পরিত্যক্ত খাদ্য বস্ত্রে জীবন বাঁচে। এ এক ধরনের চুরি। লুঠ নয়। পরাক্রম নয়। তোমার সেপাই আসবে একদিন প্রচুর বস্ত্র আর খাদ্য নিয়ে। সমুদ্র সর্বক্ষণ হাওয়া দেবে সেই জীবন তো আমরা পাইনি।
