তবু ভয় করে তার। বিশ্বাস হয় না। অশ্বারোহী পুরুষটি শিশুর জন্য বরাদ্দ করছে একটি স্বর্গের, যা আকাশ থেকে মরুতে বিম্বিত হবে!
কীভাবে মরুতে স্বর্গ বিম্বিত হয় রিবিকা ভাবতে পারে না। হৃদয় কীভাবে এইসব চিন্তা করে তার জানা নেই। তবে সাদইদের কথা শুনতে শুনতে কেবলই তার মনে হচ্ছিল, পিরামিডের শবাধারলিপির কথাগুলি, যে সম্রাট অথবা অভিজাত মানুষটি শবাধারে শুয়ে চিরনিদ্রায় অভিভূত এবং নির্বাক সে কি
ঘোষণা করছে সে কখনও কারুকে আঘাত করেনি, কাউকে কাঁদায়নি, এমনকি একটা পশুকেও সে যাতনা দেয়নি–এভাবে আদর্শ মানুষ ঘুমিয়ে থাকে।
অথচ ওই কথাগুলি যে প্রতারণা, তা প্রমাণিত হয়েছে। জীবন একরকম। বাণী অন্যরকম। মানুষ দেবতা হওয়ার লোভে অমন বাণী রচনা করে। অশ্বারোহী পুরুষটি পতঙ্গের দাম দেয় অথচ সে মেষ-শিশুকে হত্যা করে। পতঙ্গের পক্ষধ্বনি শুনতে পায় অথচ নিনিভের মনুষ্য-আর্তনাদ তাকে বিচলিত করে না–শবস্তূপ থেকে জীব প্রাণ খুঁটে তুলে আনে অথচ সমেরুর মত কিশোরকে সে প্রবল যাতনার ভিতর নিক্ষেপ করে। আক্কাদই শুধু প্রতারক নয়, একজন ফেরাউন সম্রাটও ক্রীতদাসীর গর্ভ তল্লাশ করে শিশুহত্যার পরোয়ানা জারি করে। কতকাল মানুষ এইরকম দু’মুখো জীব–এক মুখে অহিংসা, অন্য মুখে যুদ্ধের শিঙা ফুঁকে চলেছে। শিশুর গলায় লকেট দেখে যে অভিভূত, সে আদৌতে একটি ক্ষুদ্র শিঙা লটকে রেখেছে গলায়।
–তুমি আমার শিশুমেষকে হত্যা করেছ সারগন–ক্ষমা করব না কখনও! আমার জন্য একটি সূর্যমন্দিরই যথেষ্ট। তাই দাও। তোমার কাছে যাচনা করার কিছু নেই।
আপন মনে বলে যেতে থাকে রিবিকা। কতকগুলি তাঁবুক্ষেত্র তারা অতিক্রম করে আসে। তারপর দেখতে পায় সার সার মন্দির। মন্দিরগুলি সব এক। ধরনের নয়। আকাশে আলো নরম হয়েছে। অশ্বের গতি অনেকক্ষণ খুবই মন্থর। শিশুকে পাওয়ার পর ঘোড়া যেন আর চলতেই চাইছে না। পাহাড় ক্রমশ আরো নিকটবর্তী হয়ে এল। দিনের আলোতেই দেখা গেল পাহাড়ের মাথায় রূপালি চাঁদ উদ্ভাসিত। মন্দিরের সিঁড়িতে দেবদাসীরা বুকের কাপড় ফেলে দিয়ে বসে আছে। সুগন্ধি পাতা চিবিয়ে চলেছে। পেয়ালা থেকে গড়িয়ে খাচ্ছে দ্রাক্ষাসব। পথের উপর মদপাত্র সাজিয়ে বসেছে মানুষ।
মাটির কাঁচা ইট মরুবালিতে শুকানো হয়েছে। তাই দ্বারা নির্মিত হয়েছে মন্দির। তাঁবুর আকৃতির এই ঘরগুলি খড়ো। যবের গমের বিচালি ছাওয়া। কোথাও পাথরের লেশমাত্র নেই। অবশ্য দু’একটি মন্দিরে কিছু তফাত রয়েছে। তাঁবু বলতে যেগুলি গোলাকার তাঁবু, মন্দির সেই আকৃতিবিশিষ্ট হওয়ার পর চুড়ো তুলেছে গোলার মত। দু’একটি মন্দির সহসা রাজকীয়। সম্পূর্ণ পাথর কেটে তৈরি, তা পিরামিড-সদৃশ।
রিবিকা বুঝতে পারছিল পরিচ্ছন্ন মন্দির বলতে কী বোঝাচ্ছিল সাদইদ। তাকে দেওয়া হবে পিরামিড মাকা কোন একটা মন্দির। সন্ধ্যার মুখে মন্দির প্রাঙ্গণে ঢোল আর বীণা বেজে উঠল। মরুভূমির একধরনের বুনো তীব্র গন্ধ ফুলের মালা কব্জিতে জড়িয়ে বেঁধে জুম পাহাড়ী সৈন্যরা তাঁবু থেকে নির্গত হতে লাগল। মুখে মদের ঝাঁঝালো গন্ধ, গায়ে আতর ছিটিয়েছে। পোশাক পরেছে মসীহদের মত। কিন্তু এমনভাবে তা পেঁচানো হয়েছে পরনে এবং গায়ে যে, একখানি পায়ের থাই অবধি চোখে পড়ছে। চোখে ঢুলু ঢুলু চাউনি আচ্ছন্নতা পীড়িত, ঈষৎ তির্যক । গোঁফ জুমরে মদের প্রলেপ দিয়েছে, চোখে কেউ কেউ সুমা পরেছে। আতরে মদে মাখামাখি বাতাস রূপালি চাঁদে হল্লা তুলে ছুঁয়ে নামছে মাটিতে। অত্যন্ত কম বয়েসী পাঁচটি মেয়েকে দেখা যাচ্ছে একটি ছোট মন্দিরের সামনে। পাথরের পাটাতন পাতা বদ্বার ঠাই, একে বলা হয় দীঘল কেদারা। এখানে বিশ-পঁচিশজন সেপাই মাথা নিচু করে বসে রয়েছে।
মাথা নিচু করে বসে থাকার কারণ যে সাদইদ, ক্রমে বুঝতে পারে রিবিকা। কচি মেয়েগুলি দাঁত বার করে হাসছে। বুকের জামা খুলে একটি কুঁড়ি দেখিয়ে জামার তলে ঢুকিয়ে রাখছে একটি পাজি মেয়ে। ক্রমাগত এই-ধারা করছে।
সাদইদ ঘোড়া নিয়ে গিয়ে ওখানে থেমে গেল। সুন্দরী রিবিকার দিকে সবাই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। কচি সেই পাজি মেয়েটি রিবিকাকে বুকটা দেখিয়ে জিভ ভেংচে বলল–নতুন নাগরী বুঝি! তা বেশ। ক’খানা ভেড়া দিয়ে খরিদ করল তোকে!
সাদইদ ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে শিশুটাকে রিবিকার কোলে ছুঁড়েই দিল একপ্রকার। তারপর সটান কচিটার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললকনানী ভাষাটা তো বেশ মজবুত করে বলতে পারো কিন্তু এইসব আদিখ্যেতা কেন? সহবত বোঝো না?
বলেই গালে একটা চটাস করে চড় মারল সাদইদ। তারপর ধমক দিয়ে উঠল–বেয়াদব! শরীর সামলে রাখো!
–আ বাপ! তিন ভেড়ার খরিদানা মাগী আমি, তুমি মিনসে হলে বতাই হবা নাকি ভিস্তির পো? জানি তুমি লোকটা অতি মন্দ নও, শুদু হিতেনের পেটোয়া বটো। আমায় একবার হারেমে দাও দিকিনি, ঘুরে আসি! আঙুর চটকালে মদ, মাগী চটকালে বদ–তা বুঝি জানো না!
বলেই সাদইদকে জিভ বার করে ভেংচে উঠল পাজিটা। সাদইদ রেগে গিয়ে ওকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিতেই মেয়েটি পড়ে গিয়ে কেঁদে ফেলল ভয়ে।
একজন গামছাবালা সাদইদের কাছে এগিয়ে এসে বলল–হুঁজুর! ঘাট মাফ করবেন! ওটার মাথা খারাপ! খালি বকবে,যতই কেন বলুন! আসলে যুদ্ধে ওর বাপ-মা দুটিই খতম হয়েছে। পরে এক মদঅলা শুঁটকিঅলা ওকে তিন ভেড়ার। বদলি কিনে আনে, সেই গল্পটা ও করে! কী করে শুঁটকিঅলা-উটবালাকে ও নিজেই ওদের উঠানে ডেকে নিয়ে গেল। একটাই কেচ্চা কেবলই আউড়াবে। ওর কাকারা ওকে বেচে দিয়েছে! ওর দুখখু একটাই–ও কেন নিজেই ব্যাপারীকে ডেকে নিয়ে গেল! বিশদ করে বলা ওর স্বভাব। মাথাটা গেছে। হুজুর! মারলেও শুনবে না। আপনি চলে যান। আমি ওকে দেখছি!
